Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 15:12 pm
মুক্তমত

শিক্ষক আন্দোলনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি: আশ্বাসের রাজনীতি না বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি?

শিক্ষক আন্দোলনের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি: আশ্বাসের রাজনীতি না বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি?

আতিকুর রহমান||

বাংলাদেশের বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীগণ দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্য আন্দোলন করে আসছেন। বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির দাবিসহ, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতার উপর্যুক্ত হারে নিশ্চিতকরণ, উৎসব ভাতা বৃদ্ধি, সার্বজনীন বদলি, পদোন্নতি, জাতীয়করণ এই আন্দোলনের মূল উপজীব্য।

Advertisement

শিক্ষকগণ শুধু নিজেদের মর্যাদার জন্য নয় বরং দেশের শিক্ষাাব্যবস্থার স্থায়িত্ব ও মানোন্নয়নের জন্যও নিজেদের দাবি জানান। এই অধিকার আদায়ের আন্দোলন শিক্ষকদের সংহতি, আন্দোলনের প্রতি শ্রদ্ধা ও সকল বৈষম্য দূরীকরনে সরকারের আন্তরিকতা এবং যৌক্তিক দাবিগুলো বাস্তবায়নে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ অনিবার্য বাস্তবতা হলেও আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতায় তা যৌক্তিক প্রত্যাশার প্রতিফলিত ঘটেনি।

বিভিন্ন সময়ের যৌক্তিক আন্দোলনের মাধ্যমে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীগণ কিছু দাবি আদায় করতে পারলেও এখনো সরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধার সাথে রয়েছে পাহাড়সম বৈষম্য। মূলে বিগত সরকারগুলোর উদাসীনতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থাকলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বিভাজিত মতামত ও ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষক সংগঠন সৃষ্টিও কম দায়ি নয়।

অবাক করা বিষয় হলেও গত ১৩ আগস্টের জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের ব্যানারে ডাকা আন্দোলনটি ছিল শিক্ষদের স্বতস্ফুর্ত অংশ গ্রহনের বিরল দৃষ্টান্ত। বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় এই দিন সারা দেশের প্রায় ৮০-৮৫ হাজার শিক্ষক কর্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করেন। এই আন্দোলনে ১২ টি শিক্ষক সংগঠন অংশ গ্রহণ করলেও ফোকাস পয়েন্টে নেতৃত্ব দেন, এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব ও বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক কর্মচারী ফোরামের সভাপতি , প্রিন্সিপাল দেলাওয়ার হোসেন আজিজি।

১২ সদস্যের শিক্ষক প্রতিনিধি দল সচিবালয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার (সি আর আবরার) ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। শিক্ষক সংগঠনগুলোর ঐক্যমতের ভিত্তিতে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের প্রধান দাবি হিসেবে জাতীয়করণের বিষয়টি উপস্থাপন করলে তিনি বলেন, জাতীয়করণ একটি কঠিন বিষয়, এটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার করতে পারবে না। তবে বাড়ি ভাড়াসহ অন্য দাবিগুলো দেখবো।

শিক্ষক নেতাগণ পরবর্তীতে জোর দাবি করেন, সরকারি নিয়মে বাড়িভাড়া,চিকিৎসা ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে।

শিক্ষা উপসচিব সাইয়েদ এ জেড মোরশেদ আলী এবং শিক্ষা উপদেষ্টা জানান, বাড়িভাড়া মাসিক ১,০০০ থেকে ২,০০০ টাকা,এমপিওভুক্ত কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ৭৫% এবং চিকিৎসা ভাতা ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা করার প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রস্তাবিত চিকিৎসা ভাতা মেনে নিয়ে বাড়ি ভাড়া শতকরা হারে দেওয়ার প্রস্তাব করলে করার প্রস্তাব মূল বেতনের শতকরা হারে বাড়িভাড়া চান মর্মে শিক্ষক নেতাদের কাছে জানতে চাওয়া হয়। সরকারের বর্তমান সক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষক নেতাগণ বাড়ি ভাড়া ২০% প্রস্তাব করেন।

