Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 18:18 pm
সম্পাদকের পছন্দ

সম্পাদকীয়, হাদীর মৃত্যু, গণক্ষোভ এবং গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতা

হাদীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট জনক্ষোভ এক পর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়, যার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার কার্যালয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। যে কোনো গণতান্ত্রিক সমাজে সংবাদমাধ্যমে হামলা নিন্দনীয় এবং আইনের শাসনের পরিপন্থী—এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই। মতবিরোধ, ক্ষোভ কিংবা প্রতিবাদ কখনোই সহিংসতার মাধ্যমে প্রকাশ করা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তবে একই সঙ্গে এই ঘটনাকে শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন হিসেবে দেখলে বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষিত থেকে যাবে।

এই হামলার পেছনে যে ক্ষোভ কাজ করেছে, তার মূল উৎস বহুদিনের জমে থাকা আস্থাহীনতা। অভিযোগ রয়েছে—প্রথম আলো, ডেইলি স্টারসহ দেশের বেশকিছু প্রভাবশালী গণমাধ্যম বিগত আওয়ামী শাসনামলে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে একতরফা বয়ান নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে ভারতের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাষ্য প্রচার করে বিএনপি-জামায়াতসহ ভিন্নমতাবলম্বী রাজনৈতিক শক্তি এবং অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছে—এমন ধারণা সমাজের একটি বড় অংশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান।

Advertisement

আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, এসব পত্রিকা বিদেশি—বিশেষ করে ভারতীয়—অর্থায়ন বা প্রভাবের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অভিযোগ সত্য হোক বা না হোক, বাস্তবতা হলো এই ধারণা জনমনে গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। গণমাধ্যমের জন্য এটি একটি ভয়াবহ সংকেত। কারণ সংবাদমাধ্যমের সবচেয়ে বড় শক্তি তার বিশ্বাসযোগ্যতা; আর সেই বিশ্বাসযোগ্যতা একবার ভেঙে পড়লে তার প্রভাব কেবল গণমাধ্যমের ওপরই নয়, পুরো গণতান্ত্রিক পরিসরের ওপর পড়ে।

হাদীর মৃত্যুকে ঘিরে সংঘটিত এই ঘটনাগুলোকে তাই সহিংসতার বৈধতা হিসেবে নয়, বরং একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা প্রয়োজন। এটি স্পষ্ট করে দিয়েছে—বায়াসড সাংবাদিকতা, রাজনৈতিক দালালি এবং জনগণের আবেগ ও বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থান আর টেকসই নয়। ক্ষমতার সঙ্গে অতিরিক্ত সখ্য, একপেশে ভাষ্য এবং নির্বাচিত নীরবতা শেষ পর্যন্ত গণমাধ্যমকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করায়।

সামনের দিনে দায়িত্বশীল পথচলার জন্য প্রয়োজন আত্মসমালোচনা। সব গণমাধ্যমের উচিত নিজেদের সম্পাদকীয় নীতি, রাজনৈতিক অবস্থান ও পেশাগত নৈতিকতা নতুন করে পর্যালোচনা করা। সত্য, ন্যায্যতা ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে স্পষ্ট ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান গ্রহণ করাই পারে আস্থা পুনর্গঠন করতে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—আইনের শাসন নিশ্চিত করা, সহিংসতার বিচার করা এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখা।

হাদীর মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যম—সবার জন্যই একটি আয়না। সেই আয়নায় চোখ রেখে যদি শিক্ষা না নেওয়া হয়, তবে সামনে পথ চলা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।

Advertisement