Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 14:23 pm
মুক্তমত

অপরিকল্পিত নগরায়ন: জামালপুর শহরে জলাবদ্ধতার কারণ

অপরিকল্পিত নগরায়ন: জামালপুর শহরে জলাবদ্ধতার কারণ

মো: আব্দুল হাই আলহাদী, বিভাগীয় প্রধান (বাংলা), সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ জামালপুর ।।

প্রকৃতিগতভাবেই নদীমাতৃক বাংলাদেশের অধিকাংশ জেলা শহর নদী তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠেছে। জামালপুর শহরও এর ব্যতিক্রম নয়। ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার দিক থেকে জামালপুর যে সুবর্ণ সুযোগ ও সুবিধা পেয়েছিল, তা দেশের খুব কম শহরের ভাগ্যেই জোটে। কিন্তু বর্তমানে সামান্য বৃষ্টিতেই এই শহর থৈ থৈ পানিতে তলিয়ে যায়, সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। প্রাকৃতিক আশীর্বাদ থাকা সত্ত্বেও আজ যে কৃত্রিম অভিশাপ শহরবাসীকে ভোগ করতে হচ্ছে, তার মূলে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ন ও অদূরদর্শী ব্যবস্থাপনা।
এক সময় জামালপুর শহরের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত চমৎকার ও স্বয়ংক্রিয়। বৃষ্টি হলেই শহরের পানি অনায়াসে গড়িয়ে চলে যেত প্রমত্তা ব্রহ্মপুত্র নদে। কালের বিবর্তনে ব্রহ্মপুত্র কিছুটা ভরাট হলেও এখনো তা প্রচুর জল ধারণ করতে পারে এবং এর প্রবাহ সচল রয়েছে। এই নদ ছাড়াও শহরের খুব কাছেই রয়েছে ঝিনাই নদী, যা জল অপসারণে বড় ভূমিকা রাখে। শহরের অভ্যন্তরীণ জল নিষ্কাশনের জন্য ছিল প্রাকৃতিক ধমনীর মতো দুটি প্রধান খাল—বংশ খাল ও গবা খাল। এ ছাড়া শহরের বুক চিরে চলে যাওয়া রেললাইনের দুপাশে ছিল বিস্তীর্ণ জলাশয় ও নিচু ভূমি, যা বৃষ্টির অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার বা পানিপ্রবাহের অন্যতম আধার (Reservoir) হিসেবে কাজ করত।
শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০০৬ সালে গবা খাল সৃষ্টি করে গবাখালি বিলে বা জলাশয়ে পানি চলে যাওয়ার পথ তৈরি করা হয়েছিল। ব্রহ্মপুত্র বা ঝিনাই নদীর জল যাতে শহরের ময়লা-আবর্জনায় দূষিত না হয়, সেজন্যই মূলত গবাখালিতে পানি ফেলার ব্যবস্থা করা হয়। পরিকল্পনাটি ছিল অত্যন্ত আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব। শহরের ময়লা বা বর্জ্যমিশ্রিত পানি সরাসরি নদীতে না ফেলে প্রথমে গবাখালি বিলের স্থির জলে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যাতে ভারী ময়লা নিচে জমে যায় এবং ওপরের পরিষ্কার পানি ধীর লয়ে ঝিনাই নদীতে গিয়ে পড়ে। এতসব প্রাকৃতিক ও সুপরিকল্পিত সুবিধা থাকার পরও আজ জামালপুর শহর জলাবদ্ধতার চাদরে ঢাকা পড়ছে।
জলাবদ্ধতার নেপথ্যে: অপরিকল্পিত নগরায়ন
জামালপুর শহরের বর্তমান এই জলজটের পেছনে মূল খলনায়ক হলো অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ন। প্রাকৃতিক জলাধারগুলোকে ধ্বংস করে যেভাবে শহর সম্প্রসারণ করা হচ্ছে, তারই মাশুল দিতে হচ্ছে নাগরিকদের। নগর উন্নয়নে পৌরসভা আজ পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট ‘মাস্টার প্ল্যান’ বা মহাপরিকল্পনা তৈরি করেনি। শহরের পানি ঠিক কোন দিক দিয়ে, কীভাবে নদীতে গিয়ে পড়বে—তার কোনো বৈজ্ঞানিক ও দীর্ঘমেয়াদি নকশা নেই। ফলে যা হচ্ছে, তা কেবলই সাময়িক চাহিদার ভিত্তিতে জোড়াতালির ড্রেনেজ ব্যবস্থা। আবাসন নির্মাণের হিড়িকে শহরের ভেতরের নিচু জলাশয়গুলো ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। এক সময়ের সচল বংশ খাল এখন ভরাট হয়ে মৃতপ্রায়। গবা খালটি দীর্ঘদিন পরিষ্কার বা খনন না করায় তা পানি নিষ্কাশনের যোগ্যতা হারিয়েছে। তাছাড়া খাল দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে গবাখালির যে নিচু ভ‍ূমি বা জলাশয়ে পড়ার কথা সে জলাশয়বা জলাধার ভরে গিয়েছে বা সেখানে আবাসিক স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে ।