Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 14:31 pm
মুক্তমত

প্রতিশ্রুতিতেই আটকে আছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ভাগ্যের উন্নয়ন

প্রতিশ্রুতিতেই আটকে আছে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ভাগ্যের উন্নয়ন

আতিকুর রহমান ||

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম চালিকাশক্তি হলো মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষককগণ। সরকারি শিক্ষক ও এমপিওভুক্ত শিক্ষক এই উভয় স্তরের কাজ, দায়িত্ব ও পাঠদানে সময় সমান, তবুও বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা প্রদানে রয়েছে চরম বৈষম্য।

Advertisement

শিক্ষক সমাজের পাহাড়সম বৈষম্য দূরিকরনে রাষ্ট্রের প্রধানতম দ্বায়িত্ব থাকলেও অদৃশ্য বাস্তবতায় বারবার প্রতিশ্রুতির গ্যারাকলে মাথা উচু করে বাঁচার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে শিক্ষার্থীদের রাজমুকুট খ্যাত বৈষম্যের শিকার এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের। এসকল বৈষম্যের সমাধানে রাষ্ট্রের যথোপযুক্ত পদক্ষেপ দৃশ্যমান না হওয়ায় আন্দোলনকেই সমাধানের একমাত্র উপায় মনে করে নিয়েছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারিবৃন্দ।

সরকারি শিক্ষকগণ ২০১৫ সালের ৮ম পে-স্কেল অনুযায়ী পূর্ণ বেতন ও উৎসব ভাতা, বৈশাখী ভাতা, পূর্ণ অবসর সুবিধা পেলেও স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও বেসিকদের মুখে প্রশান্তি হাসি ফুটাতে পারেননি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকগণ। এই বৈষম্যের প্রতিবাদে ২০১৮, ২০২১ এবং ২০২৩-২৪ সালে ঢাকায় টানা আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষকরা। জাতীয় প্রেসক্লাব, সেগুনবাগিচা ও শাহবাগে অবস্থান ধর্মঘট, অনশন, কালো ব্যাজ ধারণ, স্মারকলিপি পেশসহ নানা রকম কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। এসব আন্দোলন দমাতে শিক্ষকদের উপর পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। ফলে অনেক শিক্ষক অসুস্থ হন, কয়েকজন মৃত্যুর কাছাকাছি চলে যান। তবুও সমাধান আজও অধরা।

৫-ই আগস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর বৈষম্য বিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্য এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের আন্দোলন আলোচনায় আসে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শিক্ষা ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদ্রেষ্টা হিসেবে ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট দ্বায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ড. ওয়াহেদ উদ্দিন মাহমুদ বিভিন্ন শিক্ষক নেতাদের বক্তব্য গুরুত্বের সাথে নেন। ফলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীগণ তাদের বহুদিনের প্রত্যাশিত বেতন-ভাতার স্বপ্ন দেখেন। ড. ওয়াহেদ উদ্দিন মাহমুদ শিক্ষক নেতাদেরকে অবসর-কল্যাণ ট্রাস্ট এবং বাড়ি ভাড়া-উৎসব ভাতার বিষয়টি সমাধানের আশ্বাস দেন। বৈষম্য দূরীকরণের এসব আশ্বাস পুরো এমপিওভুক্ত শিক্ষক সমাজকে আনন্দিত করে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ৫ লাখ শিক্ষক-কর্মচারীগণ শিক্ষা উপদ্রেষ্টার উদ্যোগকে স্বাগত জানান এবং তার দীর্ঘায়ু কামনা করে পোষ্ট করেন। কিন্তু ২০২৫ সালের ৫ মার্চ শিক্ষা উপদ্রেষ্টা ড. ওয়াহেদ উদ্দিন মাহমুদ শিক্ষা উপদ্রেষ্টার দ্বায়িত্ব হতে হঠাৎ সরে দাড়ানোর ঘোষণা দিলে সারা বাংলাদেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীগণের মাঝে ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম নেয়। অনিশ্চিত হয়ে পড়ে বহুল প্রত্যাশীত বৈষম্য নিরসনের প্রথম ধাপ।

৫-ই মার্চ ২০২৫ তারিখে নতুন শিক্ষা উপদ্রেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়ে অধ্যাপক সি আর আবরার শপথ গ্রহণের পর সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি তার দৃষ্টি ও পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তার শপথগ্রহণ পরবর্তী বক্তব্যের মূল সারাংশ ছিল: তিনি স্বপ্ন দেখেন এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজের দেশের মধ্যেই ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে পারবে এবং বিশ্ব পরিচালনা করবে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এটি একদিনের বা এক বছরের মধ্যে সম্ভব নয়, তবে ইতোমধ্যেই ভিত্তি স্থাপন হয়েছে এবং বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

অধিক মাত্রায় আলোচনা এসেছে, ঈদুল আজহা থেকে উৎসব ভাতা এবং পরবর্তী বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও বিনোদন ভাতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে, যা আগামী বাজেটে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে মর্মে বক্তব্যটি। তিনি জানিয়েছিলেন, এটি এক‐দুটি বাজেটের মাঝেই পুরোপুরি সমাধান হবে না, বরং পাঁচ-ছয় বছরের তফসিলবদ্ধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন হতে হবে । তার এই বক্তব্যের মাঝেই কি লুকিয়ে ছিল আসন্ন বাজেটেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীগণের বৈষম্য নিরসনের ব্যর্থতার গ্লানি?

২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের মোট বাজেটের প্রায় ১০.৭০% শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হলেও সাবেক শিক্ষা উপদ্রেষ্টা ড. ওয়াহেদ উদ্দিন মাহমুদ এর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেননি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জুলাইয়ের বেতনের সাথে বর্ধিত বাসা ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও বিনোদন ভাতা যোগ হওয়ার কথা থাকলেও, সেকল সুবিধার পরিবর্তে যুক্ত হয়েছে শুধু-ই প্রতিশ্রুতি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন শিক্ষক নেতা মন্তব্য করেছেন- আমলাদের দ্বিমুখী মনোভাব, পাহাড়সম দূর্নীতির নেশা এবং কিছু রাজনৈতিক দলের ক্রেডিট বাণিজ্যের সুযোগ প্রাপ্তি-ই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীগণের বৈষম্য নিরসনের প্রধান অন্তরায়।

এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে হলে প্রয়োজন সমান বেতন কাঠামো ও ভাতা প্রবর্তন,পূর্ণ পেনশন সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং চাকরি জাতীয়করণের সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন। একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠনে শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। তাঁদের ন্যায্য দাবি উপেক্ষিত থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।

তাই সময় এসেছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আর বেতন বৈষম্য নয়, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের জন্য শিক্ষকদের মর্যাদা ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত হোক। শিক্ষা ক্ষেত্রে সকল বৈষম্য দূর করে আলোকিত মানুষ গড়ার কারিগরদের সমাজের চোখে মাথা উঁচু করে বাঁচার অধিকার ফিরিয়ে দিতে দরকার শুধু নীতিনির্ধারকদের সদিচ্ছা। কিন্তু তাদের নিরবতা আর কত? আর কত যৌক্তিক দাবি আদায়ে শিক্ষকদের থাকতে হবে রাজপথে? জাতির নিদ্রিত বিবেক আর কবে জাগ্রত হবে?

Advertisement

Leave a Comment

Your email address will not be published.