শওকত জামান ||
উন্নয়ন একটি রাষ্ট্রের অগ্রগতির প্রতীক। নতুন সড়ক, সেতু, কালভার্ট কিংবা জনকল্যাণমূলক অবকাঠামো মানুষের জীবনমান উন্নয়নের প্রত্যাশা তৈরি করে। কিন্তু সেই উন্নয়নের নাম যদি প্রতারণার আড়াল হয়ে দাঁড়ায়, তবে ক্ষতি শুধু রাষ্ট্রীয় সম্পদের নয় ক্ষতিগ্রস্ত হয় জনগণের বিশ্বাস, দুর্বল হয় সুশাসনের ভিত্তি।
জামালপুর সদর উপজেলার গজারিআটা এলাকায় সরকারি কোনো অনুমোদিত প্রকল্প ছাড়াই একটি সরকারি সড়কের ইট খুলে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ সেই উদ্বেগকেই সামনে নিয়ে এসেছে। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রকল্পের কোনো প্রশাসনিক অনুমোদন বা কার্যাদেশ না থাকলেও সড়কটির ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধনের আয়োজন করা হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অনুষ্ঠানে জামালপুর সদর আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ওয়ারেছ আলী মামুনসহ কয়েকজন বিএনপি নেতা ও গণ্যমান্য ব্যাক্তি উপস্থিত ছিলেন। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে স্বাভাবিকভাবেই ধারণা তৈরি হয় যে এটি সরকারের অনুমোদিত উন্নয়নকাজ।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে। একটি প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন, কারিগরি নকশা কিংবা বাস্তবায়নকারী সংস্থার কার্যাদেশ ছাড়া কীভাবে ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করা হলো? যদি প্রকল্পটি তখনও অনুমোদন না পেয়ে থাকে, তাহলে উদ্বোধনের যৌক্তিকতা কী ছিল? একজন সংসদ সদস্য বা জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে জনগণ কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বই নয়, আইনি ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার প্রতিও শ্রদ্ধাশীল আচরণ প্রত্যাশা করে। ফলে প্রকল্পের বৈধতা নিশ্চিত না করে উদ্বোধনে অংশগ্রহণের বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
আরও উদ্বেগের বিষয়, এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী যদি প্রকল্পের বিষয়ে অবগত না থাকেন বা তাঁর দপ্তরের মাধ্যমে কোনো অনুমোদন জারি না হয়ে থাকে, তাহলে সেই ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্যোগ কারা নিল? কোন কর্তৃত্বে নিল? সরকারি উন্নয়নব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে এমন উদ্যোগের পেছনে কারা ছিল? এটি এখন তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত।
একটি সরকারি সড়কের ইট দিনের পর দিন খুলে নেওয়া হয়েছে। শত শত ট্রলি ইট সরানো হয়েছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। অথচ স্থানীয় প্রশাসন, সংশ্লিষ্ট দপ্তর কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। প্রশ্ন হচ্ছে, এটি কি কেবল অবহেলা, নাকি নজরদারির ঘাটতি? রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব যাদের ওপর ন্যস্ত, তারা কি এই দায় এড়াতে পারেন?
জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকাও এখানে পর্যালোচনার দাবি রাখে। কোনো অনুষ্ঠানে তাঁদের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি বৈধতার প্রতীক হয়ে ওঠে। ফলে সেই উপস্থিতিকে ব্যবহার করে যদি কোনো প্রতারক চক্র জনগণকে বিভ্রান্ত করে এবং সরকারি সম্পদ লুটে নেয়, তবে বিষয়টি শুধু প্রতারণা নয়; এটি জনবিশ্বাসের অপব্যবহার। তাই কে কাকে ব্যবহার করেছে, নাকি কেউ যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ব্যয় বৃদ্ধি, নিম্নমানের কাজ কিংবা দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু প্রকল্প অনুমোদনের আগেই উন্নয়নের প্রচারণা চালিয়ে পরে সরকারি সড়কের ইট খুলে বিক্রি করে দেওয়ার মতো ঘটনা নতুন ধরনের প্রতারণার ইঙ্গিত দেয়। এটি দেখিয়ে দেয়, উন্নয়নের ভাষা ও রাজনৈতিক প্রতীককে ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্র রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনের নতুন কৌশল তৈরি করছে।
শুধু কয়েকজন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না। প্রয়োজন ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত। কারা পরিকল্পনা করেছে, কারা সহযোগিতা করেছে, কারা নীরব থেকেছে, কোথাও কোনো প্রশাসনিক ব্যর্থতা বা প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়া ছিল কি না—সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে উদ্ঘাটন করতে হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত পুনর্নির্মাণ করে জনগণের দুর্ভোগ দূর করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও জরুরি। প্রতিটি সরকারি প্রকল্পের অনুমোদন, ব্যয়, বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান, ঠিকাদারের নাম, তদারককারী কর্মকর্তা এবং কাজের সময়সীমা জনসমক্ষে দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কোনো প্রকল্পের প্রশাসনিক অনুমোদন ও কার্যাদেশ ছাড়া ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন বা উদ্বোধন না করার বিষয়ে কঠোর নীতিমালা কার্যকর করা প্রয়োজন। জনপ্রতিনিধিদেরও এ ক্ষেত্রে অধিক সতর্কতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতি অনুসরণ করতে হবে।
উন্নয়ন কেবল ইট, বালু ও পিচের সমষ্টি নয়। উন্নয়ন মানে আইনের শাসন, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা। সেই আস্থার সুযোগ নিয়ে যদি সরকারি সম্পদ লুট হয়, তবে উন্নয়নের সব অর্জন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
জামালপুরের এই ঘটনা তাই একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ব্যবস্থার জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখন সময় দায় এড়ানোর নয়, বরং সত্য উদ্ঘাটন, জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং এমন বার্তা দেওয়া যে—উন্নয়নের নামে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের সাহস ভবিষ্যতে আর কেউ দেখাতে না পারে।
লেখক : গণমাধ্যমকর্মী।
(মুক্তমতে প্রকাশিত মত লেখকের নিজস্ব, সাপ্তাহিক মুক্তকালের সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নাও থাকতে পারে)