শেখের ভিটা এলাকার জলাশয়ের পানির স্বাভাবিক গতিপথও প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শহরের অনেক জায়গায় ড্রেনগুলো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে রাস্তার চেয়ে উঁচুতে নির্মাণ করা হয়েছে, ফলে রাস্তার পানি ড্রেনে প্রবেশ করতে পারে না। এছাড়া, শহরের প্রধান সড়কগুলোর পাশে এক বা দুই ইট নিচ থেকে গেঁথে দেয়াল নির্মাণ বা স্লাব বসানোর কারণে ড্রেনগুলো মারাত্মকভাবে সরু হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও পৌরসভার ড্রেন দখল বা সরু করে মার্কেট ও আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এক সময় রেললাইনের দুপাশের নিচু ভূমি পানি ধরে রাখত। কিন্তু বর্তমানে সেখানে উঁচু বাঁধ বা রাস্তা নির্মাণের ফলে প্রতিটি ক্ষেত্র বা অঞ্চল আলাদা হয়ে গেছে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়েছে।
জলমগ্ন জামালপুর: বিপন্ন জনপদ ও দুর্ভোগের চিত্র
অপরিকল্পিত এই নগরায়নের খড়্গ আজ নেমে এসেছে পুরো শহরের ওপর। সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে শুরু করে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো এখন পানির নিচে তলিয়ে যায়।এক সময় সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ এলাকায় চারপাশের প্রচুর বৃষ্টির পানি অনায়াসে অপসারিত হতো। কিন্তু এখন চারদিকের পানি প্রবাহের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই কলেজ ক্যাম্পাস ডুবে যায়। শুধু কলেজই নয়, এর পার্শ্ববর্তী গোলাপবাগ, বনপাড়া এবং নয়াপাড়ার মতো জনবহুল আবাসিক এলাকাগুলোও সামান্য পানিতে সম্পূর্ণ তলিয়ে যাচ্ছে। এর পাশাপাশি শহরের বর্ধিত ও জনবহুল আবাসিক এলাকা দাপুনিয়া, জঙ্গলপাড়া এবং শাহপুরও এখন তীব্র জলাবদ্ধতার শিকার। পানি অপসারণের কোনো সুনির্দিষ্ট পথ না থাকায় দিন দিন এই বিশাল এলাকার জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। জলাবদ্ধতার এই ক্ষত কেবল আবাসিক এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নেই, তা গ্রাস করেছে শহরের অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ পথকেও। সামান্য বৃষ্টিপাতেই শহরের বিসিক শিল্প এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়ে, যা স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য এক বিরাট বড় ধাক্কা। এর পাশাপাশি, শহরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সংবেদনশীল খাদ্যগুদাম রোড সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায়, যা জরুরি খাদ্য ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাকে ব্যাহত করে। স্টেশন এলাকাও প্লাবিত হয়। ফলে যাত্রীরা দুর্ভোগে গে পড়ে। এছাড়া, শহরের অন্যতম ব্যস্ত সড়ক পাঁচ রাস্তা থেকে চার রাস্তা, শেখের ভিটার রাস্তা, কাচাড়িপাড়ার রাস্তা, বানাকুড়া মোড়ের চারপাশের রাস্তা, মুসলিমাবাদের রাস্তা এবং বজ্রাপুরের রাস্তাসহ আরও অনেক প্রধান এলাকার সড়ক অবর্ণনীয় পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে স্থবির হয়ে পড়ে শহরের উৎপাদমুখী কর্মকাণ্ড, পণ্য পরিবহন, যান চলাচল এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা।
