Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 16:55 pm
অন্যান্য

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কোন পথে হাঁটছে?

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা কোন পথে হাঁটছে?

মোহাম্মদ আলী
জ্ঞান ও দক্ষতা — দুটি ভিন্ন জিনিস
চলুন, আলোচনার শুরুতেই দুটি শব্দকে আলাদা করে বুঝি।
জ্ঞান হলো তথ্য, ধারণা ও বোঝাপড়ার সমষ্টি — যা মানুষ পড়ে, শুনে বা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে অর্জন করে। জ্ঞান আমাদেরকে বলে যে পৃথিবী গোল, মুক্তিযুদ্ধ কেন হয়েছিল, অর্থনীতির সূত্র কী। এটি মাথার ভেতরে থাকে।
দক্ষতা বা স্কিল হলো সেই জ্ঞানকে বাস্তবে প্রয়োগ করার ক্ষমতা — যা হাত দিয়ে, মুখ দিয়ে বা মস্তিষ্ক ব্যবহার করে কোনো নির্দিষ্ট কাজ সম্পন্ন করতে পারা। স্কিল বলে কোড লেখা, বক্তৃতা দেওয়া, গাড়ি চালানো, রান্না করা, হিসাব রাখা।
পার্থক্যটা সহজ ভাষায় এভাবে বলা যায় — জ্ঞান জানায়, স্কিল করায়। একজন মানুষ সাঁতারের পুরো বিজ্ঞান মুখস্থ করতে পারেন, কিন্তু পানিতে ফেললে ডুবে যাবেন যদি কখনো সাঁতার না শিখে থাকেন। এটাই জ্ঞান ও দক্ষতার মৌলিক ফারাক।
পড়াশোনার উদ্দেশ্য কী হওয়া উচিত?
আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞান ও দক্ষতা — দুটিই থাকে। জ্ঞান মানুষকে চিন্তা করতে শেখায়, নৈতিক বোধ তৈরি করে, দুনিয়াকে বুঝতে সাহায্য করে। আর দক্ষতা সেই বোঝাপড়াকে জীবনে কাজে লাগায়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো — জীবিকার জন্য দক্ষতা অপরিহার্য। পেটের ভাত আসে স্কিল থেকে, সার্টিফিকেট থেকে নয়।একজন ভালো ইলেকট্রিশিয়ান, একজন প্রশিক্ষিত নার্স — এরা প্রতিদিন আয় করেন। অন্যদিকে একজন মানুষ যিনি শুধু জানেন কিন্তু করতে পারেন না, তিনি বাজারে অচল।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বেদনাদায়ক বাস্তবতা
এখন যদি প্রশ্ন করা হয় — বাংলাদেশে প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ষোলো-আঠারো বছর পড়াশোনা করে একজন শিক্ষার্থী ঠিক কোন স্কিলটা অর্জন করে বের হন? — উত্তরটা কষ্টদায়ক নীরবতা।
সে কি কোড করতে পারে? না। সে কি কোনো যন্ত্র মেরামত করতে পারে? না। সে কি একটি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরি করতে পারে? না। সে কি ইংরেজিতে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারে? বেশিরভাগ ক্ষেত্রে — না। তাহলে সে কী পারে?
সে পারে পরীক্ষার খাতায় মুখস্থ করা উত্তর লিখতে। এটুকুই।
জীবনের সবচেয়ে সোনালি সময় — শৈশব থেকে যৌবনের প্রথম ভোর পর্যন্ত — ব্যয় হয় বই মুখস্থ করে, পরীক্ষা দিয়ে, নম্বর তুলে, সার্টিফিকেট জমিয়ে। আর সেই সার্টিফিকেটের বাজারমূল্য? অধিকাংশ ক্ষেত্রে শূন্য।
একটি তিক্ত সত্য বলা দরকার — আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীর হাতে যা তুলে দেয় তা হলো বেকারত্বের একটি অলংকৃত সনদ। একজন স্নাতক ডিগ্রিধারী তরুণ রিকশাও চালাতে পারেন না, কারণ সেই দক্ষতা তিনি শেখেননি। গাড়ি চালানো, ইলেকট্রিক্যাল কাজ, প্লাম্বিং, কারপেন্ট্রি — এসব কিছুই তার সিলেবাসে ছিল না। ব্যবহারিক কোনো কাজই তিনি জানেন না। তিনি কেবল জানেন যে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন হয়েছিল এবং ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের সূত্র কী।
এই জ্ঞান দিয়ে বাজার থেকে একটি পণ্যও বিক্রি হয় না।
দায় কার?
এই ব্যর্থ কারিকুলামের স্থপতি কারা? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় — বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেওয়া, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আরামদায়ক চেয়ারে বসা একদল শিক্ষাবিদ। তারা অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ বা হার্ভার্ডে পড়েছেন। সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তারা পরিচিত। অথচ দেশে ফিরে এসে তারা সেই মানের কিছু তৈরির চেষ্টা করেননি বা করতে পারেননি।
প্রশ্ন হলো — কেন?
এর পেছনে কারণ একটি নয়, অনেকগুলো। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, বিদ্যমান ব্যবস্থা থেকে সুবিধাভোগীদের প্রতিরোধ এবং সবচেয়ে বড় কথা — শিক্ষাকে সত্যিকার অর্থে অগ্রাধিকার না দেওয়ার সংস্কৃতি। শিক্ষা নিয়ে বক্তৃতা হয় অনেক, সংস্কার হয় কম।
ফিনল্যান্ড, জার্মানি বা সিঙ্গাপুরের দিকে তাকানো হয় না। তাকানো হলেও শেখার আগ্রহ নেই। কারণ শেখার মানে হলো পুরনো ক্ষমতার কাঠামো ভাঙা — আর সেই কাজটি কেউ করতে রাজি নন।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা একটি দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল প্রতারণায় পরিণত হয়েছে। কোটি কোটি পরিবার তাদের সর্বস্ব ঢেলে দিচ্ছেন সন্তানের পড়াশোনায় — এই আশায় যে একটি ভালো জীবন অপেক্ষা করছে সামনে। কিন্তু সেই আশায় গুড়ে বালি।
কে প্রশ্ন করবে যে শিক্ষা কি কেবল পরীক্ষাপাশের যন্ত্র, নাকি মানুষ গড়ার প্রক্রিয়া? কারিকুলামে কি দক্ষতা থাকবে, নাকি শুধু তত্ত্ব? একজন স্নাতক কি চাকরি না পেলে নিজেই কিছু করতে পারবেন, নাকি সরকারি চাকরির জন্য বছরের পর বছর কোচিং সেন্টারে বসে থাকবেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশের শিক্ষা কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতাই থাকবে — জীবন গড়ার হাতিয়ার হবে না।

Advertisement
Advertisement