Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 15:10 pm
ফিচার

বিষের দেশে

বিষের দেশে

মোহাম্মাদ আলী
রাত তিনটায় ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে যখন কবির হোসেনের পা পড়ল, তখন বাইরে হালকা বৃষ্টি পড়ছিল।
বিশ বছর।
দুই দশক ধরে এই মাটির গন্ধ নাকে আসেনি। অথচ আজ টার্মিনালের দরজা খুলতেই ভেজা মাটি আর জ্যাসমিনের মিশ্র একটা গন্ধ নাকে এসে লাগল — এবং বুকের ভেতরটা কোথায় যেন কেঁপে উঠল।
বাইরে অপেক্ষারত মানুষগুলোর দিকে তাকালেন তিনি। কেউ তাকে নিতে আসেনি। কার কথাই বা মনে থাকবে? বাবা মারা গেছেন যখন কবিরের বয়স সাত, মা তার দুবছর পরেই। তারপর চাচার বাড়িতে থেকে পড়াশোনা, তারপর স্কলারশিপ, তারপর আমেরিকা — যেন একটার পর একটা দরজা খুলে গেছে, আর তিনি শুধু হেঁটে গেছেন।
পেছনে ফিরে তাকানোর সুযোগ হয়নি।
ধানমন্ডিতে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিল আগেই। রাজধানীর একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় তাকে পূর্ণ অধ্যাপক পদে নিয়োগ দিয়েছে — ফুড সায়েন্স ও নিউট্রিশন বিভাগে। আমেরিকার একটি ইউনিভার্সিটিতে পনেরো বছর পড়িয়েছেন তিনি। আমেরিকার স্থায়ী বাসিন্দা, গ্রিন কার্ড আছে, একটি ভালো বেতনের চাকরি ছিল — তবু ফিরে এসেছেন।
কেন?
নিজেই পুরোপুরি জানেন না। হয়তো একটা অপরাধবোধ। হয়তো একটা ঋণ শোধের ইচ্ছা। অথবা, মাঝরাতে জেগে উঠে যখন মনে হতো — এই জীবনে আমি কী দিয়ে গেলাম — তখন যে উত্তরটা মাথায় আসত।
দেশকে কিছু দিয়ে যাও।
প্রথম সপ্তাহে ফ্ল্যাটের একটা ঘরে ছোট ল্যাব বানিয়ে নিলেন কবির। সাথে আনা যন্ত্রপাতি, আর ঢাকা থেকে কিনে নেওয়া কিছু সরঞ্জাম। সহকারী হিসেবে নিলেন আবিদ নামের এক তরুণকে — কেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করেছে, চোখে স্বপ্ন আছে। কবির বাংলাদেশের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস সম্পর্কে ভালো করেই জানতেন। তাই শুরুতেই এসবের উপর একটা পরীক্ষা চালাতে চাইলেন। তাই আবিদ বাজারে যাচ্ছে। স্যাম্পল সংগ্রহের জন্য।
“স্যার, বাজার থেকে কী কী আনব?” আবিদ জিজ্ঞেস করেছিল।
“সব কিছু। চাল, শাকসবজি, মাছ, মাংস, ফলমূল। বাজারের সবচেয়ে সাধারণ জিনিসগুলো।”
আবিদ অবাক হয়ে তাকিয়েছিল। “টেস্ট করবেন?”
“প্রতিটা।”
ফলাফল আসতে তিন দিন লাগল।
কবির রিপোর্টগুলো একের পর এক পড়ছিল। রাফি পাশে দাঁড়িয়ে। দুজনের মধ্যে কথা নেই।
চালে আর্সেনিক — অনুমোদিত মাত্রার চার গুণ। শাকসবজিতে অর্গানোফসফেট কীটনাশক — এত বেশি যে ইউরোপীয় ইউনিয়নে এই শাক বিক্রি করলে সাথে সাথে জরিমানা হত। মাছে ফরমালিন আর ক্রোমিয়াম। মুরগিতে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি এতটাই বেশি যে এই মুরগির মাংস নিয়মিত খেলে মানুষের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করা বন্ধ করে দিতে পারে।
নদীর মাছেও একই ছবি। কারণটা সহজ — নদীতে মিশে যাওয়া সার, কীটনাশক, কলকারখানার বর্জ্য। মাছ সেই পানি খায়, সেই পানিতে বাঁচে।
ফলে লেড, ক্যাডমিয়াম, মার্কারি।
“স্যার,” আবিদ আস্তে বলল, “এই রিপোর্ট যদি সত্যি হয়…”
“সত্যি।” কবির চেয়ার থেকে উঠল। জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে ধানমন্ডি লেক। বিকেলের আলোয় পানিটা চকচক করছে।
সুন্দর দেখাচ্ছে। কিন্তু ওই পানিতেও কী আছে — তিনি জানেন।
“সরকারকে জানাতে হবে।”
