ময়মনসিংহে সত্যজিৎ রায়ের পারিবারিক বাড়ি ভাঙা হচ্ছে এমন খবর প্রচার হয়েছে ভারত ও বাংলাদেশের কিছু গণমাধ্যমে। এরপরই এ নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। যদিও ভাঙা বাড়িটি সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষদের নয় বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। লেখক-গবেষকরাও এমনটিই জানিয়েছেন।
ভাঙা হচ্ছে ময়মনসিংহ নগরীর হরিকিশোর রায় রোডের প্রাচীন একটি ভবন। প্রাচীন একতলা ভবনটি ১৯৮৯ সাল থেকে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি ব্যবহার করে আসছে। জীর্ণ ভবনটিতে ২০০৭ সালের পর থেকে আর কোনো কার্যক্রম চালানো যায়নি। পরিত্যক্ত ভবনটি ভেঙে তাই বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ শুরু করে শিশু একাডেমি।
এই বাড়িটি সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষের দাবি করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের এক মাঠকর্মী সম্প্রতি গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন এবং এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে তৈরি হয় বিভ্রান্ত। সত্যজিৎ রায়ের পারিবারিক বাড়ি ভাঙা হচ্ছে এমন সংবাদ প্রকাশ করে ভারতের বেশ কয়েকটি গণমাধ্যম। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া আসতে থাকে দেশটির উচ্চ পর্যায় থেকে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের শশীলজ জাদুঘরের মাঠ কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন বলছেন, হরিকিশোর রোডেই সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল। সেটি এখন আর নেই। আর যে বাড়িটি ভাঙা হচ্ছে এটি সেই বাড়ির খুবই কাছে এবং এটি একটি শতবর্ষী বাড়ি। একাধিক বই পড়ে ও ইউটিউব দেখে তিনি ধারণা করেছেন এটি সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষের বাড়ি হতে পারে। এ নিয়ে আরও গবেষণা দরকার বলে মনে করেন সাবিনা।
প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক স্বপন ধর বলছেন, নগরের হরিকিশোর রায় রোডেই ছিলো সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ উপেন্দ্রকিশোর রায়ের বাড়ি। পূণ্যলক্ষ্মী ভবন নামে পরিচিত। যদিও পুরোনো বাড়িটির কোনো চিহ্নই এখানে নেই। যেখানে বহু আগেই উঠেছে ১৪ তলা ভবন। এই বাড়ির সঙ্গে শিশু একাডেমির ভাঙাবাড়ির কোনো সম্পর্কও নেই। যে বাড়িটি সম্প্রতি ভাঙা হয়েছে, তা দানবীর রণদা প্রসাদ সাহার বাড়ি।
এদিকে বাড়িটি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে বুধবার (১৬ জুলাই) বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে সভার আয়োজন করা হয়। এতে লেখক, গবেষক, সচেতন নাগরিক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও শিশু একাডেমির কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
সভায় বাড়িটির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা পর্যালোচনা হয়। সকলের আলোচনা শেষে ময়মনসিংহ জেলা প্রশাসক মুফিদুল আলম বলেন, আমরা সকল স্টেক হোল্ডারের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছি। সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ময়মনসিংহ জেলার একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে দেশে এবং বিদেশে সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে। সংবাদটির ব্যাপারে আমাদের সকলের দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
তিনি বলেন, আপনাদের জানাচ্ছি যে, যে জমি বা বাড়িটি সত্যজিৎ রায় বা তার পূর্বপুরুষদের দাবি করা হচ্ছে সরকারি রেকর্ড ও নথিপত্র যাচাই বাছাই করে আমরা কোথাও সত্যজিৎ রায় ও তার পূর্বপুরুষের কারও নাম পাইনি। আরএস রেকর্ডে এটি বাংলাদেশ সরকারের নামে লিপিবদ্ধ। ২০০৮ সালে এটি মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির নামে বন্দোবস্ত করা হয়েছে এবং তাদের নামে দলিল সম্পাদিত হয়েছে। তারা যথাযথ প্রক্রিয়ায় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে ভবনটি ভাঙার কার্যক্রম শুরু করে। সে ক্ষেত্রে তারা নিয়মের কোন ব্যত্যয় করেনি।
জেলা প্রশাসক বক্তব্যে বলেন, এটি কি আসলে সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি ছিল কিনা বা তার পূর্বপুরুষের বাড়ি ছিল কিনা যেটা দাবি করা হচ্ছে সে বিষয়ে এ এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ও গবেষণকরা সকলে এক বাক্যে বলেছেন এটি কখনও সত্যজিৎ রায়ের বাড়ি ছিল না। ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে আমাদের দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করার জন্য এসব তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে এটি সত্যজিৎ রায় বা তার পূর্বপুরুষের বাড়ি না এবং তারা কখনো এখানে ছিলেন না। আশা করছি এর মাধ্যমে সবাই সত্যটা জানতে পারবে।
তবে সত্যজিৎ রায়ের পারিবারিক শেকড় রয়েছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে। সেখানে এখনো তার দাদা, প্রখ্যাত সাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায়ের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি সংরক্ষণ করছে বাংলাদেশ সরকার।




