Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 14:31 pm
মুক্তদেশ

গণমাধ্যম সংস্কার প্রস্তাবনা

গণমাধ্যম সংস্কার প্রস্তাবনা

খালিদ ইবনে আমিন।।

অবাধ তথ্যপ্রবাহ জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়  গণমাধ্যমের হাত ধরে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে সে যাত্রা আরো বেগবান। চোখের পলকে দুনিয়ার তাবৎ তথ্যগুলো মানুষের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

Advertisement

মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের সাথে সাথে বেড়েছে সচেতনতা,  কোনো তথ্য পেলেই মানুষ অন্ধের মতো বিশ্বাস করে না। যাচাই করে নেয় সত্যাসত্য।

ইদানিং গণমাধ্যমে সংবাদকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের বিধি-নিষেধের অনুসরণ করা হয় না। অনেক সময় শিক্ষাগত যোগ্যতাও হালকা করে দেখা হয়। গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন নয় এমন প্রার্থীকেও প্রতিবেদক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।

কোনো কোনো হাউজে সম্পাদক বা হেড অফ নিউজের পরিচিত হলে দ্রুত নিয়োগ পাওয়া যায়। আবার ভিজুয়াল মাধ্যম টেলিভিশন সাংবাদিকতায় জেলা ও মহানগরী পর্যায়ে একাধিক প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে লোগো বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে ন্যাশনাল ডেস্ক ইনচার্জ থেকে শুরু করে হেড অফ নিউজ কিংবা সম্পাদকের বিরুদ্ধে। টেলিভিশনের উচ্চপদস্থ কর্তাব্যক্তি কিংবা মালিকের সুনজর প্রাপ্ত ব্যক্তি অযোগ্য হলেও খুব সহজে সাংবাদিক হয়ে যান।

কোনো ধরনের প্রাথমিক ও মৌলিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই রিপোর্টারদের মাঠে ছেড়ে দেওয়া হয়। যার ফলে সাংবাদিকতার মতো একটি দায়িত্বশীল পেশায় অপসাংবাদিকতার বিস্তার ঘটছে।

বাংলাভাষা ও উচ্চারণের যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকায় নিউজ লেখা ও সম্পাদনায় যেমন ভুল থাকে, তেমনি ক্যামেরার সামনে লাইভেও অবাঞ্চিত শব্দচয়ন ও উচ্চারণ করতে দেখা যায়। এতে ভাষা দূষণের পাশাপাশি টিভি চ্যানেলের অপযশ হচ্ছে। যথাযথ প্রশিক্ষণের অভাবে একজন রিপোর্টার উপযুক্ত  প্রশ্ন করতে ব্যর্থ হন।

উদ্বেগের বিষয়, প্রতিষ্ঠিত টিভি চ্যানেলগুলোতে শিক্ষানবিশ সাব-এডিটর নিয়োগ দেওয়া হয়, কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। সম্পাদনার ঘাটতির ফলে ছোট ছোট সংবাদেও মোটাদাগে ভুল ধরা পড়ে।

গণমাধ্যমের যে কোন অঙ্গনে সাংবাদ কর্মী নিয়োগে শিক্ষাগত যোগ্যতায় আপোষ নয়। শিক্ষকতা, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি ও ওকালতি পেশার মতো সাংবাদিকতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা। এ পেশাগুলোর শুধু ডিগ্রি থাকলেই হয় না, পাশাপাশি এ সংশ্লিষ্ট কাউন্সিল থেকে পরীক্ষা দিয়ে সনদ গ্রহণ করতে হয়। যদিও সাংবাদিকতা একটি সৃজনশীল পেশা, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো সনদব্যবস্থা না থাকায় প্রচুর অপসাংবাদিক প্রবেশ করে এ পেশার ঐতিহ্য নষ্ট করছে।  তথ্যমন্ত্রণালয় থেকে সাংবাদিকদের জন্য একটি সেন্ট্রাল ডেটাবেইজ তৈরি করা অতিব প্রয়োজন।

