Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 14:37 pm
অন্যান্য

আট বছর ধরে অকেজো সেতু, বিচ্ছিন্ন জনপদ: দুর্ভোগে ২০ হাজার মানুষ

আট বছর ধরে অকেজো সেতু, বিচ্ছিন্ন জনপদ: দুর্ভোগে ২০ হাজার মানুষ

Oplus_131072

হৃদয় আহম্মেদ,জামালপুরঃ

উন্নয়নের নানা গল্পে যখন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোও বদলে যাওয়ার কথা শোনা যায়, তখন জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারীতলা ও কড়ইচড়া ইউনিয়নের ভেলামারী সীমান্তবর্তী এলাকার কয়েকটি গ্রামের মানুষ যেন সেই উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। দীর্ঘ প্রায় আট বছর ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু অকেজো হয়ে পড়ে থাকায় চরম দুর্ভোগে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় শিক্ষার্থী, কৃষক, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

Advertisement

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, ভেলামারী, মৃধাপাড়া, গুনারীতলাসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষের চলাচলের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই সেতু। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেতুটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত নতুন করে নির্মাণ কিংবা সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বিকল্প পথে চলাচল করতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয় ও কলেজে যেতে অনেক শিক্ষার্থীকে কয়েক কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হয়। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। কাদামাটি ও পানিতে ডুবে থাকা পথ অতিক্রম করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো অনেক সময় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাজীবনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বালিজুড়ি এফ.এম. উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রবিউল ইসলাম বলেন, “এই সেতুর কারণে আমাদের প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া-আসায় অনেক কষ্ট হয়। বর্ষাকালে পানি-কাদা পেরিয়ে যাতায়াত করতে হয়, অনেক সময় সময়মতো স্কুলে পৌঁছানো যায় না। দ্রুত সেতুটি ঠিক করা হলে আমাদের পড়াশোনায় অনেক সুবিধা হবে।”

মাদারগঞ্জ এ.এইচ.জেড. সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী মোতালেব ইসলাম বলেন, “এই সেতুটি দীর্ঘদিন ধরে অকেজো অবস্থায় পড়ে থাকায় আমাদের যাতায়াতে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি হচ্ছে। বিশেষ করে কলেজে আসা-যাওয়ার সময় অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হয়, এতে সময় ও খরচ দুটোই বেড়ে যায়। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। দ্রুত সেতুটি সংস্কার বা নতুন করে নির্মাণ করা হলে শিক্ষার্থীসহ পুরো এলাকার মানুষ উপকৃত হবে।”

কৃষিপ্রধান এই অঞ্চলের কৃষকরাও পড়েছেন চরম বিপাকে। মাঠে উৎপাদিত ধান, পাট, শাকসবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য বাজারে নিতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পরিবহন সংকটের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় ব্যবসা-বাণিজ্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

স্থানীয় কৃষক কফিলউদ্দিন বলেন, “ভাই, এই সেতুটা নষ্ট হয়ে থাকায় আমাদের খুব কষ্ট হইতাছে। মাঠে ধান-সবজি যা ফলাই, বাজারে নিতে অনেক ঘুরপথে যাইতে হয়। গাড়ি ভাড়া বেশি লাগে, সময়ও বেশি লাগে। বর্ষাকালে তো একদম যাইতে পারি না। যদি সেতুটা ঠিক করা হইতো, আমাদের মতো গরিব কৃষকের অনেক উপকার হইতো।”

শুধু অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নয়, জরুরি স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হচ্ছে। কোনো রোগী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে অ্যাম্বুলেন্স কিংবা অন্য কোনো যানবাহন প্রবেশ করতে না পারায় রোগীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। স্থানীয়দের দাবি, অনেক সময় রোগীর জীবনও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

এলাকার বাসিন্দা রোকসানা বেগম বলেন, “এই সেতুটা নষ্ট থাকায় আমাদের খুব কষ্ট হচ্ছে। কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে পারি না, অনেক সময় জীবন নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। মনে হয় যেন আমরা এখনো পিছিয়ে পড়া এক জায়গায় পড়ে আছি। দ্রুত সেতুটি ঠিক হলে আমাদের কষ্ট একটু হলেও কমবে।”

স্থানীয় সহকারী শিক্ষক হুমায়ুন কবির বলেন, “একটি সেতুর অভাবে হাজার হাজার মানুষ বছরের পর বছর কষ্ট ভোগ করছে। উন্নয়নের এই সময়ে এমন পরিস্থিতি সত্যিই দুঃখজনক। দ্রুত সেতু ও পাকা রাস্তা নির্মাণ করা হলে এলাকার মানুষের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে।”

অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য হুমায়ুন কবির বলেন, “এটি শুধু একটি সেতুর দাবি নয়, এটি হাজারো মানুষের মৌলিক যোগাযোগ অধিকারের প্রশ্ন। দীর্ঘদিন ধরে মানুষ দুর্ভোগে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া।”

এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে বিষয়টি জানানো হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

এ বিষয়ে মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে আমি জানতে পেরেছি যে সেতুটি ২০১৯ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে দুটি ইউনিয়নের মানুষের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং কার্যত যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা সেতুটি পুনর্নির্মাণের দাবিতে মানববন্ধনও করেছেন বলে জেনেছি। বিষয়টি আমি জেলা প্রশাসকের সমন্বয় সভায় উত্থাপন করব এবং দ্রুত সমাধানের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানাব।”

Advertisement