Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 15:11 pm
অন্যান্য

মিল্লি: জামালপুরের খাদ্য-ঐতিহ্যের প্রাণ

মিল্লি: জামালপুরের খাদ্য-ঐতিহ্যের প্রাণ

মোঃ আব্দুল হাই আলহাদী ||

বাঙালি সংস্কৃতি মূলত কৃষিভিত্তিক সমাজের সংস্কৃতি। গোপাল হালদার তাঁর ‘সংস্কৃতির রূপান্তর’ গ্রন্থে লিখেছেন, ভারতবর্ষের যে সংস্কৃতি নানা ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে, তা প্রধানত কৃষিজীবী সমাজের সংস্কৃতি। এই কৃষিনির্ভর জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন খাদ্যাভ্যাস ও লোকজ উৎসব, যা প্রতিটি জনপদকে দেয় এক একটি স্বতন্ত্র পরিচয়। বাঙালির এই আঞ্চলিক পরিচয় নিয়ে একদা উত্তর ভারতে একটি ছড়া প্রচলিত ছিল—“ধোতী ঢিলী-ঢালী, ভাত খাউয়া বাঙালী।” পবিত্র সরকার তাঁর ‘বাঙালি কে?’ প্রবন্ধে এই ছড়ার উল্লেখ করে দেখিয়েছেন যে, কালক্রমে বাঙালির পোশাক-আশাক বদলেছে, দৃশ্যগত পরিচয়ও বদলেছে, কিন্তু ভাত-কেন্দ্রিক খাদ্যপরিচয় আজও অনেকটাই অটুট। অর্থাৎ, বেশভূষা দিয়ে না হলেও খাদ্যাভ্যাস দিয়ে বাঙালির আঞ্চলিক স্বাতন্ত্র্য আজও চেনা যায়—আর তারই একটি জীবন্ত দৃষ্টান্ত জামালপুরের মিল্লি। স্থানভেদে মেন্দা, মিলানি বা পিঠালি নামেও পরিচিত। মিল্লির সাথে ভাত খাওয়ার সময় তরকারি বা ছালুনের পরিবর্তে মিল্লি খাওয়া হয় বলে একসাথে বলা হয় মিল্লিভাত।
বাংলাদেশের উত্তর-মধ্যাঞ্চলের জেলা জামালপুরের এই ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু খাবারটি দেখতে অনেকটা হালিমের মতো মনে হলেও এর স্বাদ, তৈরির পদ্ধতি এবং সামাজিক পরিবেশন-শৈলী একে অন্য যেকোনো খাবার থেকে আলাদা করে তুলেছে। কিন্তু এই খাদ্যরীতির উৎস কোথায়, তা অনুসন্ধান করলে দেখা যায় এটি নিছক একটি রন্ধনপ্রণালী নয়—বরং জামালপুর অঞ্চলে ইসলাম প্রচার ও মুসলমান বসতি স্থাপনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত একটি সাংস্কৃতিক উপাদান। এই প্রবন্ধে ঐতিহাসিক তথ্যপ্রমাণ, সাহিত্যিক উৎস, লোকপ্রচলিত ব্যাখ্যা এবং তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, মিল্লি বা মেন্দা বা পিঠালির প্রচলন জামালপুরে মুসলমানদের আগমনের পর এবং তা-ও বেশ কিছুটা পরবর্তীকালে গড়ে উঠেছিল।
জামালপুরে মুসলমানদের আগমন ও ইসলাম প্রচার
১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বখতিয়ার খলজি বাংলা জয় করলেও জামালপুর অঞ্চলে মুসলমানদের স্থায়ী বসতি ও ইসলাম প্রচারের সূচনা হয় আরও পরে। ময়মনসিংহ জেলা বিবরণীর রচয়িতা এফ. এ. সাকসের মতে, পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ দশক পর্যন্ত গড়দলিপা অঞ্চল কোচ সামন্তদের অধীনে ছিল। সুলতান সাইফুদ্দিন ফিরোজ শাহের (১৪৮৬-১৪৯১) সেনাপতি মজলিস খাঁ হুমায়ুন রাজা দলিপ সামন্তকে পরাজিত করে গড়দলিপা দখল করেন এবং সেই থেকেই এই অঞ্চল মুসলমানদের অধিকারে আসে। এর আগে কোনো সুফি-দরবেশ এই অঞ্চলে এসেছিলেন কিনা তার ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায় না।