ভবন উঁচু করার প্রবণতা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়
জলাবদ্ধতার হাত থেকে বাঁচতে বর্তমানে জামালপুর শহরজুড়ে আবাসিক ভবনের ভিত (Plinth Level) উঁচুতে নির্মাণ করার এক নতুন প্রবণতা তৈরি হয়েছে। মানুষ নিজের বাড়িটি বাঁচাতে উঁচুতে ভবন নির্মাণ করছে। এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ভবনের ভিত উঁচু করায় বাসায় গাড়ি উঠাতে সমস্যা হয় । সেখানেও তৈরি হয় আরেক জটিলতা । গাড়ি উঠাতে বা নিজেদের উঠার সুবিধার জন্য তখন রাস্তার দুই তিন ফুট দখল করা হয় বাসায়উঠার স্লপিং নির্মাণৈর জন্য । এতে রাস্তা সরু হয়ে যায় বা ফুটপাত দিয়ে জন চলাচল বিঘ্নিত হয় । আবার ভবনের ভিত উঁচু করা সম্ভব হলেও শহরের রাস্তাঘাট এভাবে প্রতিনিয়ত উঁচু করা সম্ভব নয়। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, এর চেয়ে কম উচ্চতার রাস্তা থাকা সত্ত্বেও অতীতে জামালপুরের পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতো। সুতরাং, রাস্তার বা ভবনের উচ্চতা বাড়ানো বড় কথা নয়, পানির গতিপথ বা ‘ন্যাচারাল ফ্লো’ (Natural Flow) ঠিক রাখাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
উত্তরণের উপায় ও করণীয়
জামালপুর শহরকে এই অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে এখনই ক্রাশ প্রোগ্রাম বা জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। ড্রেন, খাল, জলাশয় এবং নদীর জমি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে অবিলম্বে মুক্ত করতে হবে। বংশ খাল এবং গবা খাল অবিলম্বে পুনর্খনন করে পানি চলাচলের উপযোগী করতে হবে। একই সাথে শেখের ভিটা, বিসিক শিল্প এলাকা, খাদ্যগুদাম রোড, দাপুনিয়া, জঙ্গলপাড়া, শাহপুর এবং আশেক মাহমুদ কলেজ এলাকার পানির গতিপথ সচল করতে হবে। গবাখালি বিলের সেই দূরদর্শী বর্জ্য শোধন পরিকল্পনাটি পুনরায় সক্রিয় করা প্রয়োজন।একজন দক্ষ নগর পরিকল্পনাবিদের সহায়তায় পৌরসভার উদ্যোগে দ্রুত একটি আধুনিক, দীর্ঘমেয়াদি ও বিজ্ঞানসম্মত ড্রেনেজ মাস্টার প্ল্যান তৈরি করতে হবে। ড্রেন সরু করে বা ড্রেনের ওপর দেওয়াল ও মার্কেট নির্মাণ কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। ড্রেনের সর্বত্র কাবার বা ঢাকনা দিতে হবে যাতে ভেতরে ময়লা -আবর্জনা না যায় । তাছাড়া শহরবাসীকেও সচেতন হতে হবে; সচেতনতা বাড়াতে হবে ।
জামালপুর শহরের জলাবদ্ধতা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের ফসল। প্রকৃতি আমাদের নদী, খাল ও জলাশয় দিয়ে পানি নিষ্কাশনের চমৎকার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, কিন্তু আমরা আমাদের দূরদর্শিতার অভাবে তা ধ্বংস করেছি। এখনও সময় আছে, যদি দ্রুত খালের দখলমুক্তকরণ, খনন এবং একটি সুপরিকল্পিত মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন করা যায়, তবে জামালপুর শহর আবার তার পুরনো ও সচল রূপ ফিরে পাবে। আর এর জন্য প্রয়োজন পৌর প্রশাসন ও শহরবাসীর সম্মিলিত সদিচ্ছা ও কঠোর পদক্ষেপ।

Advertisement

লেখক: বিভাগীয় প্রধান (বাংলা),
সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ জামালপুর ।।

 

(মুক্তমতে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব, এতে সাপ্তাহিক মুক্তকালের সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নাও থাকতে পারে)

Advertisement