হৃদয় আহম্মেদ শাওন, স্টাফ রিপোর্টারঃ
২০২৪ সালের সরকারি চাকরিতে কোটা পুনর্বহালসংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ধীরে ধীরে রূপ নেয় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলার মতো জামালপুরেও আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ২০২৪ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ধাপে ধাপে আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল জামালপুর। মানববন্ধন, বিক্ষোভ, রেলপথ অবরোধ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক পাল্টা অবস্থানের মধ্য দিয়ে জেলায় আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে।
আন্দোলনের সূচনা
৫ জুন সরকারি চাকরিতে কোটা বাতিলের পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট। এর প্রতিবাদে ৬ জুন থেকেই দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরবর্তীতে ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে ১ জুলাই থেকে দ্বিতীয় দফায় টানা কর্মসূচি শুরু হয়।
৮ জুলাই: প্রথম কর্মসূচি ও বাধা
৮ জুলাই কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের মূল ফটকে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হলে কলেজ ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তন্ময় আন্দোলনকারীদের ব্যানার কেড়ে নেন এবং কলেজ ত্যাগ করতে বলেন। এ ঘটনার পর কয়েকদিন আর কোনো কর্মসূচি হয়নি।
১০ জুলাই: কোটাব্যবস্থা পূনর্বহালের রায় বাতিল ও সংস্কারের দাবিতে জামালপুর-দেওয়ানগঞ্জ আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ করে জামালপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি কলেজের (তৎকালীন বশেফমুবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা।
১২ জুলাই: আবারও বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। চার রাস্তা থেকে শুরু হওয়া মিছিল পাঁচ রাস্তা পর্যন্ত গিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে। কর্মসূচি শেষে আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানে তাদের আন্দোলন না করার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে আন্দোলনকারীদের দাবি।
১৪ জুলাই: জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
১৫ জুলাই: রাতে বিভিন্ন গ্রুপে ১৬ জুলাই জামালপুর রেলওয়ে স্টেশন অবরোধের বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন সকালেই স্টেশনে পুলিশ ও ছাত্রলীগের অবস্থান দেখা যায়। পরে সেখানে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতির কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বড় অংশ স্টেশনে যাননি।
একই দিন দুপুরে সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে কয়েকটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা ইনকোর্স পরীক্ষা বর্জন করে শ্রেণিকক্ষের ভেতর স্লোগান দেন। অভিযোগ ওঠে, ছাত্রলীগের নেতারা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আটকে রাখেন। পরে পুলিশ গিয়ে তাদের বের করে আনে।
১৭ জুলাই: ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের মৃত্যুর পর কেন্দ্র থেকে গায়েবানা জানাজার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ১৭ জুলাই সকাল থেকেই জামালপুর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
প্রথমে সমাবেশের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল পাঁচ রাস্তা। পরে তা পরিবর্তন করে আজম চত্বরে (বর্তমান বিজয় চত্বর) নেওয়া হয়। শুরুতে উপস্থিতি কম থাকলেও কিছু সময় পর জেলা স্কুলের দিক থেকে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে একটি মিছিল সেখানে যোগ দেয়। এরপর মেডিকেল কলেজ, সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা সমবেত হলে পুরো এলাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয়।
গায়েবানা জানাজা শেষে বিক্ষোভ মিছিল শেখের ভিটা রেলক্রসিং এলাকায় পৌঁছে রেলপথ অবরোধ করে। এ সময় জামালপুর কমিউটার ট্রেন থামাতে ইঞ্জিন লক্ষ্য করে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে ইঞ্জিনের সামনে থাকা এক শিশুসহ কয়েকজন যাত্রী আহত হন। প্রায় ৪০ মিনিট পর অবরোধ তুলে নেওয়া হয়।
কলেজে হামলা, ভাঙচুর ও গ্রেপ্তার
পরে মিছিলটি সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে প্রবেশ করলে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অতর্কিত হামলা চালান। এতে সামনের সারিতে থাকা কয়েকজন ছাত্রী আহত হন।
