রাজনীতি কেবল ক্ষমতার মসনদে আরোহণের প্রতিযোগিতা নয়, আবার ক্ষমতাসীনদের বিরোধিতা করাই কোনো রাজনৈতিক দলের একমাত্র সাফল্যের মাপকাঠি হতে পারে না। রাজনীতি মূলত রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুস্থ, স্থিতিশীল ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের অঙ্গীকার। যে রাজনীতি কেবল ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সে রাজনীতি হয়তো সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিতে পারে না।
একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিপক্বতা নির্ধারিত হয় শুধু ক্ষমতাসীন দলের কর্মকাণ্ড দিয়ে নয়, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির দায়িত্ববোধ, সহনশীলতা, দূরদর্শিতা ও রাষ্ট্রচিন্তার গভীরতা দিয়েও। কারণ গণতন্ত্রে সরকার ও বিরোধী দল পরস্পরের প্রতিপক্ষ হলেও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে উভয়েরই দায়িত্ব রয়েছে। একজন সরকার পরিচালনা করেন, অন্যজন সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরে জবাবদিহি নিশ্চিত করেন। এই পারস্পরিক ভারসাম্যই গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি।
বিরোধিতা মানেই সংঘাত নয়, দায়িত্বশীলতাও রাজনীতির শক্তি
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা থাকা স্বাভাবিক। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো রাজনৈতিক দলই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। তবে একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করা প্রয়োজন, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা মানে প্রতিটি পরিস্থিতিতে আন্দোলন-সংগ্রামের পথ বেছে নেওয়া নয়। বরং কখন প্রতিবাদ করতে হবে, কখন আলোচনার টেবিলে বসতে হবে, কখন আপসের পরিবর্তে নীতিতে অটল থাকতে হবে এবং কখন জাতীয় স্বার্থে রাজনৈতিক সংযম প্রদর্শন করতে হবে, তা বুঝতে পারার মধ্যেই নেতৃত্বের প্রকৃত দূরদর্শিতা নিহিত।
সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা যেমন দায়িত্বশীল বিরোধী রাজনীতির পরিচয় নয়, তেমনি সরকারের অন্যায়, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে নীরব থাকাও রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতা হতে পারে না।
একটি শক্তিশালী বিরোধী দল সরকারের প্রতিটি ভালো উদ্যোগকে স্বাগত জানাবে, ভুল সিদ্ধান্তের সমালোচনা করবে এবং প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য কার্যকর প্রস্তাব দেবে। জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন হলে প্রতিবাদ করবে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে সোচ্চার হবে এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ বিপন্ন হলে দলীয় হিসাব-নিকাশের ঊর্ধ্বে উঠে অবস্থান নেবে।
জামায়াতে ইসলামী যদি এই রাজনৈতিক দর্শনকে ধারণ করে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে পারে। তবে সেই দায়িত্বশীলতার ভিত্তি হতে হবে নীতি, আদর্শ, স্বচ্ছতা ও জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা।
রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও জাতীয় ঐক্য: সময়ের অপরিহার্য দাবি
জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে মানুষের মনে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, ন্যায়বিচার, জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে, তা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের একক সম্পদ নয়। এটি জনগণের সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষা।
এই আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য প্রয়োজন। রাষ্ট্রীয় সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে নীতিগত সমঝোতা গড়ে তোলা জরুরি।
এখানে সরকারের দায়িত্ব যেমন গুরুত্বপূর্ণ, বিরোধী দলের দায়িত্বও তেমনি অপরিহার্য। সরকারকে বিরোধী মতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে না দেখে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। অন্যদিকে বিরোধী দলকেও বুঝতে হবে, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি বিষয়ে অযৌক্তিক বিরোধিতা জাতীয় অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
জাতীয় স্বার্থে সহযোগিতা এবং নীতিগত প্রশ্নে আপসহীনতা, এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারাই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়।
সাময়িক জনপ্রিয়তা নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সক্ষমতা
রাজনীতির মাঠে জনপ্রিয়তা একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। কিন্তু জনপ্রিয়তাই রাজনৈতিক সাফল্যের একমাত্র মাপকাঠি নয়। জনসমাবেশের ভিড়, স্লোগানের উচ্চতা কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ব্যাপকতা দিয়ে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রকৃত সক্ষমতা নির্ধারণ করা যায় না।
একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি নির্ভর করে তার আদর্শিক অবস্থান, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, দক্ষ নেতৃত্ব, জনসম্পৃক্ততা, বাস্তবসম্মত কর্মসূচি এবং সংকট মোকাবিলার সামর্থ্যের ওপর।
নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থান গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন অভিজ্ঞতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং জনগণের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক। একইভাবে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোরও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। অতীতের অর্জন ভবিষ্যতের সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। জনগণের আস্থা প্রতিনিয়ত অর্জন করতে হয়।
