Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 16:23 pm
অন্যান্য

পাঙ্গাশ

পাঙ্গাশ

Oplus_131072

মোহাম্মদ আলী

জামালপুর শহরের শেষ মাথায়, যেখানে পিচের রাস্তা ধীরে ধীরে মাটির পথে মিশে গেছে, সেখানেই মজনু মিয়ার সংসার। ঢাকা-জামালপুর মহাসড়কের ধার ঘেঁষে ছোট্ট একটি ভিটে — দুটো ঘর, একটু উঠান, আর উঠানের কোণে একটা পুরনো আমগাছ। গাছটার ছায়ায় বসেই মজনু মিয়া মাঝে মাঝে জিরিয়ে নেন, যখন শরীর আর পারে না।
তিন সন্তানের বাবা মজনু মিয়া রিকশা চালান। পায়ে ঠেলা রিকশা — সেই পুরনো, মরচে-ধরা কঙ্কালসার যানটি দিয়েই তিনি সংসারের হাল টানেন। অটোরিকশার কথা মাথায় আসে মাঝে মাঝে, কিন্তু স্বপ্নও যেন জানে তার সাধ্যের সীমা। দিনে চারশো, কখনো পাঁচশো টাকা আয়। তা দিয়েই তিন ছেলেমেয়ের স্কুলের বেতন, বইখাতা, পাঁচ পেটের ভাত — সব মেটাতে হয়।
পাড়া-প্রতিবেশির মধ্যে কেউ কেউ পরামর্শ দেন, “ভাবিকে কারো বাড়িতে কাজে দিয়ে দেন, দুইটো পয়সা আসবে।” মজনু মিয়া শোনেন, কিন্তু কিছু বলেন না। শুধু ঠোঁটের কোণে একটা নীরব জেদ ফুটে ওঠে। তার বউ অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করবে — এটা তিনি মেনে নিতে পারেন না। দারিদ্র্য তার থেকে অনেক কিছু নিয়েছে, কিন্তু আত্মসম্মান এখনো নেয়নি।
ছেলেমেয়েরা পড়াশোনায় ভালো। বড় ছেলে রানা স্কুলে প্রথম হয় প্রায়ই। মেঝো ছেলে রাজু একটু চুপচাপ, কিন্তু পরীক্ষায় কখনো ফেল করেনি। আর ছোট মেয়ে সুমি — সে যেন বাবার বুকের আলো। টুকটুকে চেহারা, ডাগর চোখ, আর মুখে সারাক্ষণ কথার খই। মজনু মিয়া এই তিন সন্তানকে দেখলেই ভুলে যান ক্লান্তির কথা।
কিন্তু আজ দুদিন ধরে তিনি শয্যাশায়ী। জ্বর আর গায়ে ব্যথায় রিকশা নিয়ে বেরোতে পারেননি। হাতে শুধু পড়ে আছে কিস্তির টাকাটুকু — বড় ছেলে রানার সাইকেলের মাসিক কিস্তি। সেটা দিতে না পারলে আবার লজ্জার মুখে পড়তে হবে। ওই টাকায় হাত দেওয়া যাবে না। আর বাকি পকেট একেবারে শূন্য।
সেদিন দুপুরে সুমি আবদার ধরল।
“মা, পাঙ্গাশ মাছ চাই। পাঙ্গাশ ছাড়া ভাত খামু না।”
তার মা রাবেয়া প্রথমে বোঝালেন, তারপর মিষ্টি করে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু সুমির জেদ সুমির মতোই — একবার ধরলে ছাড়ে না।
“পাঙ্গাশ না পাইলে খামু না।”
রাবেয়ার চোখ ভিজে এলো। রান্নাঘরে ভাতের হাঁড়ি, আলু-শাকের তরকারি। মাছ কেনার কথা কল্পনাও করা যাচ্ছে না। ঘরে অসুস্থ স্বামী, পকেটে পয়সা নেই — কোথা থেকে আনবেন পাঙ্গাশ?