১৫০৩ খ্রিস্টাব্দে ইয়েমেন থেকে হযরত শাহ কামাল (রহ.) ভারতবর্ষে আগমন করেন এবং পাঞ্জাবের মুলতানে কিছুকাল অবস্থানের পর জামালপুর অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে আসেন। তিনি মেলান্দহের দুর্মুটে ব্রহ্মপুত্র নদীতীরে খানকা স্থাপন করে দীর্ঘদিন ধর্মপ্রচার করেন এবং ১৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন। অন্যদিকে হযরত শাহ জামাল (রহ.) ১৫৮৫ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে জামালপুর সদর অঞ্চলে (তৎকালীন সিংহজানি) আগমন করেন; তাঁর নামানুসারেই পরবর্তীতে এই অঞ্চলের নাম হয় জামালপুর। এছাড়া হযরত শাহ মোহাম্মদ জাফর ও হযরত শাহ জঈন উদ্দিনের নামানুসারে জাফরশাহী ও জয়েনশাহী পরগনার নামকরণ হয়। এই তথ্যগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, জামালপুরে মুসলমান বসতি ও ইসলাম প্রচারের সূচনা মূলত ষোড়শ-সপ্তদশ শতাব্দীতে, অর্থাৎ মধ্যযুগের মাঝামাঝি সময়ে ঘটেছিল।

Advertisement

মিল্লি: পরিচিতি ও নামকরণ
বাংলা একাডেমির ‘বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা’-র জামালপুর খণ্ডে উল্লেখ আছে, জামালপুরসদর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী লোকব্যঞ্জনের নাম পিঠালি, যা জেলার সব উপজেলাতেই কমবেশি প্রচলিত। কোনো কোনো উপজেলায় এটি মেন্দা বা মিলানি নামে পরিচিত। রজব বকশীর ‘জামালপুর জেলার ইতিহাস’ গ্রন্থে অনুরূপ রন্ধনপ্রণালীর বিবরণ পাওয়া যায়, যেখানে একে ‘মিল্লি’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। প্রথম আলো পত্রিকার একটি প্রতিবেদনেও (আবদুল আজিজ, ৭ জুলাই ২০১৯) এই খাবারকে ‘মিল্লি’ বা ‘পিঠালি’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।
নামকরণের একটি প্রচলিত লোকব্যাখ্যা হলো, বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ একত্র হয়ে এই খাবার একসঙ্গে বসে মিলেমিশে খান বলেই এর নাম হয়েছে ‘মিল্লি’। অর্থাৎ, মিলি > মিলানি> মিল্লি। এই ভাষিক রূপান্তরের মধ্য দিয়েই খাবারটির নামকরণ হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে ধারণা করা হয়। এই ব্যাখ্যা থেকেও স্পষ্ট হয় যে, মিল্লিভাত মূলত একটি সামষ্টিক আয়োজনের খাবার—এটি দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার অংশ নয়, বরং সমাজের মিলনমেলা উপলক্ষেই এর প্রচলন ও প্রয়োজনীয়তা। তবে কবে কখন কোথায় মিল্লি খাওয়ার সুযোগ হবে সে আশায় না থেকে জিহ্বার স্বাদ মেটানোর জন্য পারিবারিক আয়োজনেও মিল্লি রান্নার প্রচলন হয়ে যায়। এমনকি গত বিশত্রিশ বছরে এই খাবার ব্যবসায়িকভাবে জামালপুরের হোটেলগুলোতে বিক্রি শুরু হয়। প্রিন্ট মিডিয়া,সোস্যাল মিডিয়া, ঢাকাসহ দেশ-বিদেশে জামালপুরের নানা কমিউনিটির আয়োজনেও মিল্লি এখন আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ভৌগোলিকভাবে