(প্রতিষ্ঠার নেপথ্যকথা, ছাত্ররাজনীতির স্মৃতি, সংকট ও ঘুরে দাঁড়ানোর এক দীর্ঘ ইতিহাস)
মানুষের জীবনে কিছু জায়গা থাকে, যেখানে ফিরে গেলে বয়স কমে না, অথচ মন ফিরে যায় ফেলে আসা দিনগুলোতে। পুরোনো শ্রেণিকক্ষ, কলেজের মাঠ, গাছের ছায়ায় বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সময় কিংবা তারুণ্যের দুরন্ত স্মৃতি, সবকিছুই যেন হৃদয়ের পাতায় লেখা একেকটি গল্প।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছোট্ট আঙিনা পেরিয়ে হাইস্কুলের কৈশোর, তারপর এসএসসির গণ্ডি পেরিয়ে কলেজজীবনে পদার্পণ। নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধু, নতুন শিক্ষক আর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নে শুরু হয় জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ এ. এইচ. জেড. সরকারি কলেজ তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের তারুণ্য, আবেগ, স্বপ্ন ও স্মৃতি। কারও কাছে এটি শিক্ষাজীবনের স্মৃতিবিজড়িত প্রাঙ্গণ, কারও কাছে নেতৃত্বের বিকাশস্থল, আবার কারও কাছে একটি জনপদের শিক্ষা ও সামাজিক অগ্রযাত্রার প্রতীক।
১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কলেজের ইতিহাসে রয়েছে শিক্ষানুরাগী মানুষের স্বপ্ন, দানশীল পরিবারের অবদান, ছাত্ররাজনীতির নানা অধ্যায়, অগ্নিকাণ্ডের বেদনাদায়ক স্মৃতি এবং অস্তিত্বের সংকট পেরিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প।
এ যেন শুধু একটি কলেজের ইতিহাস নয়, একটি জনপদের আত্মপ্রতিষ্ঠার গল্প।
উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থেকে কলেজ প্রতিষ্ঠা
ষাটের দশকে মাদারগঞ্জে উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত। মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের যেতে হতো জামালপুরের আশেক মাহমুদ কলেজ কিংবা ময়মনসিংহের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। দূরত্ব, যাতায়াতের দুর্ভোগ ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা অনেকের উচ্চশিক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত।
এমন বাস্তবতায় মাদারগঞ্জে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সচেতন ব্যক্তিরা। তাঁদের উদ্যোগেই ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় মাদারগঞ্জ এ. এইচ. জেড. কলেজ।
কলেজ প্রতিষ্ঠার পর বদলে যেতে শুরু করে এলাকার শিক্ষার পরিবেশ। মাদারগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়ন ছাড়াও আশপাশের এলাকার শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসতেন। কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ বাইসাইকেলে, কেউ ভ্যানে, আবার কেউ নৌকায় চড়ে পৌঁছাতেন শিক্ষাঙ্গনে। স্থানীয় স্মৃতিচারণে ঘোড়ায় চড়ে শিক্ষার্থীদের কলেজে আসার কথাও পাওয়া যায়।
সন্তান কলেজে পড়ছে, উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাচ্ছে, অভিভাবকদের কাছে সেটিই ছিল গর্বের বিষয়। কলেজটি হয়ে উঠেছিল একটি জনপদের আশা, সামাজিক মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতীক।
আশেক মাহমুদ তালুকদার পরিবার ও প্রতিষ্ঠাতাদের অবদান
কলেজ প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে আশেক মাহমুদ তালুকদার ও তাঁর পরিবারের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাঁর তিন ছেলে মরহুম আফতাব উদ্দিন তালুকদার, আলহাজ মরহুম শামসুল হুদা তালুকদার এবং মরহুম শামসুজ্জোহা তালুকদার। তাঁদের বড় ভাই কাজী ইসহাক উদ্দিন তালুকদার কলেজ প্রতিষ্ঠার আগেই মৃত্যুবরণ করেন বলে জানা যায়।
একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন জমি, অর্থ, অবকাঠামো ও সম্মিলিত উদ্যোগ। তৎকালীন সময়ে এসব ব্যবস্থা করা সহজ ছিল না। তালুকদার পরিবারের সহযোগিতা কলেজ প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, একই বছর তাঁদের বাবার নামে মাদারগঞ্জ আশেক মাহমুদ পাইলট উচ্চবিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে ১৯৬৮ সাল মাদারগঞ্জের শিক্ষার ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে আছে।
