একটি পুরোনো ভবন। বয়স প্রায় এক শতাব্দীর পথে। সময়ের স্রোতে চারপাশ বদলে গেলেও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে মাদারগঞ্জ কো-অপারেটিভ ব্যাংক। একসময় যে প্রতিষ্ঠান ছিল কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের আস্থার ঠিকানা, আজ সেই ঐতিহাসিক স্থাপনাই জরাজীর্ণ হয়ে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করছে।
এটি শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মাদারগঞ্জের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্থাপত্যের ইতিহাস।
১৯৩১ সালের ২৫ জানুয়ারি উদ্বোধন
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, এই ভবনটি ১৯৩১ সালের ২৫ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন সি. এস. ঢাকার সহকারী রেজিস্ট্রার খান বাহাদুর মৌলভী কে. আহমেদ।
এর আগে ১৯২৯-১৯৩০ সালে অধিদপ্তরের ব্যবস্থাপনাকালে ইমারতটি নির্মাণ করা হয়। ভবনটির নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সে সময়ের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির নামও ইতিহাসের পাতায় রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন বাবু আসিনি মহন ঘোষ, মৌলভী মীর মোঃ মোফাজ্জাল, রিয়াজউদ্দিন আহমেদ, বাবু ধীরেন্দ্র মোহন দে বিএল, মৌলভী আসেক মামুদ তালুকদার, এমডি. ইসরাইল, একেএম বফাতউদ্দিন তালুকদার, আব্দুল হায় জামালী, বি.এ., তামিজউদ্দিন সরকার এবং সৈয়দ আলী আহমেদ। তৎকালীন ব্যবস্থাপনায় কেউ ডেপুটি চেয়ারম্যান, কেউ সম্মানীয় সচিব, কেউ পরিচালকসহ বিভিন্ন দায়িত্বে ছিলেন।
এই নামগুলো শুধু কিছু মানুষের নাম নয়, এগুলো মাদারগঞ্জের সমবায় আন্দোলনের প্রারম্ভিক সময়ের স্মারক।
প্রায় তিন একর জমি দান করেছিলেন খান বংশের পূর্বপুরুষরা
এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস জড়িয়ে আছে।
প্রায় তিন একর জায়গা এই প্রতিষ্ঠানের জন্য দান করেছিলেন গাবেরগ্রাম খান বংশের পূর্বপুরুষরা। অর্থাৎ শুধু একটি ভবন নির্মাণ নয়, একটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পেছনে স্থানীয় মানুষের ত্যাগ ও সহযোগিতাও রয়েছে।
আজ সেই বিশাল জায়গার অনেকটাই তার আগের রূপে নেই। বাউন্ডারি নেই, সামনের গেট ভেঙে গেছে। মেইন রোডের পাশ দিয়ে বিভিন্ন দোকানঘর নির্মাণ হওয়ায় মূল ভবনটি অনেকটাই আড়ালে পড়ে গেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো জানেই না, রাস্তার পাশের এসব স্থাপনার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে মাদারগঞ্জের প্রায় শত বছরের পুরোনো একটি ঐতিহাসিক ভবন।
মহাজনি শোষণের বিরুদ্ধে কৃষকের আশ্রয়
ব্রিটিশ আমলে বাংলার কৃষক ও সাধারণ মানুষ মহাজনদের উচ্চ সুদ এবং চক্রবৃদ্ধি সুদের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হতেন। সেই বাস্তবতায় সমবায় প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ তৈরি করেছিল।
মাদারগঞ্জ কো-অপারেটিভ ব্যাংকও ছিল সেই ধারার একটি অংশ। কৃষক ও সাধারণ মানুষকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া, সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং মহাজনি শোষণের বিকল্প তৈরি করাই ছিল এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য।
সময়ের সঙ্গে এই ব্যাংক শুধু একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকেনি, বরং মাদারগঞ্জের মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে।
কত কৃষক এখান থেকে ঋণ নিয়ে জমিতে ফসল ফলিয়েছেন, কত পরিবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে, কত ব্যবসার শুরু হয়েছে এই প্রতিষ্ঠানের সহায়তায়, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব হয়তো কোনো নথিতে নেই। কিন্তু মানুষের স্মৃতিতে সেই ইতিহাস আজও বেঁচে আছে।
ছিল খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক জীবনেরও কেন্দ্র
ব্যাংকের বিস্তৃত প্রাঙ্গণ ছিল মাদারগঞ্জের কয়েক প্রজন্মের শৈশব-কৈশোরের অংশ।
