Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 16:24 pm
মাদারগঞ্জ

নম্বর আছে, দক্ষতা নেই: রিডিং পড়তেই হোঁচট খাচ্ছে শিক্ষার্থীরা

নম্বর আছে, দক্ষতা নেই: রিডিং পড়তেই হোঁচট খাচ্ছে শিক্ষার্থীরা

একসময় বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের দিয়ে পাঠ্যবই পড়ানো ছিল নিয়মিত অনুশীলনের অংশ। শিক্ষক একটি অনুচ্ছেদ পড়তে বললে অধিকাংশ শিক্ষার্থী আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ত। ভুল হলে শিক্ষক তা সংশোধন করে দিতেন। সেই চর্চা ধীরে ধীরে কমে এসেছে। এখন এমন অনেক শিক্ষার্থী দেখা যায়, যারা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও বাংলা কিংবা ইংরেজি বই থেকে কয়েকটি লাইন সাবলীলভাবে পড়তে গিয়ে বারবার থেমে যায়।

এটি শুধু ভাষাগত দুর্বলতা নয়, বরং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও তুলে ধরছে। আমরা কি সত্যিই দক্ষ শিক্ষার্থী গড়ে তুলছি, নাকি শুধু ভালো ফলাফল অর্জনকারী পরীক্ষার্থী তৈরি করছি?

Advertisement

বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ বা ভালো ফলাফল অর্জন করছে। কিন্তু বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতার ক্ষেত্রে তাদের অনেকেই পিছিয়ে। একটি আবেদনপত্র লেখা, একটি প্রতিবেদন পড়ে বোঝা, কোনো বিষয়ে স্পষ্টভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করা কিংবা একটি বাংলা বা ইংরেজি অনুচ্ছেদ সঠিক উচ্চারণে পড়ে শোনানো অনেকের কাছেই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

উদ্বেগের বিষয় হলো, সমস্যা শুধু ইংরেজি রিডিংয়ে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক শিক্ষার্থী বাংলা বইও সাবলীলভাবে পড়তে পারে না। বিরামচিহ্নের ব্যবহার, উচ্চারণ, শব্দের স্বাভাবিক প্রবাহ কিংবা বাক্যের অর্থ অনুযায়ী পড়ার দক্ষতার অভাব স্পষ্টভাবে চোখে পড়ে। অথচ বাংলা তাদের মাতৃভাষা।

শিক্ষাবিদদের মতে, ভাষা শেখার ভিত্তি হলো নিয়মিত পড়ার অভ্যাস। একজন শিক্ষার্থী যত বেশি পড়বে, তার শব্দভান্ডার, উচ্চারণ, চিন্তার ক্ষমতা এবং আত্মবিশ্বাস তত বাড়বে। কিন্তু বর্তমানে পাঠ্যবইয়ের বাইরের বই পড়ার অভ্যাস ক্রমেই কমছে। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ কিংবা সংবাদপত্র পড়ার বদলে অনেকেই সময় কাটাচ্ছে মোবাইল ফোনের ছোট ছোট ভিডিও বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে।

এর প্রভাব শুধু ভাষায় নয়, সাধারণ জ্ঞানেও পড়ছে। অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বললে দেখা যায়, দেশের ইতিহাস, মহান মুক্তিযুদ্ধ, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দিবস, বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিচয়, সংবিধান, সমসাময়িক বিশ্ব কিংবা চলমান ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তাদের ধারণা খুবই সীমিত। কারণ পাঠ্যবইয়ের বাইরে জানার আগ্রহ এবং পড়ার অভ্যাস দুটিই কমে যাচ্ছে।

অবশ্য সব শিক্ষার্থীকে একইভাবে বিচার করা ঠিক হবে না। এখনও অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত বই পড়ে, সংবাদপত্র পড়ে, বিতর্ক করে এবং নিজেকে দক্ষ করে তুলতে কাজ করছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে পড়ার অভ্যাস কমে যাওয়ার প্রবণতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

এই পরিস্থিতির জন্য শুধু শিক্ষার্থীদের দায়ী করলে হবে না। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজেরও দায় রয়েছে। অনেক অভিভাবক সন্তানের নম্বর নিয়ে যতটা উদ্বিগ্ন, তার পড়ার অভ্যাস বা সাধারণ জ্ঞান নিয়ে ততটা গুরুত্ব দেন না। অন্যদিকে অনেক বিদ্যালয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতির চাপের কারণে রিডিং অনুশীলন, বক্তৃতা, আবৃত্তি, উপস্থাপনা কিংবা মুক্ত আলোচনার মতো কার্যক্রম পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না।

শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করা নয়। শিক্ষা এমন একটি প্রক্রিয়া, যা একজন মানুষকে চিন্তাশীল, দক্ষ, আত্মবিশ্বাসী এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য রিডিং দক্ষতা এবং সাধারণ জ্ঞান দুটিই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সময় এসেছে শিক্ষা নিয়ে নতুন করে ভাবার। নম্বরের পাশাপাশি ভাষাগত দক্ষতা, পাঠাভ্যাস, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং সাধারণ জ্ঞানের বিকাশকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বিদ্যালয়ে নিয়মিত বাংলা ও ইংরেজি রিডিং চর্চা, বই পড়ার কর্মসূচি, সংবাদপত্র পাঠ, বিতর্ক, কুইজ এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ড বাড়াতে হবে। পরিবারকেও শিশুদের হাতে শুধু মোবাইল নয়, বই তুলে দিতে হবে।

কারণ আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। তারা যদি পড়তে না পারে, বুঝতে না পারে এবং জানতে আগ্রহী না হয়, তাহলে ভালো ফলাফলের সনদ থাকলেও প্রকৃত শিক্ষার লক্ষ্য পূরণ হবে না। আমাদের দরকার শুধু নম্বরধারী নয়, জ্ঞান, দক্ষতা ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ একটি প্রজন্ম।

-আব্দুর রহিম খান, গণমাধ্যম কর্মী

 

(এখানে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। এতে সাপ্তাহিক মুক্তকালের সম্পাদকীয় নীতিমালার প্রতিফলন নাও থাকতে পারে) 

Advertisement