হৃদয় আহমেদ শাওন,স্টাফ রিপোর্টার:
মাঠজুড়ে সোনালি ধান। কৃষকের ঘরে থাকার কথা আনন্দ আর স্বস্তি। কিন্তু বাস্তবতা যেন উল্টো। ধানের শীষে হাসি ফুটলেও কৃষকের মুখে নেই কোনো হাসি। লোকসানের ভার আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় জামালপুরের কৃষকরা আজ দিশেহারা।
ধানের মন ৮০০ টাকা, আর একজন কামলার মজুরি ১২০০ টাকা। তাহলে আমরা খামুই কি, বেচমুই কি? কথাগুলো বলতে বলতেই চোখে-মুখে হতাশার ছাপ ফুটে ওঠে মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলামের।
মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে মেলান্দহের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ধান কাটার ব্যস্ত মৌসুমেও কৃষকদের মাঝে নেই কোনো উৎসবের আমেজ। সোনালি ধানে ভরা ক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে তারা হিসাব মেলাচ্ছেন শুধু লোকসানের।
কৃষকদের অভিযোগ, কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। ডিজেল, সার, বীজ, সেচ সবকিছুর খরচ বেড়েছে। তার ওপর শ্রমিক সংকটে ধান কাটার মজুরি এখন আকাশছোঁয়া। অথচ বাজারে ধানের দাম মিলছে মাত্র ৮০০ টাকা মন।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি বিঘা জমিতে ধান কাটতে লাগে প্রায় ৮ জন শ্রমিক। শুধু শ্রমিক খরচই পড়ে প্রায় ৯ হাজার ৬০০ টাকা। জমি প্রস্তুত, বীজ, সার, সেচ ও পরিচর্যাসহ এক বিঘা জমিতে মোট খরচ দাঁড়ায় ২৩ থেকে ২৫ হাজার টাকা। অথচ প্রতি বিঘায় ২৪-২৫ মন ধান উৎপাদন হলেও বাজারে তা বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২০ হাজার টাকার মতো। ফলে বিঘাপ্রতি ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বোরো মৌসুমে জামালপুরে ১ লাখ ২৬ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। তবে উৎপাদন ভালো হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন চাষিরা।
প্রায় ২৯ বছর ধরে কৃষিকাজ করা মেলান্দহের কৃষক সুরুজ মিয়া বলেন, ছোটবেলা থাইকাই বাবার সাথে মাঠে কাজ করছি। বাবা মারা যাওয়ার পর নিজেই চাষাবাদ করি। কিন্তু এমন অবস্থা কখনো দেখি নাই। সবকিছুর দাম বাড়ছে, কামলার মজুরি ১২০০ টাকা, আর ধানের দাম ৮০০ টাকা। আমার ৯ বিঘা জমির উপর নির্ভর করেই সংসার চলে। এবার কি হইবো আল্লাহ ভালো জানে। এহন তো মনে হয় কৃষকগো মরার অবস্থা।
একই হতাশা ঝরে পড়ে কৃষক রবিউল ইসলামের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, প্রতি বিঘায় ধান হয় ২৮ মনের মতো। শুকানোর পর থাকে ২৪-২৫ মন। কিন্তু খরচই হইছে প্রায় ২৬ হাজার টাকা। এবার ধান বেইচা ২০ হাজার টাকাও তুলতে পারমু না। আসলই উঠবো না।
কৃষকদের এমন সংকটের বিষয়ে জামালপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খান বলেন, আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি, তারা যেন এক বা দুই মাস পর ধান বিক্রি করেন। তাহলে ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এছাড়া সরকারি গুদামে বিক্রি করলে তারা বেশি দাম পাবেন। তবে পাইকারদের কাছে কম দামে বিক্রি করলে আমাদের কিছু করার থাকে না।
তবে কৃষকদের প্রশ্ন ঘরে খাবার নেই, ঋণের চাপ মাথায়, শ্রমিকের টাকা বাকি। সেই অবস্থায় এক-দুই মাস ধান মজুত রাখার সামর্থ্য কজন কৃষকের আছে?
ফসলের মাঠে সোনালি ধান দুললেও কৃষকের চোখে এখন শুধু অনিশ্চয়তার ছায়া। যে কৃষক দেশের মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেন, সেই কৃষকই আজ প্রশ্ন করছেন, খামুই কি, বেচমুই কি?