শিক্ষক নেতাদের দাবিগুলো বিবেচনায় এনে একটা খসড়া বাজেট চান এবং খসড়া বাজেটের ভিত্তিতে খরচ যাচাই-বাছাই করা হবে মর্মে সংশ্লিষ্ট মাধ্যম থেকে জানানো হয়।
মন্ত্রণায়লয়ের আশ্বাসের পর দাবিগুলো মেনে নেওয়ার একমাসের সময় সীমা বেধেঁ দিয়ে ১৩ তারিখের কর্মসূচি মূলতবী করেন শিক্ষক নেতারা।

তাদের মতে, যদি সরকার দাবিগুলো আন্তরিকতার সাথে বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ না করেন তবে, ১৪ সেপ্টেম্বর অর্ধদিবস, ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর পূর্ণদিবস কর্মবিরতি এবং ১২ অক্টোবর থেকে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন।

প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়া এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলাওয়ার হোসেন আজিজী গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের দাবি ছিল বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ। কিন্তু সরকারের সক্ষমতা বিবেচনা করতে হবে। সার্বিক বিবেচনায় আমরা এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের শতকরা হারে মূল বেতনের কমপক্ষে ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া দেওয়ার দাবি শিক্ষা উপদেষ্টা ও কর্মকর্তাদের কাছে জানিয়েছি।

শিক্ষা উপদেষ্টা আমাদের বলেছেন, তারা বাড়িভাড়া মাসিক ১ হাজার টাকা থেকে ২ হাজার টাকা করা এবং চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা করতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছেন। কিন্তু আমরা চাই মূলবেতনের শতকরা হারে বাড়িভাড়া ভাতা। পরে শিক্ষা উপদেষ্টা বিষয়টি বিবেচনা করবেন বলে জানিয়েছেন।

আরেকজন শিক্ষক নেতা এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের যুগ্মআহবায়ক ও বাংলাদেশ শিক্ষক ফোরামের সভাপতি মো. হাবিবুল্লাহ রাজু গণমাধ্যমকে শিক্ষা উপদেষ্টার বরাত দিয়ে বলেন- আমাদের দাবি যৌক্তিক কিন্তু তিনি সরকারের সক্ষমতার কথা বলছিলেন। শেষে তিনি আমাদের বলেছেন, সব শিক্ষক কর্মচারীকে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া দিতে কত খরচ হবে সে হিসাবটা দ্রুত মন্ত্রণালয়কে জানাতে। আমাদের দেওয়া হিসাবটা যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করে তারা পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।

এ যাবতকালে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম বারবার আশার আলো দেখালেও প্রতিশ্রুতির জালে যেন আটকে আছে তাদের স্বপ্ন। ন্যায্য বেতন-ভাতা বৃদ্ধি, বৈষম্যমুক্ত উৎসব ভাতা, পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সুবিধা, অবসরকালীন ভাতা ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা নির্ধারিত সময়ে প্রাপ্তি এসব চাহিদা নিয়ে শিক্ষক সমাজ বছরের পর বছর রাজপথে থেকেছে। সরকার বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস দিয়েছে বৈষম্য কমবে, সুবিধা বাড়বে, মর্যাদা পাবে শিক্ষকতা পেশা। কিন্তু বাস্তবে প্রতিশ্রুতির কাগজপত্রই কেবল ঘুরে বেড়িয়েছে মন্ত্রণালয়ের ফাইলের ভেতর।

বারবার আন্দোলনের শেষে ‘পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে’, ‘গবেষণা চলছে’ ,‘কাজ চলমান’, ‘আসন্ন বাজেটে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করবো’, ‘ বিশ্ব মানের শিক্ষক গড়ে তুলবো ইত্যাদি বাণীগুলো এক অদৃশ্য শিকল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ যে শিক্ষকরা প্রজন্ম গড়ে তুলছেন, তারাই আজ জীবনের মৌলিক নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত। আশ্বাসের রাজনীতি যেন এক বেদনার দীর্ঘ কাহিনি। আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমির শিক্ষা ক্ষেত্রে পাহাড়সম বৈষম্য নিরসনে কে দিবে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি?

Advertisement

Leave a Comment

Your email address will not be published.