মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তির নয়, একটি পরিবার ও পুরো সমাজের জন্য ভয়াবহ সংকট। কিশোরদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় প্রয়োজন পারিবারিক সচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ, কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও নৈতিক শিক্ষার সমন্বিত উদ্যোগ।
কিশোররাই একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্র। অথচ মাদকের ভয়াল ছোবল ক্রমেই বহু কিশোরের জীবন, স্বপ্ন ও সম্ভাবনাকে বিপন্ন করে তুলছে। মাদকের সহজলভ্যতা, অসৎ সঙ্গ, পারিবারিক অবহেলা এবং সামাজিক সচেতনতার অভাব কিশোরদের একটি অংশকে মাদকাসক্তির দিকে ঠেলে দিতে পারে। এর পরিণতি শুধু একজন কিশোরের জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর প্রভাব পড়ে পরিবার, সমাজ ও সামগ্রিক জনজীবনে।
মাদকাসক্তির কারণে অনেক পরিবারে অশান্তি সৃষ্টি হয়। সন্তানের আচরণে পরিবর্তন, পড়াশোনায় অমনোযোগ, দায়িত্বহীনতা কিংবা পরিবারের সঙ্গে বিরোধের কারণে মা-বাবাকে উদ্বেগ ও মানসিক চাপের মধ্যে দিন কাটাতে হয়। কখনো কখনো সামাজিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতিরও মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের। তবে মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্তি একটি গুরুতর সমস্যা, যার সমাধানে শুধু দোষারোপ বা সামাজিকভাবে হেয় করা নয়, প্রয়োজন সচেতনতা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং পরিবারের সহানুভূতিশীল ভূমিকা।
মাদকের সহজলভ্যতা বন্ধ করতে হবে
কিশোরদের মাদকাসক্তি প্রতিরোধে মাদকের সরবরাহ ও অবৈধ বিক্রি বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। যারা মাদক পাচার, চোরাচালান ও বিক্রির সঙ্গে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা ও বিক্রয়কেন্দ্র চিহ্নিত করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো অপরাধী রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা আর্থিক প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে না যায়।
শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। মাদক কোথা থেকে আসছে, কীভাবে ছড়িয়ে পড়ছে এবং কিশোররা কীভাবে এর সংস্পর্শে আসছে—এসব বিষয় চিহ্নিত করে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সমাজের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
পরিবারের দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
একটি শিশুর প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তার পরিবার। মা-বাবার আচরণ, পারিবারিক পরিবেশ ও সন্তানদের সঙ্গে সম্পর্ক তাদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই সন্তানদের শুধু খাবার, পোশাক ও শিক্ষার ব্যবস্থা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; তাদের মানসিক অবস্থার খোঁজ নেওয়া, বন্ধুদের সম্পর্কে জানা এবং প্রতিদিন কিছুটা সময় একসঙ্গে কাটানোও জরুরি।
সন্তানের আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, পড়াশোনায় অনীহা, অস্বাভাবিক অর্থের চাহিদা কিংবা সন্দেহজনক সঙ্গের মতো বিষয় দেখা দিলে অভিভাবকদের সতর্ক হতে হবে। তবে সন্দেহের ভিত্তিতে অপমান, মারধর বা কঠোর শাস্তির পথে না গিয়ে সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। সমস্যা দেখা দিলে প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক, চিকিৎসক কিংবা মাদকাসক্তি নিরাময় বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিতে হবে।
অনেক সময় পারিবারিক দূরত্ব, একাকিত্ব, মানসিক চাপ কিংবা বন্ধুমহলের প্রভাবে কিশোররা ভুল পথে পা বাড়ায়। তাই সন্তানদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাদের সমস্যা বোঝার চেষ্টা করা এবং ভালো কাজে উৎসাহিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
প্রয়োজন সামাজিক ঐক্য ও সচেতনতা
মাদক প্রতিরোধ শুধু প্রশাসন কিংবা কোনো একটি পরিবারের একার দায়িত্ব নয়। এটি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত দায়িত্ব। শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, সামাজিক সংগঠন, সাংবাদিক, ক্রীড়া সংগঠক ও সচেতন নাগরিকদের এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাদকের ক্ষতিকর দিক নিয়ে নিয়মিত আলোচনা, অভিভাবক সমাবেশ, উঠান বৈঠক, সচেতনতামূলক সভা এবং প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি কিশোরদের খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, বই পড়া, স্বেচ্ছাসেবা ও সৃজনশীল কাজে যুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের সামনে ইতিবাচক লক্ষ্য ও সুস্থ বিনোদনের সুযোগ তৈরি করা গেলে মাদক থেকে দূরে থাকার অনুপ্রেরণা বাড়বে।
এ ক্ষেত্রে স্থানীয় পর্যায়ে মাদকবিরোধী কমিটি গঠন, গোপনীয়তা রক্ষা করে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে কোনো কিশোরকে প্রমাণ ছাড়া মাদকাসক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা কিংবা সামাজিকভাবে অপদস্থ করা যাবে না। এতে সমস্যা সমাধানের বদলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার গুরুত্ব
সন্তানদের নৈতিক মূল্যবোধ, আত্মসংযম, দায়িত্ববোধ এবং ভালো-মন্দের পার্থক্য শেখানো পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ইসলামের শিক্ষা ও ইসলামী আকিদার আলোকে সন্তানদের নৈতিকতা, মানবিকতা, আত্মশুদ্ধি এবং ক্ষতিকর কাজ থেকে বিরত থাকার বিষয়ে উৎসাহিত করা যেতে পারে। ধর্মীয় শিক্ষা যেন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সততা, সহমর্মিতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের চর্চায় প্রতিফলিত হয়।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থাও জরুরি। মাদকাসক্তি থেকে মুক্তির জন্য একজন কিশোরকে পরিবার ও সমাজের সহায়তা দিতে হবে, যাতে সে ভুল পথ থেকে ফিরে এসে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।
কিশোরদের জন্য চাই নিরাপদ ভবিষ্যৎ
আজকের কিশোররাই আগামী দিনের অভিভাবক, শিক্ষক, শ্রমজীবী, উদ্যোক্তা ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল নাগরিক। তাদের একটি অংশ মাদকের কারণে বিপথে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ। তাই সমস্যাটি অবহেলা করার সুযোগ নেই। মাদকাসক্ত কিশোরকে ঘৃণা না করে মাদক থেকে দূরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে; অন্যদিকে মাদক ব্যবসায়ী ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা এমন একটি সমাজ চাই, যেখানে কোনো কিশোর মাদকের সহজলভ্যতার কারণে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবে না; কোনো মা-বাবাকে সন্তানের মাদকাসক্তি নিয়ে অসহায় বোধ করতে হবে না; আর কোনো পরিবার সামাজিক লজ্জার ভয়ে চিকিৎসা ও সহায়তা নেওয়া থেকে পিছিয়ে থাকবে না।
এ জন্য প্রয়োজন পরিবারে দায়িত্বশীল অভিভাবকত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা, সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ, মাদক নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কার্যকর ভূমিকা এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ সম্প্রসারণ।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার। আজই যদি আমরা সচেতন হই, সন্তানদের পাশে দাঁড়াই এবং মাদকের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলি, তাহলে আগামী প্রজন্মকে আরও নিরাপদ, সুস্থ ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়া যাবে।
—–লেখক, মো. আবু হানিফ, সম্পাদক, সাপ্তাহিক মুক্তকাল।