যে দল জনগণের প্রত্যাশা বুঝতে ব্যর্থ হবে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দলের রাজনৈতিক অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়বে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, জনগণের সমর্থন কোনো রাজনৈতিক দলের চিরস্থায়ী সম্পত্তি নয়।
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচনার সংস্কৃতি গড়ে উঠুক
বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম বড় সংকট হলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিযোগী হিসেবে না দেখে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা। মতের অমিল হলেই অবিশ্বাস, রাজনৈতিক বিরোধ হলেই সংঘাত এবং ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার মানসিকতা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশে বড় বাধা।
অথচ গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো ভিন্নমতের সহাবস্থান। এখানে একাধিক রাজনৈতিক দল থাকবে, একাধিক রাজনৈতিক দর্শন থাকবে, মতের পার্থক্য থাকবে। জনগণ তাদের পছন্দ অনুযায়ী প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। কেউ ক্ষমতায় যাবে, কেউ বিরোধী দলে থাকবে। কিন্তু রাষ্ট্র সবার।
একটি রাজনৈতিক দলকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়া কিংবা অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়া কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা হতে পারে না। বরং প্রতিটি রাজনৈতিক শক্তিকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রেখে জনগণের সামনে তাদের যোগ্যতা, নীতি ও কর্মসূচি তুলে ধরার সুযোগ দিতে হবে।
জনগণই চূড়ান্ত বিচারক। ব্যালটের মাধ্যমে জনগণই নির্ধারণ করবে কারা রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা রাখে, কারা বিরোধী দলের দায়িত্ব পালনে সক্ষম এবং কারা জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
দায়িত্বশীলতার পাশাপাশি জবাবদিহিও অপরিহার্য
জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রযোজ্য হওয়া উচিত। দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করা ইতিবাচক বিষয়, কিন্তু সেটি যেন কেবল রাজনৈতিক কৌশলে সীমাবদ্ধ না থাকে। দলটির নিজস্ব আদর্শ, নেতৃত্বের আচরণ, সাংগঠনিক স্বচ্ছতা, গণতান্ত্রিক চর্চা, নারী-পুরুষের অধিকার, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং নাগরিক স্বাধীনতার প্রশ্নেও সুস্পষ্ট অবস্থান থাকা প্রয়োজন।
একটি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চাইলে তাকে শুধু নিজের সমর্থকদের কাছে নয়, দেশের সব নাগরিকের কাছেও গ্রহণযোগ্য হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।
একইভাবে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিও জনগণের প্রত্যাশা অভিন্ন। কেউই জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না। রাজনৈতিক পরিচয় কখনো অন্যায়কে বৈধতা দিতে পারে না, আর ক্ষমতার অবস্থান কখনো সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকার অধিকার দিতে পারে না।
রাজনীতির প্রকৃত সৌন্দর্য তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন দলের চেয়ে দেশ বড় হবে, ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড় হবে এবং ক্ষমতার চেয়ে জনগণের অধিকার অধিক গুরুত্ব পাবে।
শেষ কথা: ক্ষমতার রাজনীতি থেকে রাষ্ট্রচিন্তার রাজনীতিতে উত্তরণ প্রয়োজন
বাংলাদেশ আজ এমন এক রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সাময়িক আবেগ, প্রতিহিংসা কিংবা ক্ষমতার হিসাব-নিকাশের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব ও রাষ্ট্রচিন্তা। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের পথ নির্মাণ করতে হবে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকবে, প্রতিযোগিতা থাকবে, সমালোচনা থাকবে; কিন্তু সেই প্রতিযোগিতা যেন কখনো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা ও জনগণের স্বার্থকে বিপন্ন না করে।
রাজনৈতিক দলগুলোর মনে রাখা প্রয়োজন, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। আজ যে ক্ষমতায়, কাল সে বিরোধী দলে যেতে পারে। আজ যে বিরোধী দলে, আগামী দিনে জনগণের রায়ে সে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেতে পারে। তাই প্রত্যেক রাজনৈতিক শক্তির এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলা উচিত, যা ক্ষমতায় থাকুক কিংবা ক্ষমতার বাইরে, উভয় অবস্থাতেই জনগণের অধিকার ও রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষা করে।
আমার বিবেচনায়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, গণতান্ত্রিক সহাবস্থান, নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্যের সংস্কৃতি।
মনে রাখতে হবে, একটি রাজনৈতিক দলের বিজয় মানেই রাষ্ট্রের বিজয় নয়। রাষ্ট্রের বিজয় তখনই সম্ভব, যখন জনগণ তাদের অধিকার ফিরে পায়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হয় এবং প্রতিটি নাগরিক মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা পায়।
রাজনীতি হোক প্রতিহিংসার নয়, প্রজ্ঞার। বিরোধিতা হোক ধ্বংসের নয়, সংশোধনের। ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হোক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার নিয়ে।
কারণ ইতিহাসে শেষ পর্যন্ত তারাই স্মরণীয় হয়ে থাকেন, যারা শুধু ক্ষমতা অর্জনের স্বপ্ন দেখেননি, বরং একটি সুন্দর রাষ্ট্র ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের সাহস দেখিয়েছেন।
রাষ্ট্র কোনো দলের নয়, রাষ্ট্র জনগণের। আর জনগণের ভবিষ্যৎ রক্ষার দায়িত্ব সব রাজনৈতিক শক্তির।
– আব্দুর রহিম খান, সাংবাদিক ও কলাম লেখক




