Skip to content
প্রকাশ- November 5, 2026 , 10:34 am
মাদারগঞ্জ

মানুষ নামের আড়ালে মানুষ কোথায়?

মানুষ নামের আড়ালে মানুষ কোথায়?

(সমাজের নৈতিক সংকট, পেশাগত দায়বদ্ধতা ও বিবেকের আত্মজিজ্ঞাসা)

মানুষের ভিড়ে মানুষেরই অভাব, পরিচয়ের আড়ালে পরিচয়ের সংকট। কেউ শিক্ষক, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ বিচারক, কেউ চিকিৎসক, কেউ সাংবাদিক, কেউ রাজনীতিবিদ। প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা দায়িত্ব, সামাজিক মর্যাদা ও পেশাগত অঙ্গীকার। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সমাজের সভ্য, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক হয়ে ওঠার কথা। অথচ যখন জ্ঞানের চেয়ে বাণিজ্য, সেবার চেয়ে স্বার্থ, ন্যায়ের চেয়ে প্রভাব এবং সত্যের চেয়ে ভয় বড় হয়ে ওঠে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে, মানুষের এই ভিড়ে সত্যিকারের মানুষ কোথায়?
মানুষ হওয়া কেবল জন্মগত পরিচয়। কিন্তু মানবিক হয়ে ওঠা এক নৈতিক অর্জন, যার ভিত্তি বিবেক, সততা, দায়িত্ববোধ ও পরের অধিকারকে সম্মান করার মানসিকতা। পদ মানুষকে ক্ষমতা দেয়, অর্থ দেয় সামর্থ্য, আর শিক্ষা দেয় জ্ঞান। কিন্তু এসবের কোনোটিই মানুষকে প্রকৃত অর্থে মহৎ করে তুলতে পারে না, যদি তার ভেতরে ন্যায়বোধ ও মানবিকতার আলো নিভে যায়।
এই আত্মজিজ্ঞাসাই প্রতিধ্বনিত হয় একটি ব্যঙ্গধর্মী কবিতার পঙ্‌ক্তিতে:
“মানুষ আমি মানুষ নই,
মানুষ তবে কে?”

Advertisement

এ প্রশ্ন নিছক কাব্যিক আক্ষেপ নয়। এটি আমাদের সামাজিক বাস্তবতার প্রতি এক তির্যক দৃষ্টি, যেখানে কবি বিভিন্ন পেশা ও দায়িত্বের অসংগতির মধ্য দিয়ে মানুষের প্রকৃত পরিচয় অনুসন্ধান করেছেন। তাঁর ব্যঙ্গের লক্ষ্য কোনো পেশার সবাই নন, বরং সেই প্রবণতা, যেখানে দায়িত্বের জায়গা দখল করে স্বার্থ, আর নৈতিকতার জায়গায় বসে সুবিধাবাদ।
শিক্ষা, সেবা ও ন্যায়বিচারের সংকট
শিক্ষককে বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। তাঁর দায়িত্ব শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ নয়, শিক্ষার্থীর মধ্যে সত্যনিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার বীজ বপন করাও। কিন্তু শ্রেণিকক্ষে দায়িত্ব পালনে অবহেলা কিংবা প্রাইভেট ও কোচিংনির্ভরতার কারণে শিক্ষার সুযোগ বৈষম্যমূলক হয়ে উঠলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
অবশ্য সীমিত বেতন ও প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও অসংখ্য শিক্ষক নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অবদান অস্বীকার না করেই বলা যায়, শিক্ষাকে বাণিজ্যিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে রাখা এবং শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ, শিক্ষা যদি সামর্থ্যবানদের সুবিধা আর অসামর্থ্যবানদের বঞ্চনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তবে সমান সুযোগের ধারণা দুর্বল হয়ে পড়ে।

একইভাবে সরকারি প্রশাসনের মূল উদ্দেশ্য নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা। সরকারি সেবা কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অনুগ্রহ নয়, এটি নাগরিকের প্রাপ্য। অথচ কোনো কোনো ক্ষেত্রে ফাইল আটকে রাখা, অযথা হয়রানি কিংবা অনৈতিক সুবিধা দাবি করার অভিযোগ মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দায়িত্ব যখন সেবার বদলে প্রভাব প্রদর্শনের হাতিয়ারে পরিণত হয়, তখন রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার বন্ধন দুর্বল হয়।
বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রেও মানুষের প্রত্যাশা একই রকম গভীর। আদালত এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে মানুষ ক্ষমতা ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা করে। কিন্তু বিচারপ্রাপ্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, মামলার ব্যয় এবং আইনি জটিলতা সাধারণ মানুষের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিচার বিলম্বিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি মামলা নয়, ভুক্তভোগীর জীবন, পরিবার ও ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা।
তাই প্রয়োজন কার্যকর জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, আইনের সমান প্রয়োগ এবং এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে নাগরিকের অধিকার কোনো ব্যক্তির সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল থাকবে না।

