সাইদুর রহমান
শিক্ষার্থী:মাস্টার্স অধ্যয়নরত (বাংলা) সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ জামালপুর
আমাদের সমাজে শ্রেণিবৈষম্য যেন নীরব এক রোগ,যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে আঘাত করে। শহরের ঝকঝকে ভবন আর কাচঘেরা রেস্টুরেন্টে বেড়ে ওঠা অনেক তরুণ–তরুণী এখনও বুঝতে শেখেনি যে মানুষের মর্যাদা পোশাকের দাম বা গাড়ির মডেল দিয়ে মাপা যায় না। তাই তারা রিকশাচালক, গৃহকর্মী, দোকানদার কিংবা পথের মানুষকে দেখলেই ভেতরে ভেতরে এক অদৃশ্য দেয়াল তুলে দেয়।
উচ্চবিত্ত মানুষগুলো ভুলে যায় যে আবাসস্থলে তারা বিলাসে দিন কাটায়, সেটাও কোনো এক শ্রমিকের শক্তি, মেধা ও সময়ের বিনিময়ে দাঁড়িয়ে আছে।
বাস্তবে দেখা যায়, একটি শপিংমলের বাইরে দাঁড়ানো সিকিউরিটি গার্ডকে অনেকে মানুষ বলেই গণ্য করে না। গৃহকর্মীকে “আপা” বা “ভাই” না বলে “ওই” বলে ডাকাই যেন স্বাভাবিক। অথচ এই মানুষগুলোর পরিশ্রমেই শহরের জীবন সচল থাকে,সকালে বাসা পরিষ্কার করা থেকে রাতে নিরাপত্তা দেওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের ভূমিকা অপরিসীম।
তাহলে কেন?
উচ্চবিত্ত মানুষ তার বাসার সহায়ককে একই টেবিলে বসে আহার করাতে নারাজ। বরং তার খাবারের জায়গা হয় জরাজীর্ণ দেয়ালের আড়ালে। থাকতে পারে মানুষের দৈহিক গঠনের আকৃতি বিভিন্ন রুপ অথচ রক্তে তো কোনো ভিন্নতা নেই, কবরেও নেই কাপড়ের আলাদা চাহিদা তবে বিভেদের এই দেয়াল কোথা থেকে?
বৈষম্যের সবচেয়ে কষ্টদায়ক রূপটি প্রকাশ পায় আচরণে। উচ্চবিত্ত পরিবারের শিশুরা ছোটবেলা থেকেই শেখে“ওরা আলাদা।” ফলে বড় হয়ে তারা মানুষের দিকে নয়, শ্রেণির দিকে তাকায়।
আর নিম্নবিত্তের মানুষ জন্ম থেকেই শিখে নেয় অবহেলার ভাষা। তারা জানে বাসে সিট খালি থাকলেও তাদের পাশে কেউ বসতে চায় না; ব্যাংকে লাইনে দাঁড়ালে তাদের দিকে সন্দেহের চোখ পড়ে। দেখতে অগোছালো বা সরল হওয়াই যেন তাদের অপরাধ। কিন্তু তাই বলে কি তারা ব্যাংকে দাঁড়াতে পারবে না?
সত্যটি খুব সরল,মানুষের মূল্য তার অবস্থানে নয়; মূল্য তার কাজে, সততায় ও মানবিকতায়। সমাজ তখনই মানবিক হবে, যখন আমরা বুঝতে শিখব একজন শ্রমিকের ঘাম যেমন সম্মানের, তেমনি ধনী মানুষের সাফল্যও পরিশ্রমের ফল। ভেদাভেদের এই দেয়াল ভাঙতে হলে প্রথম কাজ হলো মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তার সাম্যবাদী কাব্যগ্রন্থে ‘মানুষ’ কবিতায় দৃপ্ত কণ্ঠে লিখেছেন
“গাহি সাম্যের গান—
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম-জাতি
সব দেশে, সব কালে ঘরে ঘরে, তিনি মানুষের জ্ঞাতি।”
এই বাণী মুখস্থ থাকলেও, আজ অনেক শিক্ষিত উচ্চবিত্তের কাছে তা শুধু বাণীতেই সীমাবদ্ধ।
আমরা যে যেখানেই থাকি শ্রেণি নয়, সম্মান দিয়ে সম্পর্ক গড়ি। তবেই সমাজ সত্যিকার অর্থে বদলাবে।




