সাইদুর রহমান
শিক্ষার্থী : মাস্টার্স অধ্যয়নরত (বাংলা) সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ জামালপুর
মানুষ সামাজিক জীব। সম্পর্ক ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব কল্পনাই করা যায় না। পরিবার, আত্মীয়তা, বন্ধুত্ব, সহকর্মিতা—এসব সম্পর্কের ভেতর দিয়েই গড়ে ওঠে মানবসমাজ। অথচ সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এসব সম্পর্কের ভেতরে নীরবে ঢুকে পড়েছে এক ভয়ংকর ব্যাধি—স্বার্থপরতা। কখনো অদৃশ্যভাবে, কখনো প্রকাশ্যে—এই স্বার্থপরতা ধীরে ধীরে ভেঙে দিচ্ছে মানুষের সঙ্গে মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার বন্ধন।
এক সময় সম্পর্ক মানেই ছিল নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি, বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানো—এসবই ছিল সম্পর্কের মূল ভিত্তি। কিন্তু আধুনিক সমাজব্যবস্থায় এসে সেই সম্পর্কগুলো অনেক ক্ষেত্রেই পরিণত হয়েছে লাভ-ক্ষতির হিসাব-নিকাশে। যতদিন প্রয়োজন, ততদিন আপন; প্রয়োজন ফুরোলেই সম্পর্ক হয়ে পড়ে দূরত্বপূর্ণ ও নির্লিপ্ত। বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানোর মানুষ খুঁজে পাওয়া আজ যেন দুষ্কর হয়ে উঠেছে।
স্বার্থপরতার এই চিত্র সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে ধনী ও উচ্চবিত্ত সমাজে। অর্থ, ক্ষমতা ও বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার করে কীভাবে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কাছ থেকে স্বার্থ আদায় করা হয়—তা আজ আর অজানা নয়। রাজনৈতিক অঙ্গনেও স্বার্থপরতার ভয়াবহ রূপ স্পষ্ট। ক্ষমতার লোভে, ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষায় নেতাদের একাংশ সাধারণ মানুষের ভাগ্য নিয়ে নির্মম খেলায় মেতে ওঠে, যার পরিণতি ভয়াবহ সামাজিক বিপর্যয়।
শুধু সমাজ বা রাজনীতিতেই নয়, স্বার্থপরতা ঢুকে পড়েছে পারিবারিক সম্পর্কের গভীরেও। ভাইয়ে ভাইয়ে সম্পত্তি কিংবা ব্যক্তিগত স্বার্থ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। এমনকি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ভাইয়ের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতেও অনেকে কোনো সংকোচ বোধ করে না। প্রশ্ন জাগে—তাহলে কি মানুষের মন থেকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে? নাকি স্বার্থপরতার কালো পর্দা সেই অনুভূতিগুলোকে আড়াল করে রেখেছে?
স্বার্থ টিকিয়ে রাখার নির্মম বাস্তবতায় গ্রাম-শহর সর্বত্রই আজ দেখা যাচ্ছে বৃদ্ধ মা-বাবাকে ঠাঁই নিতে হচ্ছে বৃদ্ধাশ্রমে। যাদের আদর-যত্নে বড় হওয়া, সেই সন্তানদের কাছেই তারা হয়ে উঠছেন বোঝা। সমাজে এক ভয়ংকর বার্তা ছড়িয়ে পড়ছে—স্বার্থ ছাড়া কেউ আর আপন নয়। স্ত্রী, সন্তান, বন্ধু কিংবা আত্মীয়—সব সম্পর্কই যেন শর্তসাপেক্ষ।
এই নির্দয় বাস্তবতার মাঝেও একমাত্র ব্যতিক্রম হয়ে থাকেন মা ও বাবা। নিঃস্বার্থভাবে, বিনিময়হীন ভালোবাসা দিয়ে যাওয়ার মানুষ এখনো তারাই। হৃদয়ের সবটুকু উজাড় করে দিয়ে সন্তানকে ভালোবাসতে জানেন মা-বাবা—স্বার্থের কোনো হিসাব ছাড়াই। অথচ সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার মূল্য দিতে আমরা ক্রমেই ব্যর্থ হচ্ছি।
মানুষে মানুষে স্বার্থপরতা আজ সম্পর্কের নীরব ভাঙনের নাম। এই ভাঙন শব্দ করে না, চোখে জল আনলেও অনেক সময় ধরা পড়ে না। কিন্তু ধীরে ধীরে এটি সমাজকে করে তুলছে অনুভূতিহীন, নির্দয় ও একাকী। প্রশ্ন থেকে যায়—আমরা কি পারব এই স্বার্থপরতার দেয়াল ভেঙে আবার মানুষে মানুষে মানবিক সম্পর্ক ফিরিয়ে আনতে? নাকি সম্পর্কগুলো কেবলই টিকে থাকবে প্রয়োজনের অঙ্কে?