সংবিধানের অঙ্গীকার, বাস্তবতার পরীক্ষা
মানবিক সমাজের ধারণা শুধু নৈতিক উপদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর ভিত্তি রয়েছে রাষ্ট্রের আইন ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন-অঙ্গীকারেও। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে আইনের দৃষ্টিতে সব নাগরিকের সমতা ও আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকার স্বীকৃত। ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা, বাক্‌স্বাধীনতা এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, নির্ধারিত সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা সাপেক্ষে।
একইভাবে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ১৬ নম্বর লক্ষ্য শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা, সবার জন্য ন্যায়বিচারের সুযোগ এবং কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়। দুর্নীতি হ্রাস, আইনের শাসন এবং মৌলিক স্বাধীনতা সুরক্ষাও এই লক্ষ্যের অন্তর্ভুক্ত।
অর্থাৎ, ন্যায়বিচার, সততা, স্বাধীনতা ও জবাবদিহি কেবল কবির কল্পিত আদর্শ নয়; এগুলো একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের মৌলিক প্রত্যাশা। চ্যালেঞ্জ হলো, এসব অঙ্গীকারকে কাগজ থেকে বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করা।
মানুষ হওয়ার দায়
কবিতাটির শেষ পঙ্‌ক্তিতে যেন সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়:
“বিবেক বোধ আছে যার,
মানুষ হলেন সে।”
এই উপলব্ধিই কবিতার মূল দর্শন। মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার পদমর্যাদায় নয়, বরং সেই পদে থেকে সে কী করেছে, তার ওপর নির্ভর করে। তার জ্ঞানের মূল্য নির্ধারিত হয় জ্ঞানের ব্যবহারে, ক্ষমতার মর্যাদা নির্ধারিত হয় দায়িত্ব পালনে, আর তার মানবিকতা প্রকাশ পায় অন্যের অধিকার ও দুঃখের প্রতি আচরণে।

তবে সমাজ বদলানোর দায় শুধু শিক্ষক, কর্মকর্তা, বিচারক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক কিংবা চিকিৎসকের নয়। প্রত্যেক নাগরিকেরও দায়িত্ব রয়েছে। নিজের সুবিধার জন্য অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া, পরিচিতজনের অপরাধ আড়াল করা কিংবা অন্যের অধিকার উপেক্ষা করে ব্যক্তিস্বার্থ নিশ্চিত করা থেকে বিরত থাকার মধ্য দিয়েও মানবিক সমাজ নির্মিত হয়।

প্রয়োজন ব্যক্তিগত সততার পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ। কারণ, ভালো মানুষ সমাজকে আলোকিত করেন, আর ভালো প্রতিষ্ঠান সেই আলোকে স্থায়ী ভিত্তি দেয়।

মানুষ হবো কবে?
যেদিন শিক্ষকতার মর্যাদা বাণিজ্যের কাছে পরাজিত হবে না, সরকারি দায়িত্ব ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার হবে না, বিচার পেতে প্রভাবের প্রয়োজন পড়বে না, রাজনীতি জনকল্যাণের পথ থেকে বিচ্যুত হবে না, সাংবাদিকতার কলম ভয় ও লোভের কাছে নত হবে না, আর চিকিৎসাসেবায় মানুষের অসহায়ত্ব ব্যবসার সুযোগ হয়ে উঠবে না, সেদিন মানবিক সমাজের পথে আমাদের অগ্রযাত্রা সত্যিকার অর্থে দৃশ্যমান হবে।
সেই দিন কোনো একক ঘোষণায় আসবে না। আসবে প্রতিদিনের ছোট ছোট সৎ সিদ্ধান্তে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থানে, নিজের ভুল স্বীকারে এবং দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠায়।
মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পদ নয়, বিবেক। সবচেয়ে বড় সম্পদ তার অর্থ নয়, সততা। আর সবচেয়ে বড় সাফল্য শুধু প্রতিষ্ঠিত হওয়া নয়, নিজের কারণে অন্য একজন মানুষের জীবনকে একটু সহজ, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলা।
তাই আজকের প্রশ্ন কেবল, মানুষ হবো কবে? নয়। প্রশ্ন হলো, মানুষ হওয়ার জন্য আমরা আজ কী করছি?
কারণ, মানুষ হওয়ার সাধনা ভবিষ্যতের কোনো দূরবর্তী প্রতিশ্রুতি নয়। এর শুরু এখনই, নিজের ভেতরে, নিজের বিবেকের সামনে।

– আব্দুর রহিম খান, সাংবাদিক, কবি ও লেখক

Advertisement