গণমাধ্যমকর্মীদের সচিবালয়ে প্রবেশকার্ড প্রদানে সত্যিকারের সাংবাদিক নিশ্চিত হওয়া। এজন্য অ্যাক্রিটিটেশন নীতিমালা আপডেট করা প্রয়োজন।

পেশার মান ধরে রাখতে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও সনদ ব্যবস্থা চালু করা। চালুর সিদ্ধান্ত হলে, যারা চাকরিরত তাদেরকে প্রাতিষ্ঠানিক নিরীক্ষণের মাধ্যমে সনদ দেয়া। যারা নতুন প্রবেশ করবে তাদের সনদ নিয়ে চাকুরিতে প্রবেশ করা।  সাংবাদিকতায় আগ্রহীদের মেধা যাচাইয়ের মাধ্যমে নিয়োগের পূর্বে পিআইবি ও নিমকোতে ২/৩ মাসের বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা। প্রশিক্ষণ সনদধারীদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া।

আধুনিক ভিজুয়াল মাধ্যম টেলিভিশনে বেতন-ভাতা সংক্রান্ত কোন ওয়েজ বোর্ড নেই। সংবাদপত্রে ওয়েজ বোর্ড আছে কিন্তু বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে তা অনুসরণ করা হয়না।

কর্মীর নিয়োগ পত্রে ওয়েজ বোর্ড ফলো করার যে তথ্য থাকে তা বেশির ভাগ হাউজে শুভঙ্করের ফাঁকি । অনেকই জীবিকার তাগিদে মাত্র ১০/১৫ হাজার টাকায় শিক্ষানবিশ সাংবাদিক হিসেবে কাজে যোগদান করে। টেলিভিশন, অনলাইন এবং সংবাদপত্রসহ সকল গণমাধ্যমের জন্য একটি সমন্বিত ওয়েজবোর্ড গঠন ও বাস্তবায়ন করা, বর্তমান আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে। সরকারি বিজ্ঞাপন বিতরণে, সত্যিকারের এবং বিশ্বাসযোগ্য ডিএফপি লিস্ট তৈরি এবং অডিট নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

নিয়োগপত্রে বলা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রেই বাৎসরিক ইনক্রিমেন্ট বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠান হয় না। আবার ইনক্রিমেন্ট দেয়ার ক্ষেত্রেও দ্বিচারিতা দৃশ্যমান। মূল্যস্ফীতির সাথে সমন্বয় করে প্রতি বছর ইনক্রিমেন্ট দেয়া প্রয়োজন। কর্মভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পদন্নোতি নিশ্চিত করা। এবং  এজন্য একটি গণমাধ্যম বান্ধব চাকুরির বিধিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে।

দুনিয়ার সর্বত্র শ্রমসময় ৮ঘন্টা হলেও গণমাধ্যমে এটা মানা হয় না বা মানা যায়না। অতিরিক্ত কর্মঘন্টার জন্য অধিকাংশ মিডিয়া হাউজ কোন ধরণের বাড়তি পারিশ্রমিক দেয়না। কখনো বাড়তি কাজের চাপে সংবাদকর্মীগণ অসুস্থ হয়ে পড়েন।

এছাড়াও সরকার কর্তৃক প্রদেয় নিয়োগবিধি না মানলে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা রাখা। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা। নিয়োগ বিধি অনুসরণ করে নিয়োগ পাওয়া গণমাধ্যম কর্মীদের প্রশিক্ষণ ছাড়া কাজ শুরু করতে না দেয়া। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট ও জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউটকে ঢেলে সাজানো। প্রতিষ্ঠান দুটোর পুরনো প্রশিক্ষণ পদ্ধতি বর্তমান আধুনিক ভিজুয়াল সাংবাদিকতার সাথে যুৎসই নয়। এজন্য লোকবল ও রাষ্টীয় বাজেট বাড়ানো।

