—— মোহাম্মদ আলী
বাংলাদেশের সীমান্ত ইতিহাসে বড়াইবাড়ী সংঘর্ষ এমন এক অধ্যায়, যা শুধু একটি সামরিক সংঘর্ষ নয়—এটি একযোগে সাহস, আত্মত্যাগ, নেতৃত্ব এবং জনতার অদম্য চেতনার সম্মিলিত বিস্ফোরণ। এখানে শুধু বন্দুকের গর্জন ছিল না; ছিল মাটির প্রতি প্রেম, অস্তিত্ব রক্ষার শপথ এবং মৃত্যুকে অগ্রাহ্য করার এক অনন্য দৃঢ়তা।
২০০১ সালের ১ এপ্রিল পাদুয়া সীমান্তে সংঘটিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে সীমান্তজুড়ে অস্থিরতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সীমান্তের বাতাসে তখন যুদ্ধের গন্ধ। উত্তেজনা জমতে জমতে এক পর্যায়ে বিস্ফোরিত হওয়ার অপেক্ষায় ছিল। অবশেষে ১৮ এপ্রিল ভোররাত—একটি নিস্তব্ধ প্রহর—যখন অধিকাংশ মানুষ ঘুমে অচেতন, তখনই ইতিহাসের এক রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা হয়।
ভোর সাড়ে ৩টার দিকে ভারতীয় বাহিনী ১০৬৭/৩ পিলার অতিক্রম করে বড়াইবাড়ীর দিকে অগ্রসর হয়। তাদের লক্ষ্য ছিল কেবল একটি ক্যাম্প নয়, বরং একটি জনপদ দখল করা। কিন্তু তারা জানত না—এই জনপদ শুধু ভৌগোলিক এলাকা নয়, এটি ছিল প্রতিরোধের এক জীবন্ত দুর্গ। সেই রাতে বড়াইবাড়ী বিওপিতে দায়িত্বে ছিলেন মাত্র ১১ জন বিডিআর সদস্য। ভোর ৫টার দিকে শুরু হয় প্রচণ্ড গোলাগুলি। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত বাহিনীর বিপরীতে এই অল্পসংখ্যক জওয়ান যে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, তা নিছক সামরিক ঘটনা নয়—এটি ছিল আত্মসম্মানের যুদ্ধ।
চার ঘণ্টা ধরে মাত্র আটজন জওয়ান সম্মুখভাগে দাঁড়িয়ে প্রতিরোধ চালিয়ে যান। গুলির ঝড়, মর্টারের বিস্ফোরণ—সবকিছুর মধ্যেও তারা এক ইঞ্চি জমি ছেড়ে দেননি। পিছু হটার সুযোগ ছিল, কিন্তু তারা বেছে নিয়েছিলেন প্রতিরোধ—কারণ তাদের কাছে এই মাটি শুধু দায়িত্ব নয়, এটি ছিল পরিচয়। সংঘর্ষের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নেতৃত্বের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কর্নেল শায়রুজ্জামানের নেতৃত্বে অতিরিক্ত বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছালে প্রতিরোধ আরও সুসংগঠিত হয়। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও জেসিওরা সামনে থেকেই নেতৃত্ব দেন—তারা শুধু নির্দেশ দেননি, নিজেরাই যুদ্ধ করেছেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি, সীমিত রসদ, এবং ক্রমাগত আক্রমণের মধ্যেও নেতৃত্ব ভেঙে পড়েনি। বরং প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল দ্রুত, কার্যকর এবং সাহসী। এই নেতৃত্বই বিডিআরের প্রতিরোধকে ছড়িয়ে দেয় এক সম্মিলিত শক্তিতে। এই সংঘর্ষের হৃদয়ে রয়েছে তিনটি নাম—নায়েক সুবেদার ওয়াহিদ মিয়া, সিপাহী মাহফুজুর রহমান এবং সিপাহী আব্দুল কাদের। তারা কেবল শহীদ নন; তারা প্রতিরোধের প্রতীক।
নায়েক সুবেদার ওয়াহিদ মিয়া ছিলেন অভিজ্ঞ, স্থির এবং অনুপ্রেরণাদায়ী। অতর্কিত আক্রমণের মুখে তিনি প্রথম সারিতে দাঁড়িয়ে গুলিবিনিময়ে অংশ নেন। গুরুতর আহত হওয়ার পরও তিনি অবস্থান ছাড়েননি। তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা—“পিছু হটা যাবে না”—এই বাক্যই যেন সহযোদ্ধাদের রক্তে আগুন ধরিয়ে দেয়।
সিপাহী মাহফুজুর রহমান—এক তরুণ যোদ্ধা, কিন্তু হৃদয়ে ছিল অদম্য সাহস। শত্রুর গুলি তাঁর বুক ভেদ করলেও তিনি শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান। তাঁর শরীর মাটিতে লুটিয়ে পড়ে, কিন্তু তাঁর প্রতিরোধ থামেনি—কারণ তা ছড়িয়ে পড়ে অন্যদের মধ্যে।