এক পর্যায়ে ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল। সুমির পিঠে দুটো চড় পড়ল। মেয়েটা কান্নায় ভেঙে পড়ল — হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল, পেটে মাছের ক্ষুধা আর পিঠে ব্যথা নিয়ে।
পাশের ঘর থেকে মজনু মিয়া শুনলেন। চোখ বন্ধ করে রইলেন। ছাদের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন — সেই দীর্ঘশ্বাসে বহু অব্যক্ত কথা মিশে ছিল।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার মুখে রাবেয়া বেরোলেন। রাস্তার পাশে বেঁধে রাখা ছাগলটাকে ঘরে নিয়ে আসতে হবে। ছোট্ট কালো ছাগলটা — সংসারের একটু ভরসা, বিপদে-আপদে বেচলে কিছু টাকা পাওয়া যাবে।
মহাসড়কের পাশ দিয়ে হাঁটছিলেন রাবেয়া, ছাগলের দড়ি হাতে। সন্ধ্যার আলোয় রাস্তাটা কেমন ঘোলাটে দেখাচ্ছিল। দূর থেকে একটা পণ্যবাহী ট্রাক ছুটে গেল — বোঝাই মাছ নিয়ে যাচ্ছে কোথাও।
হঠাৎ — ধপ।
ট্রাকের পিছন থেকে একটা বড় পাঙ্গাশ মাছ ছিটকে পড়ল রাস্তায়। চালক টের পাননি, গাড়ি চলে গেল। মাছটা পড়ে রইল রাস্তার কিনারায়, তাজা, থলথলে।
আশপাশের দু-একজন পথচারী দেখল ঘটনাটা। তাদের চোখ গেল রাবেয়ার দিকে — ছাগল হাতে ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন। একজন বলে উঠল, “ভাবি, এইটা নেন। গাড়ি থেইকা পড়ছে, আপনার পাশেই পড়ছে — এইটা আপনার নসিব।”
রাবেয়া ইতস্তত করলেন। কিন্তু লোকজন জোরাজুরি করল — “নেন নেন, গাড়িওয়ালা চইলা গেছে, এইটা এখন কারো না।”
কাঁপা হাতে মাছটা তুলে নিলেন রাবেয়া।
ঘরে ফিরতেই সুমি দেখল মায়ের হাতে পাঙ্গাশ। এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল — তারপর হু হু করে কেঁদে উঠল। কিন্তু এবারের কান্না অন্যরকম। এ কান্নায় ব্যথা নেই, আছে অদ্ভুত এক আনন্দের ভার, যা ছোট্ট বুক সামলাতে পারছে না।
রানা আর রাজু ছুটে এলো।
মজনু মিয়া বিছানা থেকে উঠে বসলেন। রাবেয়া পুরো ঘটনা বললেন — কাঁপা গলায়, ভেজা চোখে।
ঘরে তখন অদ্ভুত এক নীরবতা। বাইরে সন্ধ্যার আজান ভেসে আসছে।
মজনু মিয়া দুর্বল হাত দুটো তুললেন। চোখ বন্ধ করলেন।
“আলহামদুলিল্লাহ,” বললেন ধীরে ধীরে। তারপর সন্তানদের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখলি? আল্লাহ কাউরে ভোলেন না। শুকরিয়া আদায় করো সবাই।”
সুমি চোখ মুছে বাবার পাশে এসে বসল।
সেই রাতে পাঙ্গাশের ঘ্রাণে মজনু মিয়ার ছোট্ট সংসার ভরে উঠল। ভাতের থালায় মাছের টুকরো, বাচ্চাদের মুখে হাসি — আর মজনু মিয়ার বুকে এক অনির্বচনীয় শান্তি।

Advertisement

প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, ড. আব্দুল মজিদ তালুকদার ডিগ্রি কলেজ, জামালপুর

Advertisement