গণমাধ্যমগুলোর খরচের তুলনায় আয় খুব সীমিত। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জনপ্রিয় হওয়ায় বিজ্ঞাপনের বাইরে এই মাধ্যমে আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এখনো টিভি চ্যানেলের ফিড ক্যাবল অপারেটরা বিনা পয়সায় নিয়ে গ্রাহকদের কাছে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আয় করছে। যদিও সংবাদপত্র গুলো কপি বিক্রি করে কিছু টাকা পায় কিন্তু টেলিভিশনগুলো ফিড থেকে কোন আয় পায় না। অন্যদিকে, বিজ্ঞাপন সংগ্রহে অনৈতিক প্রতিযোগিতা অপসাংবাদিকতাকে উৎসাহিত করছে।

বিজ্ঞাপনদাতা কিংবা সংগঠন কর্তৃক প্রদেয় খবরের সংবাদমূল্য না থাকলেও  তা প্রকাশ বা প্রচারে বাধ্য হয় নিউজ রুম।

ঢাকায় অবস্থানরত গণমাধ্যম ভবন গুলোর বেশির ভাগই নিরাপদ নয়। অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা অপ্রতুল। এ বিষয়ে মালিক পক্ষের অনীহা চোখে পড়ার মতো। অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে পুরনো ভবনে। যে কোন সময় ধ্বসে যেতে পারে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে ফায়ারসার্ভিস, পুলিশ বিভাগ, দেশি-বিদেশি এনজিও এর প্রত্যক্ষ সহায়তায় একটি নিরাপত্তা ম্যানুয়াল তৈরির করা যেতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন থেকে গণমাধ্যম সরিয়ে নিতে একটি নির্দেশনা জারি করা।

একজন সংবাদ কর্মী যখন কোন দুর্ঘটনা কাভার করতে যায় তখন হাউজগুলো নুন্যতম ঝুঁকি নিরসন সরঞ্জাম বিতরণ করেনা। হাল আমলে চেস্টশিল্ট ও হেলমেট  দেয়া হচ্ছে , তবে মাঠে কাজ করতে বেগ পেতে হয়।

লেটনাইট ডিউটির ক্ষেত্রে বাসায় পৌঁছানোর জন্য অনেক হাউজই যথাযথ যানবাহনের ব্যবস্থা রাখে না। গভীর রাতে ছিনতাই কিংবা দুর্বিত্তের হামলার সমুহ ঝুঁকি থাকে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন নারী কর্মীগণ।  গণমাধ্যমের অভ্যন্তরে নারীবান্ধব অনুকূল পরিবেশ তৈরীর লক্ষ্যে যৌন হয়রানি নিরসনে প্রতিটি হাউজে কমিটি গঠনে বাধ্য করা। ইদানীং যৌন হয়রানির কথা প্রকাশ্যে আসছে।

ঢাকা সহ দেশের অধিকাংশ সাংবাদিক সংগঠনগুলো প্রকৃত সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্ব করছে না। সদস্যদের সিংহভাগই মূল ধারার সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত নয়। অথচ সরকার যখন সাংবাদিকদের বিষয়ে কথা বলতে চায়, তখন এসব ইউনিয়নের নেতাদের সঙ্গেই বৈঠক করে। ফলে সাংবাদিকদের প্রকৃত সমস্যা সরকারের কাছে পৌঁছায় না, তাই সমাধানও হয় না।

সংস্কারের লক্ষ্যে কিছু জায়গায় নজর দেওয়া প্রয়োজন, যেমন-  কোন সংবাদ নিয়ে কারো আপত্তি থাকলে আদালতে না গিয়ে প্রথমে প্রেস কাউন্সিলে অভিযোগ জানাতে আইনী সংশোধন আনা। ধান্ধাবাজি চাঁদাবাজি অপসাংবাদিকতার জন্য শাস্তির বিধান ও জরিমানার ব্যবস্থা করা। প্রেস কাউন্সিলকে আধুনিক যুগ জিজ্ঞাসার আলোকে ঢেলে সাজানো। এতে সংবাদ সংক্রান্ত মামলা-মোকদ্দমা অনেক কমে যাবে। সাংবাদিক ইউনিয়ন গুলোর সদস্য ও নেতৃত্বে যাতে নিবন্ধিত গণমাধ্যম কর্মীরা আসতে পারেন তার সুপারিশ করা। সংবাদবিট ভিত্তিক সংগঠনগুলোর নেতৃবর্গীয়দের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে গণমাধ্যম সংস্কারে সুপারিশ করা। এতে প্রকৃত মাঠের সাংবাদিকদের অভিমত জানা যাবে। যে কোন ধরনের সমস্যার তড়িৎ সমাধান হবে।

