চ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় ২০২৬ সালের ফলাফল দেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বার্তা দিয়েছে। ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড় পাসের হার ৫২ দশমিক ১২ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। গত ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার এবং এক বছরে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৪২ শতাংশ কমে যাওয়ার ঘটনা নিছক পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে শিক্ষাব্যবস্থার নানা দুর্বলতা ও দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার প্রতিফলন রয়েছে।
এবার পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে পরীক্ষা, অভিন্ন ও মানসম্মত প্রশ্নপত্র, খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা এবং শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির ঘাটতিকে ফল খারাপ হওয়ার সম্ভাব্য কারণ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রভাবও আলোচনায় এসেছে। এসব কারণের বাস্তবতা থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি, পাঠদানের মান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাঁদের, তাঁরা কতটা সফল হয়েছেন?
বিশেষ করে ইংরেজি ও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিষয়ে ৩ লাখ ৮২ হাজার ২১ জন শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার বিষয়টি আলাদা করে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ইংরেজি শিক্ষার দুর্বলতা দীর্ঘদিনের। প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বছরের পর বছর ইংরেজি পড়েও বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এই বিষয়ে উত্তীর্ণ হতে না পারা আমাদের পাঠদান পদ্ধতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একইভাবে আইসিটির মতো সময়োপযোগী বিষয়ে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ব্যর্থতা ডিজিটাল শিক্ষার প্রস্তুতি ও শ্রেণিকক্ষের বাস্তবতা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
অন্যদিকে, মানবিক বিভাগে পাসের হার ৪২ দশমিক ১৭ শতাংশে নেমে আসা এবং বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের ১১টি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীর পাস না করার ঘটনাও উদ্বেগজনক। কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী ব্যর্থ হলে শুধু শিক্ষার্থীদের মেধা বা অধ্যবসায়কে দায়ী করা যায় না। সেখানে পাঠদানের মান, শিক্ষক উপস্থিতি, বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা, ব্যবস্থাপনা ও তদারকি কতটা কার্যকর ছিল, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
তবে পরীক্ষার খাতা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকলে পাসের হার কমেছে বলে সেই মূল্যায়ন পদ্ধতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করা ঠিক হবে না। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অর্জন প্রতিফলিত হওয়াই পরীক্ষার উদ্দেশ্য। কৃত্রিমভাবে নম্বর বাড়িয়ে পাসের হার উঁচু দেখানো শিক্ষার মানোন্নয়ন নয়। বরং এই ফলাফলকে শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা শনাক্ত করার সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। একই সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাস ও অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা যথাযথ সহায়তা পেয়েছিল কি না, সেটিও পর্যালোচনা করতে হবে।
ফেল করা শিক্ষার্থীদের আগামী এক থেকে দুই মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা ইতিবাচক। তবে শুধু পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যেসব শিক্ষার্থী এক বা একাধিক বিষয়ে অকৃতকার্য হয়েছে, তাদের জন্য বিষয়ভিত্তিক বিশেষ ক্লাস, দুর্বলতা চিহ্নিত করে সহায়ক পাঠদান এবং মানসিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফল অত্যন্ত খারাপ, সেগুলোর জন্য বিশেষ তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
শিক্ষার মানোন্নয়ন মানে শুধু ভালো ফল প্রকাশ নয়; বরং প্রতিটি শিক্ষার্থীর শেখার সুযোগ নিশ্চিত করা। একটি প্রজন্মের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ব্যর্থ হলে তার প্রভাব শুধু তাদের ব্যক্তিগত জীবনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, পরিবার, কর্মসংস্থান ও জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নেও পড়ে। তাই এই ফলাফলকে শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে চিহ্নিত করে দায়িত্ব শেষ করা যাবে না। শিক্ষা মন্ত্রণালয়, শিক্ষা বোর্ড, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজেদের দায়িত্ব পর্যালোচনা করতে হবে। ফল বিপর্যয়ের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে কার্যকর সংস্কারই এখন সময়ের দাবি।




