মো. আবু হানিফ : জামালপুরের মানুষের কাছে রাজীব পরিবহন শুধু একটি বাসের নাম নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অংশ। ভোরের আলো ফুটতেই জামালপুর, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী, মেলান্দহ, ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শত শত মানুষ এই বাসে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন। কারও গন্তব্য কর্মস্থল, কারও বিশ্ববিদ্যালয়, কারও হাসপাতাল, আবার কেউ ছুটে যান পরিবারের দায়িত্ব পালনে।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই যাত্রাপথ অনেকের কাছে এখন নিরাপত্তার নয়, বরং আতঙ্কের নাম।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজীব পরিবহন জড়িত একাধিক দুর্ঘটনার খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। ২০২৫ সালে জামালপুর সদরে অটোরিকশাকে ধাক্কা দিয়ে প্রাণহানির ঘটনা, একই বছরে কাভার্ড ভ্যানের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হওয়া এবং ২০২৬ সালের চলতি মাসেই একদিনের ব্যবধানে দুইটা দুর্ঘটনা ঘটেছে। একটি ঘটনায় দুইজন নিহত ও হতাহত কয়েকজন এবং অন্য আরেকটি ঘটনা মাদারগঞ্জ রোডে পেছন থেকে সিএনজিকে ধাক্কা দিয়ে উপজেলা বিএনপি নেতা ও তার পরিবার সহ তিনজন গুরুতর আহত, উপজেলা বিএনপি নেতা ও তার স্ত্রী ঢাকা একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। —এসব ঘটনা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পর একই প্রশ্ন ওঠে—কেন?
যাত্রীদের অভিযোগ নতুন নয়। অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাস চালানো, অনেক ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন উপেক্ষা এবং চালকদের দীর্ঘ সময় বিশ্রামহীনভাবে গাড়ি চালানোর অভিযোগ বহুদিনের। এসব অভিযোগের সবগুলো প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে প্রমাণিত নয়, তবে যখন একই ধরনের অভিযোগ বারবার শোনা যায়, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
একজন চালকের হাতে থাকে শুধু একটি স্টিয়ারিং নয়—থাকে চল্লিশ-পঞ্চাশটি পরিবারের স্বপ্ন। কয়েক মিনিট আগে পৌঁছানোর প্রতিযোগিতায় যদি একটি জীবনও ঝরে যায়, তবে সেই তাড়াহুড়ার কোনো মূল্য নেই।
প্রতিটি দুর্ঘটনার পর কয়েক দিন আলোচনা হয়, তদন্ত কমিটি গঠন হয়, তারপর সবকিছু আবার আগের মতো চলতে থাকে। কিন্তু যেসব পরিবার তাদের স্বজন হারায়, তাদের জীবনে সেই দুর্ঘটনার শেষ হয় না। একটি শিশুর বাবাহীন হয়ে যাওয়া, একটি মায়ের সন্তান হারানো কিংবা একটি পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির মৃত্যু—এসব কোনো পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না।
জামালপুরবাসী রাজীব পরিবহন বন্ধ দেখতে চায়—এমন কথা নয়। মানুষ চায় নিরাপদ রাজীব পরিবহন। তারা চায় দক্ষ ও প্রশিক্ষিত চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ি বন্ধ, নির্ধারিত গতিসীমা মেনে চলা, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বন্ধ এবং সড়ক আইনের কঠোর বাস্তবায়ন।
আমাদের প্রশ্ন শুধু রাজীব পরিবহনের প্রতি নয়; বিআরটিএ, হাইওয়ে পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতিও। দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা নয়—দুর্ঘটনার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কোথায়? নিয়মিত নজরদারি, চালকদের সক্ষমতা যাচাই এবং আইন প্রয়োগে কঠোরতা থাকলে হয়তো অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।
জামালপুরের মানুষ আর কোনো শোকের মিছিল দেখতে চায় না। প্রতিটি বাস যেন নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছায়—এটাই তাদের একমাত্র প্রত্যাশা। রাজীব পরিবহনসহ সব পরিবহন মালিক, চালক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মনে রাখা উচিত—একটি দুর্ঘটনা শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেয় না; এটি একটি পরিবারের ভবিষ্যৎও কেড়ে নেয়।
নিরাপদ সড়ক কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের ন্যায্য অধিকার। এখন সময় এসেছে সেই অধিকার বাস্তবে নিশ্চিত করার।
