Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 15:32 pm
মাদারগঞ্জ

চিঠি হারিয়েছে, গল্প রয়ে গেছে মাদারগঞ্জ পোস্ট অফিসে

চিঠি হারিয়েছে, গল্প রয়ে গেছে মাদারগঞ্জ পোস্ট অফিসে

চিঠি হারিয়েছে, গল্প রয়ে গেছে মাদারগঞ্জ পোস্ট অফিসে

“ক্রিং ক্রিং…”

Advertisement

সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ শুনলেই একসময় মাদারগঞ্জের গ্রামগুলোতে কৌতূহল ছড়িয়ে পড়ত। ডাকপিয়নের হাতে হয়তো এসেছে বহু প্রতীক্ষিত একটি চিঠি। দূর শহর, বিদেশ কিংবা অচেনা কোনো ঠিকানা থেকে আসা সেই খামের ভেতর লুকিয়ে থাকত প্রিয়জনের খবর, ভালোবাসা কিংবা জীবনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বার্তা।

একটি চিঠির জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষা—সেই সময় এখন অনেকটাই অতীত।

মুঠোফোনের একটি স্পর্শেই এখন মুহূর্তে খবর পৌঁছে যায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। কিন্তু একসময় যোগাযোগের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল ডাকঘর। একটি চিঠি মানুষের অপেক্ষাকে দীর্ঘ করত, আবার সেই চিঠিই অপেক্ষার অবসান ঘটাত।

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতার পঙ্‌ক্তি যেন সেই সময়েরই ছবি তুলে ধরে—

«“রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে,
রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে।”»

মাদারগঞ্জে ডাকঘরের শুরুর গল্প

ভারতীয় উপমহাদেশে ডাকব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ ব্রিটিশ আমলে শুরু হয়। ১৭৭৪ সালে কলকাতায় পোস্ট অফিস প্রতিষ্ঠার পর ধীরে ধীরে এ ব্যবস্থার বিস্তার ঘটে। ১৮৫৪ সালে আধুনিক ডাক বিভাগের সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হয়।

স্থানীয় প্রবীণদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯০৬ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে মাদারগঞ্জ সদরে থানা সাব-পোস্ট অফিস চালু হয়। তখন এটি জামালপুর পোস্ট অফিসের অধীনে কার্যক্রম পরিচালনা করত বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।

শুরুর দিকে পোস্ট অফিসটি ছিল মাদারগঞ্জ সদর পুরোনো থানার পাশে, কাচারি ঘরসংলগ্ন এলাকায়। বর্তমানে জায়গাটি তহসিল অফিসের পাশের এলাকা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, সে সময় পোস্টমাস্টারের দায়িত্বে ছিলেন মাদারগঞ্জ সদর ঠাকুর পরিবারের বসন্ত কুমার চক্রবর্তী।

পরে পোস্ট অফিসটি বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, মরহুম আশেক মাহমুদ তালুকদার পোস্ট অফিসের জন্য জমি দান করেন।

সদরেই রাখতে হয়েছিল লড়াই

মাদারগঞ্জ সদরের পোস্ট অফিসটি একসময় বালিজুড়ীতে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়। তখন পোস্ট অফিসটি সদরেই রাখার জন্য উদ্যোগী হন গাবের গ্রামের সন্তান ও তৎকালীন সময়ে মাদারগঞ্জের চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে পরিচিত নজরুল ইসলাম গুলু মণ্ডল।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব এম. এ. রশিদের সহযোগিতা নেন। তাঁর প্রচেষ্টায় পোস্ট অফিসটি সদরেই রাখার ব্যবস্থা হয় এবং পাকা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

পাকা ভবন নির্মাণের জন্য প্রয়োজন হয় জমির। তখন ভূমিকা রাখেন তৎকালীন ৪ নম্বর বালিজুড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মরহুম নজরুল ইসলাম দুলাল তালুকদার। তিনি ছিলেন আশেক মাহমুদ তালুকদারের নাতি। স্থানীয়ভাবে জানা যায়, তিনি নিজের অংশের জমি পোস্ট অফিসের নামে লিখিতভাবে প্রদান করেন।