খাদ্য মন্ত্রণালয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট পেতে দুই সপ্তাহ লাগল।
মন্ত্রীর সাথে দেখা হলো না। সচিব মহোদয় দেখা দিলেন। ভদ্রলোক কবিরের রিপোর্ট হাতে নিয়ে পাতা উল্টালেন, তারপর চশমা খুলে টেবিলে রাখলেন।
“ড. কবির, আপনি আমেরিকা থেকে এসেছেন। সেখানকার মান আর এখানকার মান এক না।”
“মহোদয়, আমি WHO-র মান ব্যবহার করেছি। বাংলাদেশের নিজস্ব খাদ্য নিরাপত্তা আইনের মানদণ্ড ব্যবহার করেছি। এই রিপোর্টে যা আছে তা সে মান অনুযায়ীও গ্রহণযোগ্য নয়।”
সচিব চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “আপনার গবেষণা নিঃসন্দেহে মূল্যবান। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখব।”
“কতদিনে?”
“যথাসময়ে।”
কবির বুঝল — যথাসময় মানে কখনো না।
হামলাটা হলো বৃহস্পতিবার রাতে।
মিরপুর রোডে রিকশা থেকে নামছিল তিনি। হঠাৎ একটা মোটরসাইকেল এসে থামল। দুজন লোক। মুখ ঢাকা।
পরের কয়েক সেকেন্ড কবিরের মনে নেই।
শুধু মনে আছে — একটা গলার আওয়াজ। “ভাই, কী হইছে? ভাই!” এবং কেউ একজন তাকে ধরে ফুটপাথে বসিয়ে দিচ্ছে।
চোখ মেলে দেখল — একজন তরুণ। হাতে ক্যামেরা।
“আমি সাংবাদিক। দৈনিক প্রতিদিনে কাজ করি। ভাই, আপনি ঠিক আছেন?”
মাথার পেছনে একটা ব্যথা। হাতে কাটা দাগ। কিন্তু বেঁচে আছে।
সামান্যের জন্য।
সাংবাদিকের নাম তানভীর।
সেই রাতে কবিরের ফ্ল্যাটে বসে চা খেতে খেতে তানভীর বলল, “স্যার, আপনি মন্ত্রণালয়ে গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই খবর গেছে।”
“মানে?”
তানভীর একটু চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল, “এই দেশে একটা সিন্ডিকেট আছে স্যার। খাদ্য ব্যবসা থেকে শুরু করে কীটনাশক আমদানি, সার, মাছের আড়ত — সব একটা চেইনে বাঁধা। এই চেইনে আছে ব্যবসায়ী, আছে আমলা, আছে রাজনীতির ছায়া। এরা একে অপরকে রক্ষা করে।”
কবির চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল। “তুমি জানো এসব?”
“আমার কাছে প্রমাণ আছে স্যার। ডকুমেন্ট, অডিও, ছবি। দুবছর ধরে সংগ্রহ করেছি।”
“তাহলে রিপোর্ট করোনি কেন?”
তানভীর হাসল। তিক্ত একটা হাসি। “আমার সামনে একটা ছেলে আছে, স্যার। পাঁচ বছর বয়স। আমার ছেলে।”
ঘরে নীরবতা নামল।
“আপনাকে আমি সৎ পরামর্শ দেব,” তানভীর বলল। “আমেরিকায় ফিরে যান। এই দেশে ভালো মানুষের জায়গা নেই।”
পরদিন সকালে কবির ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল। বিভাগীয় প্রধানকে বলল ছুটি দরকার।
“কতদিনের?” প্রধান জিজ্ঞেস করলেন।
কবির একটু থামল।
“জানি না।”
বিমানবন্দরে যাওয়ার আগে তিনি একবার ধানমন্ডি লেকের পাড়ে দাঁড়ালেন। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। পানির ওপর আলো পড়েছে। দূরে কোথাও আজান হচ্ছে।
বিশ বছর আগে এই দেশ ছেড়ে গিয়েছিলেন তিনি এক ধরনের শূন্যতা নিয়ে।
আজও ফিরছেন শূন্যতা নিয়েই।
কিন্তু এই শূন্যতাটা আলাদা। এটা পরাজয়ের শূন্যতা।
বোর্ডিং পাসটা হাতে নিয়ে তিনি বিমানের দিকে হাঁটল। পেছন থেকে ঢাকার শব্দ ভেসে আসছিল — হর্ন, আজান, কোলাহল। এই শহর বেঁচে আছে। ব্যস্ত, অসুস্থ, বিষাক্ত — তবু বেঁচে আছে।
কিন্তু কতদিন?
সিটে বসে চোখ বন্ধ করলেন কবির। বিমান ছাড়ল।
নিচে ঢাকার আলোগুলো ধীরে ধীরে ছোট হয়ে এল। তারপর মেঘের আড়ালে মিলিয়ে গেল।

প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, ড. আব্দুল মজিদ তালুকদার ডিগ্রি কলেজ, জামালপুর
muhammedalieng@gmail.com

Advertisement

Advertisement