জামালপুর জেলার বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় প্রবাহিত দশানী নদীতে সম্প্রতি পাল্টাপাল্টি কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ করে নদীটির অস্তিত্ব সংকটে ফেলা হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন দুই উপজেলার প্রায় ২৫টি গ্রামের মানুষও।
নদী কখনো কারো একক সম্পদ নয়; এটি জনসম্পদ। কোন ঠুনকো যুক্তিতে প্রাকৃতিক নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রোধ করে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ করা শুধু বেআইনি নয়, চরম অন্যায়ও। জামালপুরের বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার দশানী নদীতে যেভাবে পাল্টাপাল্টি বাঁধ নির্মাণ হয়েছে, তা এর জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় কৃষি এবং নদীভিত্তিক জীবনের ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলবে। প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে হয়, দ্রুত এই অবৈধ বাঁধ সরানো কেবল নয়, কিভাবে চোখের সামনে এমন বাঁধ দেওয়া হলো, কে ইন্ধন দিল এসবই খতিয়ে দেখুন। নদীভাঙ্গনের অজুহাতে বাঁধ দেওয়ার পেছনে কোন দুষ্টচক্র জড়িত কি’না তাও স্পষ্ট হওয়া উচিত। কারণ এই বাঁধ কারোরই উপকার করবে না।
প্রথমত, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাঁধ দেওয়া মানে হলো নদীর স্বকীয়তা নষ্ট করা। এর ফলে একদিকে নদীর একপাশে জমে উঠবে পানি ও পলি, অন্যদিকে শুকিয়ে যাবে অন্য প্রান্ত। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পরিবর্তিত হবে, আশেপাশের চাষাবাদ ব্যাহত হবে এবং ফসল উৎপাদনে মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হবে। ভাটির দিকে বসবাসকারী মানুষেরা সরাসরি পানির সংকটে পড়বে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের কৃষি ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে। যার ভুক্তভোগী হবেন এলাকাবাসীই।
দ্বিতীয়ত, বর্ষা মৌসুমে বাঁধের কারণে একদিকে সৃষ্টি হবে জলাবদ্ধতা, অন্যদিকে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়বে। বাঁধ দেওয়া নদীসমূহে পানি আটকে গেলে অল্প বৃষ্টিতেই আশপাশের বসতি ও চাষের জমি প্লাবিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। এভাবে সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি হবে, এসবের দায়ভার কে নিবে?
তৃতীয়ত, নদীর গতিপথ বা স্রোত আটকে দেওয়ার আইনগত কোনো অধিকার কারও নেই। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ও নদী সংরক্ষণ আইনের বিধান অনুযায়ী, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনি। ইতোমধ্যেই পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, এই বাঁধ অনুমতি ছাড়াই তৈরি করা হয়েছে। সুতরাং আইন অনুযায়ী এই অবৈধ স্থাপনা দ্রুত ভেঙে ফেলা কেবল জরুরী নয়, তার চেয়েও বেশি।
চতুর্থত, পরিবেশগত দিক থেকেও নদী একটি জীবন্ত সত্তা। নদী শুধু পানি প্রবাহের মাধ্যম নয়, এটি একটি জৈবিক ইকোসিস্টেমের অংশ। মাছ, জলজ উদ্ভিদ, পাখি — এদের অস্তিত্ব নদীর ওপর নির্ভরশীল। নদীর স্রোত বন্ধ হলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে এবং এক পর্যায়ে নদী শুকিয়ে যায়। একবার যদি নদী মরতে শুরু করে, তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয় না। তাই অবিলম্বে পদক্ষেপ নিতে না পারলে দশানী নদীর মতো একটি প্রাণবন্ত জলধারা হারিয়ে যাবে চিরতরে।
ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের কাছে নদীকে বলি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশাসনকে অবিলম্বে বাঁধ অপসারণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হবে। পাশাপাশি, উভয়পক্ষের সাথে আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই সমাধান বের করা দরকার, যাতে নদীও বাঁচে, মানুষও বাঁচে।