জামালপুর জেলার বাহিরে মিল্লির তেমন প্রচলন ও পরিচিতি নেই। জামালপুর জেলার দক্ষিণাঞ্চলে টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি অঞ্চলে কিছুটা প্রচলন আছে। নদীর দুপাড়ের মানুষে যাতায়াত বসতি ও যোগাযোগ থাকায় যমুনার পশ্চিমপাড়ে বগুড়া, গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের নদীসীমান্তবর্তী অঞ্চলে কিছুটা প্রচলন আছে। জামালপুর শহরের খুব নিকটবর্তী শেরপুরের জেলার কিছু মানুষ মূলত জামালপুরের সমাজসংস্কৃতির সাথেই চলে। ফলে পার্শ্ববর্তী অল্পকিছু এলাকায় মিল্লির প্রচলন আছে। কাজেই ভৌগোলিকভাবে মিল্লি যে একান্তই জামালপুরের তার বাইরে কোনো প্রশ্ন নেই।
ব্যাহার: মিল্লিভাতের সামাজিক প্রেক্ষাপট
মিল্লিভাতের সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত সামাজিক প্রথাটির নাম ব্যাহার। মুসলমানদের মৃত্যুর চল্লিশ দিন পর আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী, এলাকার পরিচিত বা গণ্যমান্য লোকজন এবং ফকির-মিসকিনদের দাওয়াত করে খাওয়ানোর যে সামাজিক প্রথা, জামালপুর অঞ্চলে তা ব্যাহার নামে পরিচিত। শিক্ষার প্রসারের ফলে শহরাঞ্চলে কেউ কেউ এই অনুষ্ঠানকে বেপার বলে থাকেন, তবে গ্রামাঞ্চলে সাধারণত ব্যাহার শব্দটিই প্রচলিত। এছাড়া ব্যাহার-এর পরিবর্তে ফয়তা বলার প্রচলনও লক্ষ করা যায়।
ব্যাহার সাধারণত খোলা ময়দানে আয়োজিত হয়, যেখানে হাজার হাজার মানুষ সারিবদ্ধভাবে বসেন এবং থালার পরিবর্তে কলাপাতায় খাবার পরিবেশন করা হয়। বড় অনুষ্ঠানের জন্য কয়েক দিনব্যাপী প্রস্তুতি চলে—রীতিমতো একটি মহাযজ্ঞের আয়োজন। এজন্য প্রথমে গরু বা মহিষ কেনা হয়, আগের দিন সন্ধ্যায় তা জবাই করা হয় এবং রাত থেকেই রান্নার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। বাড়ির আশপাশে খোলা জায়গায় মাটি খুঁড়ে অস্থায়ী সারি সারি চুলা তৈরি করা হয় এবং সারি সারি ডেকচি (সাধারণত পিতলের বড় পাতিল) বসানো হয়। মধ্যরাত থেকে রান্না শুরু হয়ে ভোররাতের দিকে শেষ হয়, এরপর সকাল সকাল লোকজন জমায়েত হন এবং খাবার পরিবেশন করা হয়। তবে দিনের অন্য সময়েও এই আয়োজন হতে পারে। পরিবেশনের জন্য শত শত লোক আগে থেকেই প্রস্তুত রাখা হয়। এদেরকে খাইজান্দার বলা হয়।
এত বড় আয়োজনের রান্নার জন্য মিল্লি রান্নায় খ্যাতিমান বাবুর্চিকে বিশেষভাবে ডাকা হয়, যাঁর সঙ্গে থাকেন শতাধিক সহকারী বাবুর্চি ও সহায়ক লোকজন। খাবার পরিবেশনের জন্য প্রয়োজনীয় কলাপাতা সংগ্রহের কাজ চলে নিজ গ্রাম ছাড়াও পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে; অনুষ্ঠানের দুই-এক দিন আগে থেকেই এই সংগ্রহ-প্রক্রিয়া শুরু হয়। আত্মীয় বা পরিচিত দায়িত্বপ্রাপ্ত লোকজন আস্ত কলাপাতা কেটে তিন-চারটি অংশে ভাগ করেন, এরপর সেগুলো বান্ডেল করে বেঁধে রাখা হয়। এই পূর্বপ্রস্তুতিই এলাকাজুড়ে একটি উৎসবের আবহ সৃষ্টি করে। অনুষ্ঠানের কয়েক দিন আগে থেকেই এর ব্যাপ্তি অনুযায়ী একাধিক বাড়ির ঢেঁকিতে চালের গুঁড়া করা, মসলা গুঁড়া করা, আদা-রসুন-পেঁয়াজ কাটার কাজ চলতে থাকে—চারদিকে যেন কাজের ধুম পড়ে যায়। আধুনিক যুগে এই গুঁড়ার কাজ যন্ত্রের মাধ্যমে করা হয়, এবং রান্নার ডেকচিও এখন পিতলের পরিবর্তে অ্যালুমিনিয়ামের ব্যবহৃত হয়।
