মোহাম্মদ সোহেল রানা ||
জামালপুর জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ইসলামপুর। ব্রিটিশ আমল থেকেই এই উপজেলার কাঁসাশিল্প আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিত ও সমাদৃত। ১৯৪২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার লন্ডনের বার্মিংহামে এক আন্তর্জাতিক হস্তশিল্প প্রদর্শনীর আয়োজন করে। সেখানে ইসলামপুরের প্রখ্যাত কাঁসাশিল্পী প্রয়াত জগৎচন্দ্র কর্মকার তার নিজ হাতে নির্মিত কারুকার্যমণ্ডিত কাঁসার তৈজসপত্র প্রদর্শন করেন। তার অনন্য শিল্পকর্ম বিশ্বজুড়ে প্রশংসা কুড়ায় এবং তিনি স্বর্ণপদক অর্জন করেন। এরপর থেকেই ইসলামপুরের কাঁসাশিল্প বিশ্ব দরবারে পরিচিতি লাভ করে এবং দিন দিন এর চাহিদা বাড়তে থাকে। পরবর্তীতে এটি একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প হিসেবে বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তকেও স্থান পায়।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, প্রায় তিনশ বছর আগে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে ইসলামপুরের কিংজাল্লা মৌজার (ফকির পাড়া) এলাকায় গড়ে ওঠে এ শিল্পের কেন্দ্র। শুরুতে মাত্র হাতে গোনা কয়েকজন কারিগর দিয়ে শুরু হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি জনপ্রিয়তা পায় এবং বিশ্বজুড়ে খ্যাতি অর্জন করে। ফলে এলাকাটি পরিচিতি পায় ‘কাঁসাড়ি পাড়া’ নামে।
চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কাঁসা দিয়ে তৈরি হতে থাকে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও নান্দনিক তৈজসপত্র, যেমন: ঘটি-বাটি, প্লেট, জগ, গ্লাস, বদনা, হুক্কা, খেলনা ও পূজার সামগ্রী। এগুলোর নির্মাণশৈলী এতটাই নিখুঁত ছিল যে, সেগুলো পারিবারিক ও ধর্মীয় কাজে অত্যন্ত সমাদৃত হয়ে ওঠে।
বাংলায় মিশ্র ধাতব শিল্প কবে, কোথায় এবং কীভাবে শুরু হয়েছিল সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য না থাকলেও, গবেষক ও নৃবিজ্ঞানীদের মতে এটি প্রাচীন সভ্যতার অংশ। প্রাচীনকালেই ব্রোঞ্জ দিয়ে তৈরি শিল্পকর্মের প্রচলন ছিল। অনেকে এই শিল্পের উৎপত্তি মহাস্থানগড় বা পাহাড়পুরের সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্কিত মনে করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এর শিকড় আদিযুগ পর্যন্ত বিস্তৃত।
একসময় ইসলামপুরের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কাঁসাশিল্প ছিল অন্যতম সহায়ক। ইসলামপুরে নির্মিত প্রথম দালান ছিল কাঁসাশিল্পের অর্থে গড়া। ব্রিটিশ আমল থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তী সময় পর্যন্ত এটি ব্যাংক হিসেবে ব্যবহৃত হতো, যা পরে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ইসলামপুর পৌর শহরের প্রাণকেন্দ্রে আজও রয়েছে কাঁসাশিল্প সমবায় সমিতির মূল্যবান সম্পদ।
তবে বর্তমানে প্লাস্টিক, স্টিল, কাঁচ ও সিরামিকের কমদামি তৈজসপত্র বাজার দখল করায় কাঁসার তৈরি পণ্যের চাহিদা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। কাঁচামালের মূল্য ও শ্রমিক খরচ বেড়ে যাওয়ায় কাঁসাশিল্প মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বর্তমান বাজারে কাঁসার একটি পণ্যের উৎপাদন ব্যয় যতো, তার তুলনায় বিক্রয়মূল্য অনেক কম—ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এতে অনেক কারিগর এবং মালিক তাদের পৈত্রিক পেশা ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তবুও এখনো অনেক পরিবার পূর্বপুরুষদের পেশা ধরে রেখে কাঁসাশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
প্রবীণ কারিগর এবং কাঁসাশিল্প সমবায় সমিতির নেতৃবৃন্দ জানান, দিনদিন এই শিল্প তার জৌলুশ হারাচ্ছে। অধিকাংশ কারিগরই নিম্ন আয়ের মানুষ, যাদের পর্যাপ্ত মূলধন নেই। ফলে তারা ব্যবসায় টিকে থাকতে পারছেন না। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে কারিগরদের আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।
তাদের আশঙ্কা, যদি এখনই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে ইসলামপুর থেকে কাঁসাশিল্প বিলীন হয়ে যেতে পারে। পূর্বপুরুষদের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এই শিল্পকে রক্ষা করতে শিল্পীরা সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও সংস্থার সহযোগিতা কামনা করেছেন। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ইসলামপুরের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প আবারও তার হারানো গৌরব ফিরে পেতে পারে।