স্থানীয়দের মতে, কয়েকজন মানুষের উদ্যোগ ও সহযোগিতার ফলেই মাদারগঞ্জ সদরে পোস্ট অফিসটি স্থায়ীভাবে গড়ে ওঠে।

চিঠির সঙ্গে ছিল মানুষের সম্পর্ক

একসময় মাদারগঞ্জ পোস্ট অফিস ছিল শুধু চিঠি আদান-প্রদানের জায়গা নয়, মানুষের আবেগেরও একটি ঠিকানা।

কারও অপেক্ষা ছিল প্রবাসী সন্তানের চিঠির জন্য। কেউ অপেক্ষা করতেন স্বামীর খবরের জন্য। কারও হাতে আসত চাকরির নিয়োগপত্র, কারও কাছে পৌঁছাত পরীক্ষার ফল কিংবা দূরের কোনো স্বজনের সংবাদ।

গ্রামের অনেক নিরক্ষর মানুষের কাছে ডাকপিয়ন ছিলেন শুধু সরকারি কর্মচারী নন—বিশ্বাসের একজন মানুষ। তিনি চিঠি পড়ে শোনাতেন, কখনো প্রয়োজন হলে উত্তর লিখতেও সাহায্য করতেন। ফলে ডাকপিয়নের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল এক ধরনের পারিবারিক সম্পর্ক।

মানুষের জীবনের ছোট-বড় অসংখ্য গল্পের নীরব সাক্ষী হয়ে উঠেছিল মাদারগঞ্জের ডাকঘর।

বদলে গেছে সময়, বদলেছে ডাকসেবা

১৯৮৩ সালে মাদারগঞ্জ উপজেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পোস্ট অফিসটির গুরুত্ব আরও বাড়ে। সময়ের সঙ্গে চিঠির পাশাপাশি যুক্ত হয় নানা ধরনের সেবা।

বর্তমানে মাদারগঞ্জ উপজেলা পোস্ট অফিসে পোস্ট সেভিংস ব্যাংক, ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার, সঞ্চয়পত্র, ডাক ও পার্সেলসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, এর অধীনে রয়েছে তিনটি সাব-পোস্ট অফিস ও ১৫টি গ্রামীণ শাখা ডাকঘর।

ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারে ব্যক্তিগত চিঠির ব্যবহার কমেছে। তবু ডাকঘরের প্রয়োজন শেষ হয়নি। মানুষের প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলে গেছে এর সেবার ধরন।

ভবনটি যেন সময়ের সাক্ষী

আজ আর আগের মতো ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা শোনা যায় না। চিঠির খাম হাতে নিয়ে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়ও নেই। মুঠোফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যোগাযোগের ধরন পাল্টে দিয়েছে।

তবু মাদারগঞ্জ পোস্ট অফিস দাঁড়িয়ে আছে নিজের জায়গায়।

তার দেয়ালে জমে আছে সময়ের ছাপ, আর মানুষের স্মৃতিতে রয়ে গেছে অসংখ্য চিঠির গল্প। একটি জনপদের সামাজিক ও যোগাযোগের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে আছে এই প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ পথচলা।

তাই মাদারগঞ্জ উপজেলা পোস্ট অফিস শুধু একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান নয়; এটি এই অঞ্চলের স্মৃতি ও সামাজিক ইতিহাসেরও অংশ।

ডাকসেবাকে আধুনিক করার পাশাপাশি পুরোনো নথি, ছবি ও ঐতিহাসিক তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানতে পারবে—একসময় মানুষের কাছে একটি চিঠির মূল্য কতটা ছিল।

চিঠি হয়তো হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে। কমে গেছে ডাকপিয়নের পদচারণা। কিন্তু অপেক্ষা, ভালোবাসা আর স্মৃতির সেই গল্পগুলো এখনো বেঁচে আছে।

– আব্দুর রহিম খান, লেখক ও সাংবাদিক

Advertisement