ব্যাহারের এই সামষ্টিক আয়োজনে তৈরি মিল্লির স্বাদ ঘরোয়া রান্নার চেয়ে ঢের বেশি সুস্বাদু হয় বলে স্থানীয়ভাবে মনে করা হয়। সেই স্বাদের আকর্ষণেই পরবর্তীকালে অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও ঘরে ঘরে মিল্লি রান্নার প্রচলন শুরু হয়েছে। ত্রিশ-চল্লিশ বছর আগেও হোটেলে মিল্লি বিক্রি হতো না, কিন্তু বর্তমানে জামালপুরের প্রতিটি উপজেলা, উপশহর ও বড় বাজারের হোটেলে মিল্লিভাত সহজলভ্য। এমনকি গ্রামীণ হালখাতা অনুষ্ঠানেও অনেকে এখন মিল্লিভাতের আয়োজন করে থাকেন। অর্থাৎ, মৃত্যু-পরবর্তী ধর্মীয় সামাজিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু হওয়া এই খাবার ধীরে ধীরে জামালপুরের সামগ্রিক খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

ঘরোয়া রন্ধনপ্রণালী ও উপকরণ
ব্যাহারের বিশাল কর্মযজ্ঞের বাইরে বর্তমানে ঘরোয়া পরিসরেও ছোট আকারে মিল্লি রান্না করা হয়। মিল্লিভাত মূলত মাংস ও আতপ চালের গুঁড়োর সংমিশ্রণে দীর্ঘ সময় ধরে অল্প আঁচে প্রস্তুত করা একটি ভারী ও মসলাদার খাবার।
* মাংস: সাধারণত হাড় ও চর্বিযুক্ত বড় টুকরো করা গরুর মাংস ব্যবহৃত হয়; অনেক সময় খাসি বা মহিষের মাংসও ব্যবহৃত হয়।
* ঘনত্ব তৈরির উপকরণ: আতপ চালের বাটা বা গুঁড়ো, যা পানিতে গুলে মাংসের ঝোলে যোগ করা হয়। বড় আয়োজনে গুড়ো ছিটিয়ে রান্না করা হয়। আর পারিবারিক বা ঘরোয়া আয়োজনেো ছিটিয়ে রান্না করা হয়।
* মসলা: আদা বাটা, রসুন বাটা, জিরা, হলুদ গুঁড়ো, মরিচ গুঁড়ো বা বাটা, ধনিয়া গুঁড়ো, সরিষা বা সয়াবিন তেল, তেজপাতা, এলাচ, দারুচিনি, কাঁচামরিচ, লবণ এবং ঐচ্ছিকভাবে আলু।
* বাগাড়ের উপকরণ: পেঁয়াজ কুচি, রসুন কুচি, গোটা জিরা ও মেথি।
রান্নার প্রক্রিয়াটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথমে ধোয়া মাংসের সঙ্গে বাটা ও গুঁড়ো মসলা, আস্ত গরমমসলা এবং তেল মাখিয়ে কিছুক্ষণ মেরিনেট করে রাখা হয়। এরপর মাংস থেকে বের হওয়া পানিতেই তা কষিয়ে নেওয়া হয় এবং পরে পর্যাপ্ত পানি যোগ করে মাংস সম্পূর্ণ সেদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত রান্না করা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে মিল্লি সুস্বাদু হওয়ার জন্য মেরিনেট করা মাংস কষিয়ে নেওয়ার পর আলাদা পাত্রে গরম পানি এই রান্নায় দিতে হয়। ঠাণ্ডা পানি দিলে স্বাদে তারতম্য হতে পারে। তাছাড়া আমন ধানের চালের গুড়া সুঘ্রাণ যুক্ত হয় বলে আমণের আতপ চালের গুঁড়া মিল্লিকে সুস্বাদু করে। মাংস সেদ্ধ হয়ে এলে পানিতে গোলানো আতপ চালের গুঁড়ো অল্প অল্প করে দিয়ে ক্রমাগত নেড়েও রান্না করা যায়। এভাবে কিছুক্ষণ রান্নার পর ঝোল ঘন ও আঠালো রূপ নেয়। সবশেষে পেঁয়াজ, রসুন, জিরা ও মেথি তেলে ভেজে তৈরি বাগাড় মিল্লির ওপর ঢেলে দেওয়া হয়, যা এই খাবারের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্বাদ ও সুবাসের মূল উৎস। এই বাগাড়কে স্থানীয়ভাবে কোথাও কোথাও তেলানি বলা হয়।

