মোহাম্মদ আলী
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি “কমিউনিকেটিভ ইংলিশ” নামে একটি নতুন কোর্স চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বিদ্যমান কম্পোলসরি ইংলিশ কোর্সের পাশাপাশি সংযোজিত হবে। তবে বর্তমানে অনার্স ও ডিগ্রি পর্যায়ে যে ইংরেজি কোর্স পড়ানো হয়, তার বিষয়বস্তু প্রায় সম্পূর্ণই একই রকম—মূলত গ্রামার ও রাইটিং অনুশীলননির্ভর, যা এসএসসি ও এইচএসসি স্তরেই শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যে অধ্যয়ন করেছে। অথচ অনার্স বা ডিগ্রি সম্পন্ন করার পর শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজন হয় কার্যকর ইংরেজি দক্ষতা—বিশেষ করে সাবলীল যোগাযোগ ও উপস্থাপন দক্ষতা। দুঃখজনকভাবে, এই মৌলিক দক্ষতাগুলোর পরিবর্তে এখনও পাঠদানের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেছে গ্রামার ও রাইটিং অনুশীলন।
সংক্ষেপে বলা যায়, এই পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন কথোপকথন দক্ষতা, যা বর্তমান কোর্স কাঠামোর মাধ্যমে যথাযথভাবে বিকশিত হচ্ছে না। ভাষাবিদরা অবশ্য স্বীকার করেন যে, কথা বলার দক্ষতা অর্থাৎ স্পিকিং স্কিল অর্জিত হয় নিয়মিত ও সক্রিয়ভাবে কথা বলার অনুশীলনের মাধ্যমে। একইভাবে, লিসেনিং শেখা হয় শোনার মাধ্যমে, রিডিং শিখতে হয় পড়ার মাধ্যমে এবং অনুরূপভাবে রাইটিং শেখা হয় লেখার মাধ্যমে। যেহেতু শিক্ষার্থীরা কিছুটা হলেও পড়া ও লেখার অনুশীলন করে, তাই এ দুটি ক্ষেত্রে তাদের দক্ষতা তুলনামূলকভাবে কিছুটা গড়ে ওঠে; কিন্তু স্পিকিং অনুশীলনের অভাবে তারা মৌখিক দক্ষতায় পর্যাপ্ত পারদর্শিতা অর্জন করতে পারে না।
বাস্তবে, অনার্স ও ডিগ্রি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের, যারা দেশীয় চাকরিরবাজারে প্রবেশ করতে চান, তাদের জন্য শক্তিশালী স্পোকেন ইংলিশ ও প্রেজেন্টেশন দক্ষতা অপরিহার্য। অন্যদিকে, যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে ইচ্ছুক, তাদের জন্য IELTS, TOEFL, GRE-এর মতো আন্তর্জাতিক ইংরেজি দক্ষতা পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন জরুরি। তাই “কমিউনিকেটিভ ইংলিশ” কোর্সটি এমনভাবে সাজানো উচিত, যাতে শিক্ষার্থীরা তাদের ব্যক্তিগত একাডেমিক ও পেশাগত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবভিত্তিক ভাষা দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
অন্যথায়, এই কোর্স থেকে শিক্ষার্থীরা কোনো অর্থবহ উপকার পাবে না। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে প্রায় বারো বছর ইংরেজি পড়ার পরও অনেক শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে ইংলিশে নিজের সম্পর্কে এক মিনিট কথা বলতে অক্ষম। এই প্রেক্ষাপটে, এমন একটি কোর্সকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ—যদিও অসম্ভব নয়। যদি কোর্সটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে এটি অবশ্যই শিক্ষার্থীদের জন্য উপকারী হতে পারে। কিন্তু যদি এটিকে কেবল আরেকটি প্রচলিত একাডেমিক বিষয় হিসেবে দেখা হয়, তবে এটি বর্তমান ইংরেজি কোর্সের মতোই শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত বোঝায় পরিণত হবে।
বর্তমানে শিক্ষার্থীরা অন্যান্য সব বিষয়ে ভালো সিজিপিএ অর্জন করলেও ইংরেজিতে পাস না করলে অনার্স বা ডিগ্রি সম্পন্ন করতে পারে না। ফলে এই বিষয়টি অনেক সময় শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির সহায়ক না হয়ে বরং মানসিক চাপ ও হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অতএব, নতুন কোর্সটি চারটি মৌলিক ভাষা দক্ষতা—লিসেনিং, স্পিকিং,রিডিং ও রাইটিং—এর সুসংগঠিত বিকাশের ভিত্তিতে গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি, এটিকে IELTS, TOEFL, PTE-এর মতো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ভাষা দক্ষতা পরীক্ষার কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা উচিত, যাতে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে এসব পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