ফুটবল, ভলিবল, ব্যাডমিন্টনসহ বিভিন্ন খেলায় মুখর থাকত এই মাঠ। শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নানা কর্মকাণ্ডেরও সাক্ষী এই প্রাঙ্গণ।
এই পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন অনেকে। কেউ হয়েছেন খেলোয়াড়, কেউ শিল্পী, কেউ বড় নেতা, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ চেয়ারম্যান বা মেয়র, কেউ নাট্যশিল্পী। মাদারগঞ্জের বহু মানুষের স্মৃতির সঙ্গে তাই এই জায়গাটির সম্পর্ক ব্যক্তিগত ও আবেগের।
স্থাপত্যে মাদারগঞ্জের নিজস্ব পরিচয়
ভবনটির স্থাপত্যশৈলীও নজরকাড়া। পুরোনো নির্মাণশৈলী, কারুকাজ, প্রশস্ত প্রাঙ্গণ এবং চারপাশের বড় বড় গাছ মিলিয়ে স্থাপনাটি মাদারগঞ্জের একটি স্বতন্ত্র ঐতিহ্য বহন করে।
স্থানীয়দের অনেকেই ভালোবেসে একে ‘মাদারগঞ্জের তাজমহল’ বলে থাকেন।
কিন্তু সেই তাজমহল আজ আর আগের মতো নেই।
দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলায় ভবনটির বিভিন্ন অংশ ভেঙে গেছে। কোথাও কাঠামো দুর্বল, কোথাও পুরোনো অংশ ক্ষয়ে গেছে। সামনের গেট ভাঙা। নেই আগের বাউন্ডারি। আর প্রধান সড়কের পাশে গড়ে ওঠা দোকানঘরের কারণে ভবনটির দৃশ্যমানতাও কমে গেছে।
একটি শতবর্ষী ঐতিহ্য ধীরে ধীরে যেন মানুষের চোখের আড়ালে চলে যাচ্ছে।
ইতিহাস কি এভাবেই হারিয়ে যাবে?
১৯২৯-৩০ সালে নির্মাণ, ১৯৩১ সালের ২৫ জানুয়ারি উদ্বোধন, প্রায় তিন একর জমি দান, সমবায় আন্দোলনের ইতিহাস, কৃষকের পাশে দাঁড়ানোর স্মৃতি, কয়েক প্রজন্মের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সবকিছু মিলিয়ে মাদারগঞ্জ কো-অপারেটিভ ব্যাংক একটি জীবন্ত ইতিহাস। তাই এটিকে শুধু একটি পুরোনো ভবন হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
এটি মাদারগঞ্জের মানুষের স্মৃতি।
এটি কৃষকের সংগ্রামের ইতিহাস।
এটি স্থানীয় মানুষের দানের স্মারক।
এটি কয়েক প্রজন্মের বেড়ে ওঠার সাক্ষী।
এটি মাদারগঞ্জের স্থাপত্য ঐতিহ্যের অংশ।
এখনই প্রয়োজন সংরক্ষণের উদ্যোগ
এই ঐতিহাসিক ভবনটিকে রক্ষা করতে এখনই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমে ভবনটির ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যগত গুরুত্ব নির্ধারণ করে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে কাঠামোগত পরীক্ষা করা যেতে পারে। এরপর মূল নকশা ও স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
ভেঙে যাওয়া সামনের গেট পুনর্নির্মাণ, সীমানা নির্ধারণ ও বাউন্ডারি পুনঃস্থাপন, ভবনের সামনে অবৈধ বা অনুপযুক্ত স্থাপনা থাকলে তা পর্যালোচনা এবং ভবনটির দৃশ্যমানতা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
একই সঙ্গে ভবনের ইতিহাস সংবলিত একটি তথ্যফলক স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে ১৯৩১ সালের উদ্বোধন, নির্মাণকাল, দাতা পরিবার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম সংরক্ষণ করা হবে। এতে নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে, তারা যে জায়গাটির পাশ দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করে, সেটি আসলে কত সমৃদ্ধ ইতিহাস বহন করছে।
মাদারগঞ্জবাসী, স্থানীয় প্রশাসন, সমবায় বিভাগ, জনপ্রতিনিধি, সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে আগ্রহী ব্যক্তিদের সম্মিলিত উদ্যোগেই এই স্থাপনাকে বাঁচানো সম্ভব।
কারণ একটি ভবন ভেঙে গেলে শুধু ইট-পাথর হারায় না, হারিয়ে যায় একটি সময়ের গল্প।
মাদারগঞ্জ কো-অপারেটিভ ব্যাংক যেন আজও নীরবে বলে—
“আমি ১৯৩১ সালে তোমাদের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। কৃষকের পাশে ছিলাম, মানুষের স্বপ্নের পাশে ছিলাম। আজ আমি জরাজীর্ণ, আমার গেট ভাঙা, বাউন্ডারি নেই, দোকানের আড়ালে আমার মুখ ঢাকা। কিন্তু আমার বুকের ভেতর এখনো মাদারগঞ্জের প্রায় এক শতাব্দীর ইতিহাস।
যে ব্যাংক একদিন কৃষককে বাঁচিয়েছিল, আজ সে-ই বাঁচতে চায়। মাদারগঞ্জবাসী, তোমরা কি আমাকে বাঁচাবে?”
– আব্দুর রহিম খান, লেখক ও সাংবাদিক