সিপাহী আব্দুল কাদের ছিলেন সেই যোদ্ধা, যিনি যুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মর্টারের বিস্ফোরণ আর গুলির ঝড়ের মাঝেও তিনি ট্রিগার চেপে রেখেছিলেন। গুলিবিদ্ধ হয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত তিনি শত্রুকে এগোতে দেননি। তাঁর অবস্থান ছিল যেন এক অটল প্রাচীর। সংবাদ পৌঁছাতেই আশপাশের ক্যাম্প থেকে বিডিআর সদস্যরা ছুটে আসেন। জামালপুর, ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন স্থান থেকে অতিরিক্ত বাহিনী যোগ দেয়। তাদের এই দ্রুত উপস্থিতি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে তারা কৌশলগতভাবে শত্রুকে ঘিরে ফেলে। স্থানীয় ভূপ্রকৃতি—খাল, ধানক্ষেত, উঁচুনিচু জমি—সবকিছুই তাদের অস্ত্র হয়ে ওঠে।
সাথে সাথে এই সংঘর্ষে সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী অধ্যায়টি হলো স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ। বড়াইবাড়ীর সাধারণ মানুষ, যারা কখনো যুদ্ধের প্রশিক্ষণ পায়নি, তারা জীবন বাজি রেখে বিডিআরের পাশে দাঁড়ায়। তারা তথ্য দেয়, পথ দেখায়, আহতদের সরিয়ে নেয়। কেউ খাবার নিয়ে আসে, কেউ খবর পৌঁছে দেয়। তাদের চোখে ভয় ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল দেশপ্রেম।
মিনহাজ উদ্দিনের গল্প এখানে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। ভোরে সেচ দিতে গিয়ে তিনি শত্রুপক্ষের অগ্রযাত্রা দেখতে পান। তাকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি ভুল দিক নির্দেশ করে দৌড়ে বিডিআর ক্যাম্পে খবর দেন। এই একটি সিদ্ধান্ত—একজন সাধারণ মানুষের—পুরো যুদ্ধের গতিপথ বদলে দেয়।
এই সংঘর্ষে শুধু সৈনিক নয়, সাধারণ মানুষও প্রাণ হারান। গুলিবিদ্ধ হয়ে, আগুনে পুড়ে, অথবা যুদ্ধের ভেতরে পড়ে অনেকেই শহীদ হন। তারা কোনো পদক পাননি, কিন্তু তাদের ত্যাগ এই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বড়াইবাড়ীর ১৭৯টি ঘর আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। তবুও মানুষ পিছু হটেনি। তারা জানত—ঘর হারানো যায়, কিন্তু দেশ হারানো যায় না। ৪২ ঘণ্টার তীব্র সংঘর্ষের পর শত্রুপক্ষ পিছু হটতে বাধ্য হয়। ১৬ জন শত্রু সদস্য নিহত হয়। দুইজন আটক হয়। কিন্তু এই সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়—এগুলো একটি প্রতিরোধের শক্তির প্রতিফলন।
এই বীরত্বগাথার মাঝেও একটি তিক্ত সত্য রয়েছে—রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির অভাব। শহীদদের যথাযথ সম্মান না দেওয়া—এসবই এই গৌরবময় ইতিহাসকে আংশিকভাবে আড়াল করে দেয়।
পরিশেষে, বড়াইবাড়ী সংঘর্ষ আমাদের শেখায়—একটি দেশের শক্তি তার অস্ত্রে নয়, তার মানুষের মনে। নায়েক সুবেদার ওয়াহিদ মিয়া, সিপাহী মাহফুজুর রহমান, সিপাহী আব্দুল কাদের এবং নাম না জানা অসংখ্য গ্রামবাসী—তারা প্রমাণ করেছেন, দেশপ্রেম কোনো পেশা নয়, এটি একটি অবস্থান।
এই ইতিহাস শুধু অতীত নয়; এটি ভবিষ্যতের জন্য এক প্রেরণা। যখনই প্রশ্ন উঠবে—কীভাবে একটি জাতি তার অস্তিত্ব রক্ষা করে—তখন বড়াইবাড়ীর কথা উচ্চারিত হবে, রক্তে লেখা এক অমর উত্তর হিসেবে।
প্রভাষক, ইংরেজি বিভাগ, ড. আব্দুল মজিদ তালুকদার ডিগ্রি কলেজ, জামালপুর সদর, জামালপুর।