এই মান নিশ্চিত করতে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা আবশ্যক। প্রথমত, বর্তমানে যারা ইংরেজি পড়াচ্ছেন তাদের একটি বড় অংশের ইংরেজি ভাষা শিক্ষাদানে (ELT) পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। তাদের পাঠদান মূলত গ্রামার, রাইটিং ও রিডিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ; কথা বলা শেখানোর কোনো কার্যকর অভিজ্ঞতা বা প্রশিক্ষণ অনেকেরই নেই, এমনকি তাদের নিজেদের স্পোকেন ইংলিশ দক্ষতাও দুর্বল। তাই তাদের জন্য একটি সুসংগঠিত পেশাগত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা অপরিহার্য। ভবিষ্যতে এই কোর্সে নিয়োগের ক্ষেত্রেও MA in ELT, TESOL বা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষায়িত যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত।
দ্বিতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতির নম্বর বণ্টন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একটি দক্ষতাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিলে অন্যগুলোর ভারসাম্য নষ্ট হবে। মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে চারটি দক্ষতার জন্য সমানভাবে ২৫ করে নম্বর বরাদ্দ করা উচিত, যাতে সব ভাষা দক্ষতার সমান গুরুত্ব নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি, মূল্যায়ন পদ্ধতিকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে, যেখানে IELTS বা TOEFL-এর মতো পরীক্ষার কাঠামোকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা যেতে পারে। কেবল প্রচলিত মুখস্থ নির্ভর পরীক্ষা বা সীমিত কয়েকটি নমুনা পাঠের মাধ্যমে মূল্যায়ন করলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব হবে না।
পরিশেষে বলা যায়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এই “কমিউনিকেটিভ ইংলিশ” কোর্সটি উচ্চশিক্ষার ইংরেজি শিক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে এর সাফল্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করবে এর বাস্তবায়নের কার্যকারিতার ওপর। একটি অর্থবহ সংস্কারের জন্য প্রয়োজন প্রচলিত ব্যর্থ পদ্ধতি থেকে সরে এসে চারটি ভাষা দক্ষতার সমন্বিত বিকাশ নিশ্চিত করা, বিশেষ করে স্পিকিং ও লিসেনিং দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া, যা বর্তমান ইংরেজি সিলেবাসে অবহেলিত। পাশাপাশি, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, যথাযথ মূল্যায়ন কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এসব বিষয় যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে এই কোর্স শিক্ষার্থীদের কর্মজীবন ও উচ্চশিক্ষার জন্য কার্যকর ইংরেজি দক্ষতা অর্জনে সহায়ক হবে। অন্যথায়, এটি কেবল আরেকটি তাত্ত্বিক বিষয় হিসেবেই থেকে যাবে, যা শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে, কিন্তু বাস্তব জীবনে তেমন কোনো উপকার বয়ে আনবে না।
প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, ড. আব্দুল মজিদ তালুকদার ডিগ্রি কলেজ, জামালপুর সদর, জামালপুর।
muhammedalieng@gmail.com
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রবর্তিত নতুন “কমিউনিকেটিভ ইংলিশ” কোর্সটি কতটা কার্যকর হবে?
Oplus_131072




