Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 19:57 pm
অন্যান্য

গার্হস্থ্য প্রলয়

গার্হস্থ্য প্রলয়

আবু হানিফ
এক নগণ্য কারণে নিতার সহিত আমার এক তুচ্ছ বিবাদের উদ্ভব হইয়াছিল; কিন্তু মানবজীবনের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য এই যে, ক্ষুদ্রতম অগ্নিস্ফুলিঙ্গও কখনো কখনো দহনজ্বালায় মহাবন প্রজ্বলিত করিতে সক্ষম হয়। সেইরূপই ঘটিল—আমাদের উভয়ের মুখে তালা পড়িল; বাক্য যেন হৃদয়ের অন্তঃপুরে অবরুদ্ধ রহিল। কেহ কাহার সহিত একটি শব্দ উচ্চারণ করিল না, যেন পারস্পরিক প্রয়োজন নামক বস্তুটি জগৎ হইতে বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে।

আমার পত্নী নিতা—প্রকৃতপক্ষে এক অতিশয় ভদ্র ও লাজুক প্রকৃতির নারী। ভদ্রতার এমনই পরাকাষ্ঠা যে, রন্ধনকার্যে প্রবৃত্ত হইলেও উনুনে অগ্নি প্রজ্বলনের ভার আমার উপর অর্পণ করিতে হয়; পুনরায় তরকারি কর্তনের সময় বটি ধারণ করিয়া দাঁড়াইয়া থাকাও যেন আমার স্বাভাবিক কর্তব্য। অতএব, সংসারযাত্রার বহু কার্যেই আমি তাহার নিকট একপ্রকার অনিবার্য সহচর।

Advertisement

সেদিন প্রভাতে নিদ্রা ত্যাগ করিয়া যখন জগৎকে পুনরায় অবলোকন করিলাম, তখন আমার অন্তঃকরণে এক প্রকার কৌতুকমিশ্রিত দুষ্টবুদ্ধির উদয় হইল। ভাবিলাম—এই শান্ত, স্থির, ভদ্র পত্নীর অন্তরে যদি একবার অগ্নির স্ফুলিঙ্গ জ্বালাইয়া দিই, তবে তাহার রূপ কিরূপ ধারণ করে, তাহা দর্শন করিবার সৌভাগ্য লাভ করি। এই কু-চিন্তার প্ররোচনায় আমি তাহাকে বলিলাম—
“শুনিয়াছি, তোমার পিতা পূর্বকালে বদনা-চুরিতে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন; এখন কি সেই মহান কীর্তি পরিত্যাগ করিয়াছেন, না কি এখনও ঐ ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ রাখিয়া চলিয়াছেন?”

এই বাক্য উচ্চারিত মাত্রই যে প্রলয়ংকরী দৃশ্যের উদ্ভব হইল, তাহা ভাষায় বর্ণনা করা দুরূহ। ঘোষণা-বিহীন পঞ্চম ‘বিশ্বযুদ্ধ’ যেন মুহূর্তের মধ্যেই আরম্ভ হইয়া গেল। ইহার পূর্বে চারিবার অনুরূপ সংঘর্ষ সংঘটিত হইয়াছে—এইজন্য ইহাকে পঞ্চম বলিতে দ্বিধা নাই। যুদ্ধ বলিতে যা বুঝায়, ইহা তাহারই গার্হস্থ্য সংস্করণ—লঙ্কাকাণ্ডের ক্ষুদ্র প্রতিরূপ। পত্নী খুন্তি হস্তে রাবণের ন্যায় প্রলয়ংকরী, আর আমি বেলন হস্তে রামের ন্যায় আত্মরক্ষায় নিয়োজিত! যেহেতু যুদ্ধের কেন্দ্রবিন্দু তাহার পিতা, সেহেতু রসিকতাবশতঃ তাঁহাকেই সীতারূপে কল্পনা করিলাম।

অতঃপর তিন দিবস অতিবাহিত হইল। গৃহে নীরবতার এমন এক গাম্ভীর্য বিরাজ করিতে লাগিল, যেন শ্মশানও তাহার নিকট কোলাহলপূর্ণ বলিয়া প্রতীয়মান হয়। উভয়ে কেহ কাহার সহিত বাক্যালাপ করিলাম না।

অদ্য প্রাতে নিদ্রাভঙ্গের পর লক্ষ্য করিলাম—নিতার চন্দ্রসম মুখমণ্ডল মলিন হইয়া কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করিয়াছে। হৃদয়ে সহসা এক অদ্ভুত করুণার সঞ্চার হইল। নীরবে তাহার নিকটে উপবেশন করিয়া শরীরে স্পর্শ করিলাম—জ্বরের তাপে দেহ দগ্ধ হইতেছে। মনে মনে ভাবিলাম—এই সংবাদ যদি শ্বশুরমহাশয়ের কর্ণগোচর হয়, তবে আমার পরিত্রাণ নাই; আমার বংশপরম্পরার সকল পূর্বপুরুষ মিলিয়াও আমাকে রক্ষা করিতে সক্ষম হইবেন না। অতএব অন্তরে দৃঢ় সংকল্প করিলাম—আর কখনও এরূপ অবিবেচক বাক্য উচ্চারণ করিব না।

আহারকাল উপস্থিত হইলে আমি নিতাকে আহ্বান করিলাম। সে অনিচ্ছা প্রকাশ করিল; তথাপি আমি অনুরোধ ও অনুনয়ের মিশ্র প্রয়োগে তাহাকে আহার করাইলাম এবং মৃদুস্বরে বলিলাম—“এমন আর হইবে না।”

হঠাৎ সেই কৃষ্ণবর্ণ, ক্লান্ত মুখমণ্ডল হইতে “ফিক” করিয়া এক ক্ষীণ হাসির শব্দ নির্গত হইল। তখন আমার মনে হইল—এই গার্হস্থ্য যুদ্ধের অবসান ঘটিয়াছে; শান্তির দূত পুনরায় আমাদের গৃহে অবতরণ করিয়াছে।

Advertisement