সাম্প্রদায়িক সংযোগ: কেন মিল্লিভাত মুসলমান সংস্কৃতির অংশমিল্লিভাতের মূল আমিষ উপকরণ গরুর মাংস, এবং এই খাবার মুসলমানদের ব্যাহার, আকিকা, খতনা বা বিবাহে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলেও হিন্দু সমাজে এর প্রচলন তুলনামূলক কম। এই পর্যবেক্ষণ থেকেই অনুমান করা যায় যে, মিল্লিভাত মুসলমানদের আগমনের পরই এই অঞ্চলে প্রচলিত হয়েছে। এই অনুমানকে সমর্থন করে গোলাম মুরশিদের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি গ্রন্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ:
“মুসলমানদের মধ্যে অনেকে, বিশেষ করে নগরবাসী মুসলমানরা, কেবল মাংস খেতেন, তাই নয়, গোরুর মাংসও খেতেন।”
গোলাম মুরশিদ আরও দেখিয়েছেন যে মধ্যযুগীয় সাহিত্যে মুসলমানদের মোরগ ও গরু জবাই করে মাংস বিক্রির উল্লেখ পাওয়া যায়, এবং হিন্দু সমাজের সাধারণ মানুষ শামুক, কাঁকড়া, মোরগ, হাঁস, শুয়োর ও নানা পাখির মাংস খেলেও গরুর মাংস তাদের খাদ্যতালিকায় দেখা যায় না। এই পার্থক্য থেকে স্পষ্ট হয় যে, গোমাংসভিত্তিক রন্ধনপ্রণালী মূলত মুসলমান সমাজের একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, যা মিল্লিভাত/পিঠালির উৎপত্তির পেছনের সাম্প্রদায়িক প্রেক্ষাপটকে সমর্থন করে।

সাহিত্যিক প্রমাণ: মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল
কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের কালকেতু উপাখ্যানে নিদয়ার সাধভক্ষণ অংশে বিভিন্ন খাবারের বিস্তারিত ও বৈচিত্র্যময় বর্ণনা পাওয়া যায়—নানা রকম শাক, ডাল, তরকারি, মাছ, এমনকি বিলাসবহুল মিষ্টান্নের উল্লেখও এতে আছে। কিন্তু এই দীর্ঘ ও বিশদ তালিকায় মিল্লি, পিঠালি, মেন্দা বা মিলানি জাতীয় কোনো খাবারের নামমাত্র উল্লেখও নেই। একই কাব্যে আবার মুসলমানদের গোমাংস ও মোরগমাংস ভক্ষণের কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে—গোলাম মুরশিদের গ্রন্থ অনুযায়ী, মুকুন্দরাম বলেছেন যে গরুর মাংস বিক্রি করা কসাইরা নরকেও তাদের জায়গা পাবে না। অর্থাৎ, একই কবির রচনায় মুসলমানদের গোমাংসভক্ষণের উল্লেখ থাকলেও হিন্দু চরিত্রের খাদ্যতালিকায় মিল্লিভাত-জাতীয় কোনো পদের অস্তিত্ব নেই। এই অনুপস্থিতি জোরালোভাবে ইঙ্গিত করে যে, হিন্দু সমাজে মিল্লিভাতের প্রচলন ছিল না, এবং এটি মুসলমান সমাজেরই একটি স্বতন্ত্র সৃষ্টি।

চালের গুঁড়ার ঐতিহ্য: পুরনো উপকরণ, নতুন প্রয়োগ
