হৃদয় আহম্মেদ শাওন, স্টাফ রিপোর্টার:জামালপুর
যমুনা নদীর পানি বাড়ছে, আর সেই সঙ্গে বাড়ছে নদীভাঙনের তীব্রতা। প্রতিদিন একটু একটু করে নদীগর্ভে হারিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, গাছপালা। জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার দুর্গম মন্নিয়া চরে এখন নদীভাঙনই সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম। দেড় বছর ধরে চলা এই ভাঙনে শত শত পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর মাথা গোঁজার ঠাঁই হারানোর শঙ্কায় দিন কাটছে চরবাসীর।
সরেজমিনে দেখা যায়, যমুনা নদীর দীপ চরে কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনের ভয়াবহ চিত্র। কোথাও ভাঙনের মুখে বসতঘর, কোথাও কৃষিজমি, আবার কোথাও শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। নদীতে পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের গতি আরও বেড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ইতোমধ্যে পাঁচ শতাধিক বসতবাড়ি ও বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও অসংখ্য পরিবার।
স্থানীয় বাসিন্দা গফুর মণ্ডল বলেন, “নদীভাঙনের কষ্ট বলে শেষ করা যাবে না। চার-পাঁচশো বাড়িঘর নদীতে চলে গেছে। মসজিদ, মাদ্রাসা ভেঙে গেছে। এখন বাজার আর স্কুলও ঝুঁকিতে আছে।”
হেলাল উদ্দিনের বাড়ি ভেঙে গেছে মাত্র এক সপ্তাহ আগে। তিনি বলেন, “নদী আমার সব নিয়ে গেছে। এখন রাস্তার পাশে ঘর তুলেছি। ছেলে-মেয়েরা ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছে না। তিন মাস আগে ভাঙন শুরু হয়েছিল, কিছুদিন কম থাকলেও এখন আবার বেড়েছে।”
আবু সাইদ নামে আরেক বাসিন্দা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, “যদি এভাবে ভাঙন চলতে থাকে, তাহলে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, সাতটি মহিলা মাদ্রাসা এবং এক ডজনের বেশি মসজিদ নদীগর্ভে চলে যাবে।”
ভাঙন রোধে সরকারি উদ্যোগ না পেয়ে হতাশ স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, উপজেলা প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিদের কাছে বারবার গেলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি মানববন্ধন করেও তারা সাড়া পাননি।
স্থানীয় আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, “আমরা বিভিন্ন দপ্তরে গিয়েছি, জনপ্রতিনিধিদের জানিয়েছি, মানববন্ধন করেছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখিনি।”
এ অবস্থায় নিজেদের উদ্যোগেই নদীভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করছেন চরবাসী। স্থানীয়দের অর্থায়নে গড়ে তোলা হয়েছে একটি তহবিল। পরিবারপ্রতি এক হাজার টাকা করে চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রবাসীরাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন।
রুবেল রানা জানান, “আমাদের গ্রামে প্রায় দুই হাজার পরিবার আছে। সবার সহযোগিতায় এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা সংগ্রহ হয়েছে।”
স্থানীয় যুবক জাহিদুল ইসলাম বলেন, “আমরা পাঁচ হাজার বস্তা কিনেছি। সেগুলো বালু দিয়ে ভরে নদীতে ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করব। কিন্তু অর্থ সংকটের কারণে কাজ এগিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
নদীভাঙনের এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন নদী রক্ষা আন্দোলনের কর্মীরাও। জামালপুর নদী রক্ষা কমিশনের সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, “চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ বছরের পর বছর ধরে চলছে। সরকার বদলায়, কিন্তু তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না। মন্নিয়া চরের জন্য একটি স্থায়ী সমাধান এখন সময়ের দাবি।”
তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, এত বড় এলাকায় ছোট পরিসরে অস্থায়ী প্রতিরক্ষা কাজ খুব বেশি কার্যকর হবে না।
জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নকিবুজ্জামান বলেন, “মন্নিয়াসহ আশপাশের চরে এক-দুইশ মিটার এলাকায় টেম্পোরারি কাজ করে তেমন সুফল পাওয়া যাবে না। এতে শুধু অর্থ ব্যয় হবে। স্থানীয়রা কিছু জিও ব্যাগ কিনেছে বলে শুনেছি। তাদের উদ্যোগে আমরা কারিগরি সহায়তা করব, যাতে কিছুটা হলেও কষ্ট লাঘব হয়।”
তিনি আরও বলেন, “মন্নিয়া চর একটি বিশাল এলাকা। এখানে ক্ষুদ্র কোনো উদ্যোগ বা সীমিত জিও ব্যাগ ডাম্পিং দীর্ঘমেয়াদে কাজে আসবে না। ভাঙন রোধে বৃহৎ ও স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রয়োজন।”