এরপর আন্দোলনকারীরা কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলেন এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। কয়েকটি মোটরসাইকেলও ভাঙচুর করা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সেদিন রাতে অভিযান চালিয়ে অন্তত সাতজন শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এদিন সারা জেলায় আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। দেওয়ানগঞ্জের সানন্দবাড়ি, ইসলামপুরের গুঠাইল এলাকায় শিক্ষার্থীরা বড় আকারে বিক্ষোভ করে।
১৮ জুলাই: গেটপাড়ে সংঘর্ষ
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘোষিত ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১৮ জুলাই দুপুরে গেটপাড় এলাকায় শিক্ষার্থীরা জড়ো হন। এ সময় দেওয়ানগঞ্জগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেন রেললাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আন্দোলনকারীদের কারণে থেমে যায়। অল্প সময়ের মধ্যে হাজারো মানুষ সেখানে জড়ো হন।
আন্দোলনকারীদের অন্যতম দাবি ছিল আগের রাতে গ্রেপ্তার হওয়া শিক্ষার্থীদের মুক্তি।
প্রায় তিন ঘণ্টা পর পুলিশ সুপার মো. কামরুজ্জামান ঘটনাস্থলে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। এ সময় উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে ইটপাটকেল নিক্ষেপের পর পুলিশ টিয়ারশেল, কাঁদানে গ্যাস ও ছত্রভঙ্গ করতে বলপ্রয়োগ করে। আন্দোলনকারীরাও পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
টিয়ারশেলের ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়া কয়েকজন শিক্ষার্থীকে স্থানীয় বাসিন্দারা আশপাশের বাড়িতে নিয়ে সেবা দেন। আন্দোলনকারীদের দাবি, ওই সময় নারী শিক্ষার্থীরাও আহতদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন। অন্যদিকে পুলিশ আশপাশের বাড়িতে তল্লাশি চালানোর চেষ্টা করলে স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়ে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য।
সন্ধ্যার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
ইন্টারনেট বন্ধ, আবার মাঠে ফেরা
১৮ জুলাইয়ের পর ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আন্দোলনের গতি অনেকটা থেমে যায়। ২৮ জুলাই ইন্টারনেট চালু হলে আবারও যোগাযোগ শুরু হয়।
৩ আগস্ট: ফের উত্তাল জামালপুর
৩ আগস্ট জামালপুর মেডিকেল কলেজ এলাকা থেকে নতুন করে বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি বিজয় চত্বরে পৌঁছালে পুলিশের ব্যারিকেডের মুখে পড়ে। পরে ব্যারিকেড অতিক্রম করে পাঁচ রাস্তা হয়ে হাইস্কুল মোড় এলাকায় গেলে আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সদস্যরা তাদের ওপর হামলা চালান।
এ ঘটনায় বহু শিক্ষার্থী আহত হন। ওই দিনের সংঘর্ষে জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ফারহানের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র সদৃশ একটি অস্ত্র থাকার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে আরও কয়েকজনের কাছেও অস্ত্র দেখা গেছে বলে আন্দোলনকারীদের দাবি।
৪ আগস্ট: জামালপুরের বকশীগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ি, দেওয়ানগঞ্জে শিক্ষার্থীরা ভয়ভীতি উপেক্ষা করে মিছিল-সমাবেশ করে।
৫ আগস্ট: পতনের খবর, উদযাপনে জামালপুর
পরবর্তীতে কেন্দ্রীয়ভাবে এক দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। ৫ আগস্ট মাঠে নামার প্রস্তুতির মধ্যেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদ ভবন ও গণভবনে জনতার প্রবেশের খবর আসে।
খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর জামালপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ নিজ উদ্যোগে মিষ্টি বিতরণ করেন এবং আনন্দ-উল্লাসে অংশ নেন।
জামালপুর জেলার সাবেক প্রধান সমন্বয়ক ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি মীর ইসহাক হাসান ইখলাস স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “জুলাই আন্দোলনের কথা মনে হলেই এখনো গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকেই আমার আন্দোলনের পথচলা শুরু। তখন গ্রেপ্তার হয়ে বেশ কিছুদিন কারাগারেও থাকতে হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় একেকটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা ছিল আমাদের জন্য বিশাল চ্যালেঞ্জ। দিনের পর দিন বাড়িতে থাকতে পারিনি, আত্মগোপনে থাকতে হয়েছে। আমাদের কয়েকজনকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে নানা ধরনের নির্যাতন করা