তবে মিল্লিভাত/পিঠালির প্রধান একটি উপকরণ—আতপ চালের গুঁড়া—নতুন কিছু নয়। গোলাম মুরশিদের গ্রন্থে দেখা যায়, বাঙালিদের মধ্যে চালের গুঁড়া দিয়ে পিঠা তৈরির ঐতিহ্য বহু শতাব্দী প্রাচীন। চৈতন্যচরিতামৃতসহ মধ্যযুগীয় সাহিত্যে বহু ধরনের পিঠা ও মিষ্টান্নের উল্লেখ পাওয়া যায়—যেমন পাটিসাপটা, নালবড়া, মাষকলাই-এর বড়া, পাতপিঠা প্রভৃতি। এ থেকে বোঝা যায় যে, চালের গুঁড়া ব্যবহারের প্রযুক্তি জামালপুর তথা বৃহত্তর বাংলা অঞ্চলে মুসলমান আগমনের বহু আগে থেকেই প্রচলিত ছিল।
সুতরাং যুক্তিসঙ্গতভাবেই বলা যায়, মিল্লিভাত/পিঠালির মূল রন্ধন-প্রযুক্তি (চালের গুঁড়ার ব্যবহার) নতুন কিছু নয়—এই সহজলভ্য ও পরিচিত উপকরণ জামালপুরের মানুষ বহু আগে থেকেই ব্যবহার করে আসছিল। মুসলমান আগমনের পর এতে গরু বা মহিষের মাংস যুক্ত হয়ে একটি নতুন, স্বতন্ত্র ও সাম্প্রদায়িকভাবে চিহ্নিত খাদ্যরূপ হিসেবে মিল্লিভাত/পিঠালির উদ্ভব ঘটে। অর্থাৎ, উপকরণ পুরনো হলেও এর নির্দিষ্ট প্রয়োগ ও সংমিশ্রণ—বিশেষত মাংসসহ রান্নার এই বিশেষ রীতি—তুলনামূলকভাবে নতুন এবং মুসলমান সংস্কৃতির সংযোজন।
খাদ্যাভ্যাসে মুসলমান প্রভাবের ধীর বিস্তার
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষণীয় যে, মুসলমানদের খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব বৃহত্তর বাঙালি সমাজে অত্যন্ত ধীরগতিতে বিস্তৃত হয়েছিল। গোলাম মুরশিদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যে-সমাজে ঘ্রাণকেও অর্ধভোজন বলে গণ্য করা হতো এবং তার ফলে জাতিচ্যুতি ঘটতো, সেই রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ মুসলমানদের খাবার দিয়ে সহজে প্রভাবিত হয়নি। এমনকি অষ্টাদশ শতকের কবি ভারতচন্দ্রের রচনা পর্যন্ত অমুসলমান কবিদের লেখায় মোগলাই খাবারের উল্লেখ পাওয়া যায় না; উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের আগে হিন্দুবাড়িতে মুসলমানী খাবারের চলন হয়নি বলেই ধারণা করা স্বাভাবিক।
এই তথ্য জামালপুরের প্রেক্ষাপটেও প্রযোজ্য বলে মনে করা যায়—অর্থাৎ, ১৫০৩ সালে হযরত শাহ কামালের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই মিল্লিভাত/পিঠালির প্রচলন শুরু হয়নি, বরং মুসলমান জনগোষ্ঠী স্থিতিশীলভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর, কিছুটা পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে এই খাদ্যরীতি গড়ে ওঠে এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের—বিশেষত ব্যাহার তথা মৃত্যু-পরবর্তী চল্লিশা, আকিকা, খতনা ও বিবাহের—সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে একটি স্থায়ী ঐতিহ্যে পরিণত হয়। স্থানীয় লোকজ ব্যাখ্যা অনুযায়ী নামকরণের যে ইতিহাস (মিলি থেকে মিল্লি)—তা-ও ইঙ্গিত করে যে, এই খাবারের মূল পরিচয় সামষ্টিক আয়োজনকেন্দ্রিক, যা মূলত মুসলমান সামাজিক-ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোর সঙ্গেই ঐতিহাসিকভাবে সম্পৃক্ত।
উপসংহার