রইস উদ্দিন আহম্মদ: কলেজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টা
কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ রইস উদ্দিন আহম্মদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তিনি ১৯৬৫ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং পাকিস্তান কেন্দ্রীয় পরিষদের বিজ্ঞান ও কারিগরি দপ্তরের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মাদারগঞ্জে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টির স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন আব্দুর রেজ্জাক খান, তালুকদার পরিবারের তিন ভাই এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
কলেজ প্রতিষ্ঠায় যাঁদের সহযোগিতার কথা জানা যায়, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মরহুম আব্দুর রেজ্জাক খান, চিন্তাস্বর বাবু, শামসুল আলম, মির্জা আবুল কাশেম, কাজী আব্দুল সালাম, করিমুজ্জামান তালুকদার ও মাহমুদুজ্জামান সরকারসহ অনেকে।
একজন স্বপ্ন দেখেছিলেন, অন্যরা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে এগিয়ে এসেছিলেন। এভাবেই ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা রূপ নিয়েছিল সামাজিক উদ্যোগে।
আব্দুর রেজ্জাক খানের কৌশলী উদ্যোগ
কলেজ প্রতিষ্ঠার পেছনে আব্দুর রেজ্জাক খানকে ঘিরে একটি মজার ঘটনা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে।
প্রথম দিকে রইস উদ্দিন আহম্মদ, আব্দুর রেজ্জাক খানসহ কয়েকজন কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন। কিন্তু সংগৃহীত অর্থ প্রয়োজনের তুলনায় কম ছিল। পরে তাঁরা তালুকদার পরিবারের তিন ভাইয়ের সঙ্গে আলোচনা করেন। বিপুল ব্যয়ের কথা বিবেচনায় নিয়ে তাঁরা আরও সময় নিয়ে ভাবার কথা জানান।
এতে হতাশ হয়ে পড়েন রইস উদ্দিন আহম্মদ। তখন আব্দুর রেজ্জাক খান তাঁকে আশ্বস্ত করেন, কলেজ হবে, আর তা মাদারগঞ্জ সদরেই হবে।
স্থানীয়ভাবে প্রচলিত গল্প অনুযায়ী, একদিন তিনি তালুকদার পরিবারের তিন ভাইকে রসিকতার ছলে বলেন, তাঁদের স্ত্রীরা বাপের বাড়ি থেকে অর্থ এনে কলেজ প্রতিষ্ঠা করবেন এবং তাঁদের নামেই কলেজ হবে।
কথাটি শুনে তিন ভাই প্রতিক্রিয়া জানান। তাঁরা বলেন, তাঁরা থাকতে তাঁদের পরিবারের নারীরা কেন বাপের বাড়ি থেকে অর্থ আনবেন? কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাঁরাই করবেন।
এরপর কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে তাঁদের আগ্রহ বাড়ে বলে স্থানীয়ভাবে গল্পটি প্রচলিত আছে। ঘটনাটির ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ও লিখিত দলিল প্রয়োজন হলেও গল্পটি তৎকালীন মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও উদ্যোগের একটি চিত্র তুলে ধরে।
কলেজের জমি নির্ধারণেও উদ্যোগ নিতে হয়। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান কলেজের জায়গার একাংশে জেলে সম্প্রদায়ের বসতি ছিল। চিন্তাস্বর বাবুর সহযোগিতায় জমি বিনিময়ের ব্যবস্থা করে কলেজের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়।
এভাবেই নানা উদ্যোগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয় মাদারগঞ্জের উচ্চশিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষক ও সরকারিকরণ
কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ছিলেন মরহুম রইস উদ্দিন আহম্মদ। প্রতিষ্ঠাতা উপাধ্যক্ষ ছিলেন বাবু সতীশ চন্দ্র।
প্রতিষ্ঠাকালীন শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বাবু হেমেন্দ্রনাথ নাগ, বাবু শ্রী বিমল কুমার শাহ, মরহুম সোলায়মান, দেলোয়ার হোসেন ও মরহুম সেকান্দার আলী মিয়া। পরবর্তী সময়ে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হন গোলাম রব্বানী, মরহুম আলমগীর কবির ও নূরুল ইসলাম খানসহ অনেকে।
সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে তাঁদের হাত ধরেই এগিয়ে যায় কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম। তাঁরা শুধু পাঠদান করেননি, একটি জনপদের শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তোলার কাজেও ভূমিকা রেখেছেন।
কলেজটির ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বছর ১৯৮৭। স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ওই বছরের ১৭ জুন তৎকালীন রাষ্ট্রপতির মাদারগঞ্জ সফরকে কেন্দ্র করে রওশন আরা গার্লস স্কুল ও এ. এইচ. জেড. কলেজকে সরকারি ঘোষণা করা হয়।
কলেজটি সরকারিকরণের পেছনে শিক্ষক, পরিচালনা কমিটি ও এলাকাবাসীর প্রচেষ্টার কথা জানা যায়। এ ক্ষেত্রে তৎকালীন মাদারগঞ্জ-মেলান্দহের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম খোকার অবদানও স্থানীয়ভাবে স্মরণ করা হয়।
সরকারিকরণের মধ্য দিয়ে কলেজটির প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়।
ছাত্র সংসদ: তারুণ্য ও নেতৃত্বের স্মৃতি
কলেজটির ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছাত্র সংসদ। বিভিন্ন সময়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।
স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭৩ সালে প্রথম ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে পাকেরদহ এলাকার নূরনবী ভিপি এবং মাদারগঞ্জ সদর গাবেরগ্রামের আইয়ুব খান ক্রীড়া সম্পাদক নির্বাচিত হন। তৎকালীন জিএস ও এজিএসের নাম জানা যায়নি।
১৯৭৯-৮০ সালের নির্বাচনে ভিপি হন চরপাকেরদহের সেলিম চৌধুরী, জিএস কবি নান্নু পারভেজ এবং এজিএস ভাঙ্গবাড়ীর রেজাউল। সাহিত্য সম্পাদক নির্বাচিত হন সাংবাদিক মির্জা হুমায়ুন কবীর।
১৯৮৭ সালে ভিপি নির্বাচিত হন গুনারীতলার জয়নাল আবেদীন আয়না।
১৯৯২ সালে ছাত্রদলের প্রার্থী হিসেবে ভিপি নির্বাচিত হন অলিউল হাসান রক্তিম। স্থানীয় স্মৃতিচারণে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত। কলেজের মাঠ ও পার্কের গাছের সঙ্গে তাঁর উদ্যোগের স্মৃতিও জড়িয়ে রয়েছে বলে জানা যায়। পরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
ওই নির্বাচনে ছাত্রদলের জহুরুল জিএস এবং ছাত্রলীগের রায়হান রহমতুল্লাহ রিমু এজিএস নির্বাচিত হন বলে জানা যায়।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ভিপি হন রায়হান রহমতুল্লাহ রিমু, জিএস মোজাহিদুল ইসলাম এবং এজিএস শাহীনুর রহমান শাহীন খান।
১৯৯৭-৯৮ সালে ভিপি ছিলেন জোনাইলের হারুন, জিএস তোফায়েল এবং এজিএস এনামুল।
১৯৯৯ সালের নির্বাচনে ছাত্রলীগের লিটন ভিপি নির্বাচিত হন। জিএস হন গুনারীতলার সুলতান এবং এজিএস সেলিম।
এসব নির্বাচন কলেজের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ইতিহাসের অংশ। তবে পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসের জন্য নির্বাচনের সাল, ফলাফল ও পদাধিকারীদের নাম সংশ্লিষ্ট নথির সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন।
১৯৮৯ সালের অগ্নিকাণ্ড: বেদনাদায়ক স্মৃতি
কলেজের ইতিহাসে ১৯৮৯ সালের একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও স্থানীয়ভাবে আলোচিত।
প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগে কয়েকজন শিক্ষার্থীর ভর্তি-সংক্রান্ত বিরোধ থেকে ঘটনার সূত্রপাত হয়। কলেজ প্রশাসন অনিয়মের বিষয়ে ছাড় দিতে রাজি না হওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে কলেজে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এরপর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে বলে জানা যায়। পরবর্তী সময়ে মামলা হলে স্থানীয় কয়েকজন শিক্ষার্থী গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যান বলেও প্রচলিত বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে।
তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা ও মামলার পরিণতি নিশ্চিত করতে সমসাময়িক সংবাদপত্র, পুলিশি নথি ও আদালতের দলিল পর্যালোচনা প্রয়োজন।