হয়েছিল, যাতে আমরা আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়াই। কিন্তু কোনো ভয়-ভীতি আমাদের দমাতে পারেনি। আমার চোখের সামনে কত ভাই মার খেয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, কত পরিবার সন্তান হারানোর আতঙ্কে দিন কাটিয়েছে এসব মনে হলেই আজও চোখ ভিজে যায়। ৫ আগস্ট যখন শুনলাম শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি। পরে নিশ্চিত হয়ে মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করেছি। মনে হয়েছিল দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ ও রক্তের বিনিময়ে অবশেষে বাংলাদেশ স্বৈরাচারের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পেয়েছে। আন্দোলনের প্রতিটি ধাপে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদ এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা কর্মসূচি নির্ধারণ করতাম।”
জামালপুর জেলা ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক জেলা সমন্বয়ক রাকিবুল হাসান রাকিব বলেন, “জুলাই আন্দোলনের কথা মনে হলে এখনো সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আন্দোলনের সময় কখন বাসায় ফিরতে পারব, আদৌ ফিরতে পারব কি না সেই অনিশ্চয়তা নিয়েই প্রতিদিন রাজপথে নামতাম। ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ধারণ করতাম। গভীর রাত পর্যন্ত গোপন বৈঠকে বসে পরবর্তী কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হতো। অনেক সহযোদ্ধাকে আহত হতে দেখেছি, অনেককে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে। ৫ আগস্ট স্বৈরাচারের পতনের খবর শুনে প্রথমেই শহীদদের কথা মনে পড়ে যায়। তখন মনে হয়েছিল তাদের রক্ত ও ত্যাগ বৃথা যায়নি। সেই মুহূর্তটি আমার জীবনের সবচেয়ে আবেগঘন ও স্মরণীয় মুহূর্তগুলোর একটি।”
জামালপুরের সাবেক সমন্বয়ক এবং তৎকালীন সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি শামসুদ্দিন সুলাইমান আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আহ! সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে এখনো বুক কেঁপে ওঠে। আন্দোলনের সময় আমরা কেউ স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারিনি। মেসে থাকা ছিল অনিরাপদ, বাসায় থাকা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কখন কোথায় অভিযান হবে, কখন কাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হবে—সেই আতঙ্কে দিন-রাত কাটত। তারপরও আমরা হাল ছাড়িনি। ছাত্রদল, ছাত্র অধিকার পরিষদ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে প্রতিটি কর্মসূচির পরিকল্পনা করেছি। রাত ১১টার পর শহরের গেটপাড় এলাকার ঈদগাহ মাঠে বসে দীর্ঘ সময় আলোচনা করে পরবর্তী কর্মসূচি ঠিক করতাম। মতভেদ ছিল, কিন্তু আন্দোলনের প্রশ্নে আমরা সবাই ছিলাম এক ও অভিন্ন। সেই ঐক্যই আন্দোলনকে সফলতার দিকে নিয়ে গেছে।”
আন্দোলনের সময় গ্রেপ্তার হওয়া ফিরুজ আহম্মেদ হিরা বলেন, “১৭ জুলাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত আমরা রাজপথে ছিলাম। ছাত্রলীগের হামলা উপেক্ষা করে আন্দোলন চালিয়ে গেছি। রাতে বাসায় ফেরার পর বিভিন্ন জায়গা থেকে খবর পাই যে আন্দোলনকারীদের ধরতে অভিযান চালানো হবে। আমি দ্রুত গ্রুপে সবাইকে সতর্ক করে দিই। কিন্তু রাত প্রায় ১টার দিকে পুলিশ আমার বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সেই মুহূর্তে আমার মায়ের কান্নার দৃশ্য আজও ভুলতে পারি না। তিনি হাউমাউ করে কাঁদছিলেন আর আমাকে জড়িয়ে ধরে রাখতে চাইছিলেন। মায়ের সেই বুকফাটা কান্না শুনে আমার নিজেরও চোখের পানি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এরপর আমাকে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারের প্রতিটি দিন ছিল অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার। জানতাম না কবে মুক্তি পাব, জানতাম না বাইরে আন্দোলনের কী অবস্থা। তবে একটাই বিশ্বাস ছিল এই আন্দোলন একদিন সফল হবেই। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের খবর যখন কারাগারের ভেতরে জানতে পারি, তখন মনে হয়েছিল দীর্ঘ অন্ধকারের শেষে আলোর দেখা মিলেছে। বন্দি সহযোদ্ধাদের সঙ্গে আমরা আনন্দে কেঁদেছিলাম। মনে হয়েছিল আমাদের ত্যাগ, কষ্ট আর নির্যাতন বৃথা যায়নি। অবশেষে ৭ আগস্ট কারামুক্ত হয়ে যখন পরিবারের কাছে ফিরে আসি, তখন সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। মায়ের চোখের পানি, স্বজনদের আনন্দ আর মানুষের ভালোবাসা আমাকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দিয়েছিল।”



