Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 16:04 pm
মাদারগঞ্জ

রাজপথের বিজয় যথেষ্ট নয়, বয়ানের যুদ্ধও জিততে হবে

রাজপথের বিজয় যথেষ্ট নয়, বয়ানের যুদ্ধও জিততে হবে

একটি আন্দোলন কখনো শুধু রাজপথে জয়ী হয়ে ইতিহাসে টিকে থাকে না। ইতিহাসে টিকে থাকে তখনই, যখন সেই আন্দোলন মানুষের চিন্তায়, সাহিত্যে, শিল্পে, গানে, চলচ্চিত্রে এবং গণমাধ্যমের ভাষায় নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে। রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি কেবল জনসমর্থন নয়, বরং মানুষের মনোজগতে নিজের বয়ান প্রতিষ্ঠা করার সক্ষমতা।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বিষয় বারবার চোখে পড়ে। বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি, এই তিনটি রাজনৈতিক দলেরই একটি বড় দুর্বলতা হলো তারা এখনো গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কৌশলের অপরিহার্য অংশ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেনি।

Advertisement

প্রশ্ন হচ্ছে, গত প্রায় ১৭ বছরে এই দলগুলো নিজেদের রাজনৈতিক দর্শন ধারণ করেন এমন কতজন সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, চলচ্চিত্র নির্মাতা, নাট্যকার, সংগীতশিল্পী কিংবা সাংস্কৃতিক কর্মী তৈরি করতে পেরেছে? কিংবা যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ভাবনার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন, তাদের কতজনকে সম্মান, দায়িত্ব ও নেতৃত্বের জায়গায় নিয়ে আসা হয়েছে?

বাস্তবতা হলো, এই জায়গায় অর্জন খুবই সীমিত।

অনেকে যুক্তি দেবেন, দীর্ঘদিন দমন-পীড়নের মধ্যে থাকায় এসব করার সুযোগ ছিল না। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রতিকূল পরিবেশের মধ্যেও কি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা যায় না? ইতিহাস বলে, যায়।

রাজনীতিতে ক্ষমতা হারানো মানেই বয়ান হারিয়ে ফেলা নয়। যে রাজনৈতিক শক্তি বছরের পর বছর সংস্কৃতি, গণমাধ্যম, গবেষণা ও মতামত গঠনের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে, তারা ক্ষমতার বাইরে থাকলেও সমাজে নিজেদের উপস্থিতি ধরে রাখতে পারে। কারণ রাষ্ট্র বদলায়, সরকার বদলায়, কিন্তু বয়ান সহজে বদলায় না।

জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়। এই আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক ছিল না, এটি ছিল সাংস্কৃতিক জাগরণেরও প্রতীক। রাজপথে যেমন তরুণরা ছিল, তেমনি ছিল কবিদের কণ্ঠ, শিল্পীদের তুলির আঁচড়, নির্মাতাদের ক্যামেরা, সংগীতশিল্পীদের প্রতিবাদের গান এবং অসংখ্য সাংস্কৃতিক কর্মীর নির্ভীক অবস্থান।

এই মানুষগুলোই আন্দোলনের প্রাণে নতুন ভাষা যোগ করেছিলেন।

কিন্তু আন্দোলনের পর সেই শক্তিকে কতটা সংগঠিত করা হয়েছে? কতজন লেখক, শিল্পী, সাংবাদিক কিংবা নির্মাতাকে বসিয়ে ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র ও সমাজ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে? কতজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নতুন বাংলাদেশ গড়ার বয়ান নির্মাণে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুব বেশি আশাব্যঞ্জক নয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তখন যদি বিভিন্ন ক্ষেত্রের মেধাবী সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, লেখক, গবেষক ও সাংবাদিকদের আরও বড় পরিসরে সম্পৃক্ত করা যেত, তাহলে একটি শক্তিশালী বিকল্প বয়ান গড়ে ওঠার সুযোগ ছিল। সমাজের সামনে নতুন চিন্তা, নতুন ভাষা এবং নতুন সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হতে পারত।

পরবর্তীতে বিএনপির ক্ষেত্রেও একই সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে। গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি অঙ্গনে নতুন মুখ, নতুন নেতৃত্ব এবং নতুন চিন্তার মানুষদের সামনে আনার উদ্যোগ খুব বেশি দৃশ্যমান হয়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি-নির্ভর সিদ্ধান্তই প্রাধান্য পেয়েছে। অথচ একটি রাজনৈতিক দলের শক্তি বাড়ে তখনই, যখন তার পাশে দক্ষ সাংবাদিক, লেখক, গবেষক, নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের একটি শক্তিশালী পরিসর তৈরি হয়।

আজকের পৃথিবীতে রাজনীতি শুধু সংসদে হয় না, টেলিভিশনের পর্দায় হয়, সংবাদপত্রের পাতায় হয়, ইউটিউবে হয়, সিনেমায় হয়, নাটকে হয়, কবিতায় হয়, এমনকি একটি গানের মধ্যেও হয়। মানুষ শুধু বক্তৃতা শোনে না, তারা গল্প শোনে, ছবি দেখে, গান গায় এবং সেখান থেকেই ধীরে ধীরে নিজেদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বোধ গড়ে তোলে।

সেই কারণেই গণমাধ্যম ও সংস্কৃতি কোনো রাজনৈতিক দলের বিলাসিতা নয়, এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন।

আমি এই কথাগুলো কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী হিসেবে বলছি না। একজন তরুণ সাংবাদিক হিসেবে বলছি, যে জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলো কাছ থেকে দেখেছে, সেই আন্দোলনের স্বপ্নে বিশ্বাস করেছে এবং এখনো বিশ্বাস করে, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল নির্বাচন দিয়ে নির্ধারিত হবে না; নির্ধারিত হবে মানুষের চিন্তা, মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক চেতনার মধ্য দিয়ে।

যদি জুলাইয়ের চেতনাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে হয়, তবে শুধু রাজনৈতিক সংগঠন শক্তিশালী করলেই হবে না। শক্তিশালী করতে হবে গণমাধ্যম, সাহিত্য, শিল্প, সংস্কৃতি এবং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরও। কারণ রাজপথের বিজয় ইতিহাসের সূচনা করতে পারে, কিন্তু সেই বিজয়কে প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকিয়ে রাখে কলম, কণ্ঠ, সংস্কৃতি এবং বয়ানের শক্তি।

রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার নয়, মানুষের মন জয় করার শিল্প। আর মানুষের মন জয় করতে হলে বয়ানের যুদ্ধেও জিততেই হবে।

– আব্দুর রহিম খান, গণমাধ্যমকর্মী

(প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব, মুক্তকালের সম্পাদকীয় নীতিমালার প্রতিফলন নাও থাকতে পারে)

Advertisement