বাংলাদেশ কতজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী আছেন তার হিসেব সরকারের কাছে,  কিন্তু কতজন   সাংবাদিক আছেন তার কোন সঠিক তালিকা নেই। ফলে ভুয়া সাংবাদিক নাগরিকদের সঙ্গে প্রতারণা করছে, ব্যাবসায়ীদের কাছে চাঁদাবাজি করছে।

মূলধারা ও আন্ডারগ্রাউন্ড গণমাধ্যমের সংজ্ঞায়ন করা প্রয়োজন। মূলধারা ও আন্ডার গ্রাউন্ড গণমাধ্যম এর কথা সব সময় আলোচনায় আসে। কিন্তু এর কোন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। এতে করে, অনেক আন্ডার গ্রাউন্ড গণমাধ্যম মূল ধারার লোগো কপি করে জনগণকে ভুয়া তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে।

অবাধ তথ্য প্রযুত্তির কল্যাণে ইন্টারনেট সহজলভ্য হয়েছে, ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ডিজিটাল মিডিয়া। দেশি বিদেশি সংবাদভিত্তিক মিডিয়ার ছড়াছড়ি। এসব অনলাইন ভিত্তিক, ব্যক্তি কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান অনেক সময় ভুল, অসত্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদ প্রচার করে সমাজ ও রাষ্ট্রে অস্থিরতা তৈরি করছে।

দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠায় গণমাধ্যমের ভূমিকা রাখার যে অভিযোগ এসেছে উপরের বর্ণিত বাস্তবিক কারনে।

সাংবাদিকতা পেশাকে যদি একটি সুনির্দিষ্ট আইনী কাঠামোর মধ্যে আনা যায়, তবে গণমাধ্যম কর্মীদের পেশাদারিত্বে দক্ষতা বাড়বে এবং চাকুরির নিশ্চয়তার পাশাপাশি বাগবে প্রতিষ্ঠানের আয়।

সুসাংবাদিকতার প্রসার ঘটবে, মেধাবী তরুণ প্রজন্মের প্রতিশ্রুতিশীল ছেলে-মেয়েরা  এ পেশায় আসতে আগ্রহ বোধ করবে। রাষ্ট্রের চতুর্থ স্থম্ভ হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে গণমাধ্যম, যা কিনা গণতন্ত্র প্রসারে সহায়তা করবে।

জুলাই-আগস্ট বিপ্লব ফ্যাসিবাদের দোরগোড়ায় আঘাত করেছে প্রায় দুই হাজার ছাত্রজনতার প্রানের বিনিময়ে। সাড়ে পনেরো বছরে ফ্যাসিবাদ আরো ডালপালা মেলেছে। কিন্তু গণমাধ্যমের জন্য গণ শত্রু সেই আদিকাল থেকেই তৃতীয় বিশ্বের অনুন্নত দেশগুলোতে বিরাজমান। গণমাধ্যমের মতো স্পর্শকাতর এই অঙ্গনের মুক্তবিহঙ্গ পরিচিতি আসলে কেউই দিতে চায়নি কোন কালে!

তবুও আমরা আশাবাদী এবার কছু একটা ইতিবাচক পরিবর্তন হবে জাতির স্বার্থে আগামীর সুন্দর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মানে।

 

  • এই নিবন্ধে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং মুক্তকালের সম্পাদকীয় অবস্থানকে প্রতিফলিত করে না।

 

Advertisement

Leave a Comment

Your email address will not be published.