এই ঘটনা স্মরণ করিয়ে দেয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘাত ও সহিংসতা কীভাবে শিক্ষা কার্যক্রম ও পারস্পরিক আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
শিক্ষার্থীসংকট ও কলেজের কঠিন সময়
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কলেজটি নানা সংকটের মুখে পড়ে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ সাল থেকে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। আশপাশে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন কলেজে ভর্তি হতে থাকেন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও উন্নয়ন উদ্যোগের ঘাটতিও কলেজটির পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
একসময় কলেজটির শিক্ষা পরিবেশের প্রাণচাঞ্চল্য অনেকটাই হারিয়ে যায়। মাঠে গরু-ছাগল বিচরণ করার দৃশ্যও স্থানীয়দের স্মৃতিতে রয়েছে।
শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকলে কলেজটির ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা দেখা দেয়। সরকারি পর্যায় থেকে শিক্ষক ও কর্মচারীদের বিষয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল বলে স্থানীয়ভাবে জানা যায়।
যে প্রতিষ্ঠান একসময় উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই প্রতিষ্ঠানই যখন শিক্ষার্থীসংকটে পড়ে, তখন তা পুরো জনপদের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
তবে এই সংকটের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তৎকালীন শিক্ষার্থীসংখ্যা, ফলাফল, শিক্ষকসংকট, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার তথ্য বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
যাঁদের প্রচেষ্টায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা
সংকটের সময় কলেজটির পাশে দাঁড়ান স্থানীয় কয়েকজন সচেতন ব্যক্তি ও তরুণ।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সালে তৎকালীন উপাধ্যক্ষ মরহুম আলমগীর কবির কলেজের সংকটের বিষয়টি এলাকাবাসীকে জানান। এরপর শিবলুল বারী রাজুসহ স্থানীয় যুবসমাজ শিক্ষার্থীসংখ্যা বাড়ানো ও শিক্ষা কার্যক্রম সচল রাখতে উদ্যোগী হন।
তাঁরা বিভিন্ন এলাকায় যোগাযোগ করেন, শিক্ষার্থীদের কলেজে ভর্তি হতে উৎসাহিত করেন এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের আগ্রহ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালান।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, টানা প্রায় তিন বছরের প্রচেষ্টায় কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করার পথ তৈরি হয়।
এই উদ্যোগের তাৎপর্য এখানেই যে, একটি প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব শুধু প্রশাসনের নয়। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও স্থানীয় সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নতুন করে এগিয়ে নিতে।
সংকটের দিনে যাঁরা এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের অবদান যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন।
বর্তমান কলেজ: ঐতিহ্যের সঙ্গে নতুন সম্ভাবনা
দীর্ঘ পথপরিক্রমায় মাদারগঞ্জ এ. এইচ. জেড. সরকারি কলেজ আজও এলাকার উচ্চশিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কলেজটির অধ্যক্ষ মোয়াজ্জেম হোসেন। শিক্ষক রয়েছেন ১৪ জন এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২০০। স্নাতক পাস কোর্সের পাশাপাশি চারটি বিষয়ে স্নাতক সম্মান বা অনার্স কোর্স চালু রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব তথ্য কলেজ কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নথির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
একটি কলেজের সাফল্য শুধু শিক্ষার্থীসংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। শিক্ষার মান, নিয়মিত পাঠদান, পর্যাপ্ত শিক্ষক, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, যুক্তিবোধ ও সৃজনশীলতা গড়ে তোলাও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব।