সামগ্রিকভাবে ঐতিহাসিক তথ্য, রন্ধনপ্রণালীর উপকরণ-বিশ্লেষণ, লোকপ্রচলিত নামকরণের ব্যাখ্যা, ব্যাহার-এর সামাজিক পটভূমি এবং সমসাময়িক সাহিত্যিক সাক্ষ্যের সমন্বয়ে দেখা যায় যে, জামালপুরের মিল্লিভাত বা পিঠালি একটি স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক নির্মাণ, যার শিকড় প্রাচীন বাংলার চালের গুঁড়াভিত্তিক রন্ধনপ্রথায় প্রোথিত হলেও এর বর্তমান রূপ—গোমাংসসহ প্রস্তুত এই বিশেষ ব্যঞ্জন এবং তার সঙ্গে জড়িত সামষ্টিক মিলনের সংস্কৃতি—গড়ে উঠেছে মুসলমান আগমন ও বসতি স্থাপনের পরবর্তী পর্যায়ে। আধুনিকতার ছোঁয়ায় অনেক অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার হারিয়ে গেলেও জামালপুরে মিল্লিভাতের চাহিদা ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব আজও অটুট রয়েছে। এটি জামালপুরের ইতিহাস, ধর্মীয় রূপান্তর ও খাদ্যসংস্কৃতির এক চমৎকার সমন্বয়ের দৃষ্টান্ত, যা এই অঞ্চলের সামাজিক ইতিহাস অনুধাবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তথ্যসূত্র
১. গোপাল হালদার, সংস্কৃতির রূপান্তর, মুক্তধারা, ২২ প্যারীদাস রোড, ঢাকা-১১০০, চতুর্থ সংস্করণ: ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃ. ৭৯।
২. পবিত্র সরকার, ‘বাঙালি কে?’ প্রবন্ধ, বাংলাদেশ এবং বাঙালির ইতিহাস ও সংস্কৃতি, সম্পা. ড. অনুপম হাসান ও ড. বোরহান বুলবুল, স্টুডেন্টস পাবলিকেশন্স, ১৬-১৭ বাংলা বাজার, ঢাকা-১১০০, প্রথম প্রকাশ: ২০১৪, পৃ. ১৮৯।
৩. রজব বকশী, জামালপুর জেলার ইতিহাস, বাংলা একাডেমী বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা।
৪. বাংলা একাডেমী বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি গ্রন্থমালা: জামালপুর, প্রধান সম্পাদক: শামসুজ্জামান খান, সম্পাদক: মো. আলতাফ হোসেন, নির্বাহী সম্পাদক: আমিনুর রহমান সুলতান, প্রকাশক: লোকজ সংস্কৃতির বিকাশ কর্মসূচি, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ: পৌষ ১৪২০/ডিসেম্বর ২০১৩, ISBN: 984-07-5178-6।
৫. গোলাম মুরশিদ, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি, অবসর প্রকাশনা সংস্থা, ৪৬/১ হেমেন্দ্র দাস রোড, সূত্রাপুর, ঢাকা-১১০০, প্রথম প্রকাশ: জানুয়ারি ২০০৬, পুনর্মুদ্রণ: জুন ২০০৮, ISBN: 984-415-190-2।
৬. মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, চণ্ডীমঙ্গল, কালকেতু উপাখ্যান, ‘নিদয়ার সাধভক্ষণ’ অংশ (গোলাম মুরশিদ, হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি গ্রন্থে উদ্ধৃত)।
৭. আবদুল আজিজ, ‘জামালপুরের মিল্লি বা পিঠালি’, প্রথম আলো, ৭ জুলাই ২০১৯।
৮. ‘জামালপুরের ১০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী
রেসিপি ‘মিল্লি ভাত’, ভিডিও প্রতিবেদন, Eshyka’s ifood চ্যানেল, ফেসবুক।
৯. ‘রন্ধনপ্রণালী: মিল্লিভাত’, উইকিবই (মুক্ত জ্ঞানকোষ)।

লেখক:  অধ্যক্ষ সরকারি জাহেদা সফির মহিলা কলেজ জামালপুর

Advertisement