মাদারগঞ্জ প্রতিনিধি:
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে ১৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চরম বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে এবার ৪৩৯ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে মাত্র ১১১ জন। প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত পাসের হার দাঁড়িয়েছে ২৫ দশমিক ২৮ শতাংশ।
গত সোমবার (১০ আগস্ট) এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে। এমন ফলাফলে এসব প্রতিষ্ঠানের পাঠদান, একাডেমিক কার্যক্রম ও শিক্ষার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ফলাফলে সবচেয়ে বেশি বিপর্যয় দেখা গেছে নিশ্চিন্তপুর-কাতলামারী উচ্চ বিদ্যালয়ে। এ প্রতিষ্ঠান থেকে ১৫ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে মাত্র দুজন। লালডোবা উচ্চ বিদ্যালয়ে ২৩ জনের মধ্যে পাঁচজন, বীরমুক্তিযোদ্ধা গীতিকার নজরুল ইসলাম বাবু উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৮ জনের মধ্যে তিনজন এবং খিলকাটি আইডিয়া হাই স্কুলে ২৮ জনের মধ্যে ছয়জন পাস করেছে।
তেঘরিয়া শাহেদ আলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে ৭৮ জনের মধ্যে ২৩ জন, ইসলামাবাদ ওয়াসিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪৮ জনের মধ্যে ১০ জন, লোটাবর ছেরাতুন নেছা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৫৬ জনের মধ্যে ১৪ জন, কলাদহ মির্জা গোলাম মোস্তফা উচ্চ বিদ্যালয়ে ৭২ জনের মধ্যে ১৮ জন এবং তাহমিনা হাসান আলী আমিনুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ে ৪৯ জনের মধ্যে ১২ জন কৃতকার্য হয়েছে।
এ ছাড়া গিয়াস উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯ জনের মধ্যে পাঁচজন, গুনারীতলা উচ্চ বিদ্যালয় (কারিগরি) থেকে পাঁচজনের মধ্যে দুজন, ফুলজোর রহিম জাফর উচ্চ বিদ্যালয় (কারিগরি) থেকে তিনজনের মধ্যে একজন এবং চরনাংলা বেসরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ছয়জনের মধ্যে দুজন পাস করেছে।
দুটি দাখিল মাদরাসার ফলও সন্তোষজনক নয়। বি,ঘু,ন,ম ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা (ভোক) থেকে নয়জনের মধ্যে চারজন এবং চরপরতাজু দাখিল মাদরাসা থেকে ১০ জনের মধ্যে চারজন পাস করেছে।
সামগ্রিক ফলও হতাশাজনক
মাদারগঞ্জে এবার এসএসসি পরীক্ষার সামগ্রিক ফলও আশানুরূপ হয়নি। ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৩ হাজার ২৪০ জন পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছে ১ হাজার ৪৮২ জন। পাসের হার ৪৫ দশমিক ৭৪ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৩ জন।
তবে মাদরাসা শিক্ষায় তুলনামূলক ভালো ফল হয়েছে। ৬৩৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ৪৯৮ জন পাস করেছে। পাসের হার ৭৮ দশমিক ১৭ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে আটজন।
কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৪০৩ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ২৪৫ জন। পাসের হার ৬০ দশমিক ৮০ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১১ জন।
উপজেলায় একটি মাদরাসা ও দুটি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শতভাগ পাসের সাফল্য পেয়েছে। রাবেয়া রইচ বালিকা ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট ও নব্যচর বি.এম. স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে তিনজন করে পরীক্ষার্থী অংশ নিয়ে সবাই পাস করেছে। অন্যদিকে চরলোটাবর দাখিল মাদরাসা থেকে ১৯ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সবাই কৃতকার্য হয়েছে।
কারণ নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা
ফল বিপর্যয়ের কারণ জানতে চাইলে নিশ্চিন্তপুর-কাতলামারী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, দুর্বল শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ায় ফলাফলে এমন বিপর্যয় হয়েছে।
লালডোবা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শরিফুল ইসলাম বলেন, শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় অমনোযোগী। এ বিষয়ে অভিভাবকদের ডেকে একাধিকবার অবহিত করা হলেও কার্যকর ফল পাওয়া যায়নি।
তবে শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মতে, শুধু শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা বা অমনোযোগিতাকে দায়ী করে ফল বিপর্যয়ের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি, শিক্ষকদের পাঠদান, বিদ্যালয়ের একাডেমিক তদারকি, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তা ব্যবস্থা কার্যকর ছিল কি না, সেসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অভিভাবকদের দাবি, ফল প্রকাশের পর ব্যর্থতার কারণ খোঁজার পরিবর্তে শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করে বিশেষ পাঠদানের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে খারাপ ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত একাডেমিক তদারকির আওতায় এনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।
মাদারগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষাবিদদের মতে, একটি বা দুটি প্রতিষ্ঠানের খারাপ ফলকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না। কোন প্রতিষ্ঠানে কেন ধারাবাহিকভাবে ফল খারাপ হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের কোথায় ঘাটতি রয়েছে এবং শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনায় কী ধরনের দুর্বলতা আছে, তা চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। তাহলেই আগামী বছর ফলাফলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।