মাদারগঞ্জ এ. এইচ. জেড. সরকারি কলেজের সামনে তাই রয়েছে অতীতের ঐতিহ্য ধরে রেখে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণের চ্যালেঞ্জ।
ইতিহাস সংরক্ষণে প্রয়োজন উদ্যোগ
কলেজটির প্রতিষ্ঠার পেছনে যাঁরা অবদান রেখেছেন, যাঁরা শিক্ষকতা করেছেন, ছাত্র সংসদের নেতৃত্ব দিয়েছেন কিংবা সংকটের সময় প্রতিষ্ঠানটির পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা জরুরি।
এ জন্য কলেজের প্রতিষ্ঠার দলিল, জমি-সংক্রান্ত নথি, সরকারি ঘোষণার প্রমাণপত্র, পুরোনো ছবি, শিক্ষকদের পরিচিতি এবং ছাত্র সংসদের নির্বাচনী ফলাফল সংগ্রহ করা যেতে পারে।
প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণ সংরক্ষণ করে একটি প্রামাণ্য ইতিহাস সংকলন করা সম্ভব। কলেজ প্রাঙ্গণে ইতিহাস কর্নার কিংবা স্মৃতিফলক স্থাপন করা হলে নতুন প্রজন্মও জানতে পারবে, কীভাবে বহু মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছিল তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রচলিত গল্প, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও প্রামাণ্য দলিলের মধ্যে পার্থক্য স্পষ্ট রাখাও জরুরি। এতে ঐতিহ্যের আবেগ অক্ষুণ্ণ থাকবে, পাশাপাশি তথ্যের নির্ভরযোগ্যতাও বজায় থাকবে।
শেষ কথা: একটি কলেজ, একটি জনপদের আত্মপরিচয়
মাদারগঞ্জ এ. এইচ. জেড. সরকারি কলেজের ইতিহাস আসলে একটি জনপদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখার ইতিহাস। এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল সীমিত সুযোগের মধ্যে বৃহত্তর সম্ভাবনা তৈরির আকাঙ্ক্ষা থেকে। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে যুক্ত হয়েছিলেন বহু মানুষ, যাঁদের শ্রম, অর্থ, মেধা ও আন্তরিকতায় গড়ে উঠেছিল একটি শিক্ষাঙ্গন।
এই পথচলায় এসেছে সাফল্য, এসেছে সংকট। কখনো শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়েছে কলেজ প্রাঙ্গণ, কখনো শিক্ষার্থীসংকটে নেমেছে নীরবতা। আবার সংকটের দিনে স্থানীয় মানুষের উদ্যোগে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাও হয়েছে।
এসব অধ্যায় মিলিয়েই একটি প্রতিষ্ঠানের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস।
তাই এই কলেজকে শুধু একটি সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত তাৎপর্য উপলব্ধি করা যাবে না। এটি একটি জনপদের শিক্ষা বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা, কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি এবং ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদের প্রতীক।
আজ প্রয়োজন সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করে শিক্ষার মানোন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষকসংকট নিরসন ও শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাস সংরক্ষণে এগিয়ে আসতে হবে কলেজ কর্তৃপক্ষ, প্রাক্তন শিক্ষার্থী, শিক্ষানুরাগী ও এলাকাবাসীকে।
একটি প্রতিষ্ঠানকে ভালোবাসার অর্থ শুধু তার অতীত নিয়ে গর্ব করা নয়, বরং বর্তমানের সংকট সমাধানে এগিয়ে আসা এবং ভবিষ্যৎকে আরও সমৃদ্ধ করার দায়িত্ব গ্রহণ করা।
যে মাটিতে একদিন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন বোনা হয়েছিল, সেই মাটিতে যেন আর কখনো শিক্ষার সম্ভাবনা অবহেলায় ম্লান না হয়।
মাদারগঞ্জ এ. এইচ. জেড. সরকারি কলেজ বেঁচে থাকুক তার ঐতিহ্যে, শিক্ষার গৌরবে এবং আগামী প্রজন্মের স্বপ্নে।
কারণ, একটি কলেজের প্রকৃত গৌরব শুধু তার বয়সে নয়, তার অর্জনে; শুধু অতীতের স্মৃতিতে নয়, ভবিষ্যৎ নির্মাণের সক্ষমতায়। যে প্রতিষ্ঠান একটি জনপদকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছে, সেই প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নেওয়া পুরো জনপদেরই দায়িত্ব।
– আব্দুর রহিম খান, লেখক ও সাংবাদিক




