একটি সেতু কখনো শুধু নদীর দুই তীরকে যুক্ত করে না। একটি সেতু যুক্ত করে অর্থনীতিকে, মানুষের জীবনকে, একটি অঞ্চলের সম্ভাবনাকে। বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে যমুনা বহুমুখী সেতু এবং পদ্মা সেতু তারই উজ্জ্বল উদাহরণ। আজ দ্বিতীয় যমুনা সেতুর আলোচনা সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। আর সম্ভাব্য রুটগুলোর মধ্যে মাদারগঞ্জ-সারিয়াকান্দি করিডোর জাতীয় পর্যায়ে সবচেয়ে আলোচিত বিকল্পগুলোর একটি।
এই রুটের পক্ষে দাবিটি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষ, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, কৃষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন এই রুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি জাতীয় সংসদে আলোচিত হয়েছে, আবার রাজপথেও মানববন্ধন ও জনসমাবেশে উচ্চারিত হয়েছে একই প্রত্যাশা। ফলে এটি এখন কেবল একটি স্থানীয় দাবি নয়, বরং উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের যোগাযোগ ও উন্নয়ন নিয়ে একটি বৃহত্তর জাতীয় আলোচনার অংশ।
বর্তমানে উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানী ও দেশের পূর্বাঞ্চলের প্রধান সড়ক যোগাযোগের বড় অংশ একটি যমুনা সেতুর ওপর নির্ভরশীল। ঈদ, পূজা কিংবা অন্যান্য বড় ছুটির সময়ে দীর্ঘ যানজট মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়ে তোলে। আবার কোনো দুর্ঘটনা, রক্ষণাবেক্ষণ বা প্রাকৃতিক কারণে সেতুতে চলাচল ব্যাহত হলে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা সীমিত হয়ে পড়ে। এ বাস্তবতায় দ্বিতীয় একটি কার্যকর যমুনা সেতুর প্রয়োজনীয়তা বহুদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় অর্থনীতির দেশগুলোতে একই করিডোরে বিকল্প অবকাঠামো রাখা হয়, যাতে একটি পথ সাময়িকভাবে অচল হলেও জাতীয় যোগাযোগব্যবস্থা স্বাভাবিক থাকে। বাংলাদেশেও ভবিষ্যতের পরিবহন চাহিদা বিবেচনায় বিকল্প করিডোর গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
মাদারগঞ্জ-সারিয়াকান্দি রুটের সবচেয়ে বড় শক্তি এর ভৌগোলিক অবস্থান। এই করিডোর উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র বগুড়ার সঙ্গে জামালপুর হয়ে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের সংযোগকে আরও সহজ করতে পারে।
এই রুটে সেতু নির্মিত হলে বগুড়া, জামালপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহসহ আশপাশের জেলার মানুষের যাতায়াতে সময় ও পরিবহন ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য, মৎস্যসম্পদ ও ক্ষুদ্র শিল্পের পণ্য দ্রুত দেশের পূর্বাঞ্চলের বাজারে পৌঁছানোর সুযোগ বাড়তে পারে। ফলে কৃষক, ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তারা অর্থনৈতিকভাবে উপকৃত হতে পারেন।
যমুনার এই অংশে একসময় নৌ-যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নদীর গতিপথ পরিবর্তনের আগে এই অঞ্চলের মানুষ নৌপথ ও ফেরির মাধ্যমে দুই তীরের মধ্যে নিয়মিত চলাচল করতেন। সময়ের পরিবর্তনে সেই ব্যবস্থা হারিয়ে গেলেও যোগাযোগের প্রয়োজন শেষ হয়নি। আজও অনেক মানুষ স্থানীয় নৌপথ ব্যবহার করেন। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতাও স্থায়ী সড়ক সংযোগের দাবিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
জাতীয় সংসদে জামালপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল এই রুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, এই সেতু বাস্তবায়িত হলে উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের যোগাযোগ, কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
একইভাবে বগুড়া অঞ্চলের সংসদ সদস্যরাও সংসদে এই রুটের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। তাদের মতে, এটি কেবল একটি নতুন সেতু নয়, বরং উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক প্রবেশদ্বার হতে পারে।
সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও এই দাবি জোরালো হয়েছে। বিভিন্ন মানববন্ধন ও নাগরিক সমাবেশে বক্তারা বলেছেন, দ্বিতীয় যমুনা সেতু উত্তরাঞ্চলের মানুষের জন্য বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। তাদের মতে, বিকল্প যমুনা সেতু বাস্তবায়িত হলে যোগাযোগের ঝুঁকি কমবে, যানজট হ্রাস পাবে এবং উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নে নতুন গতি আসবে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। সরকার এখনো দ্বিতীয় যমুনা সেতুর চূড়ান্ত অবস্থান নির্ধারণ করেনি। বিভিন্ন সম্ভাব্য রুট নিয়ে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, প্রকৌশলগত বিশ্লেষণ, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং ব্যয়-সুবিধা যাচাই চলছে। শেষ পর্যন্ত যে রুট জাতীয়ভাবে সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই হবে, সেটিই নির্বাচিত হওয়ার কথা।
এই কারণে মাদারগঞ্জ-সারিয়াকান্দি রুটের পক্ষে উপস্থাপিত যুক্তিগুলোকেও তথ্য, গবেষণা এবং বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা জরুরি।
উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ কেবল নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সর্বাধিক মানুষের উপকারে আসে। মাদারগঞ্জ-সারিয়াকান্দি রুটে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দাবির পেছনে রয়েছে যোগাযোগ সহজ করা, আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো, কৃষি ও বাণিজ্যের বিকাশ ঘটানো এবং উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের মানুষের জীবনকে আরও গতিশীল করার প্রত্যাশা।
আজ এই দাবি সংসদে আলোচিত হচ্ছে, রাজপথে উচ্চারিত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। এখন দৃষ্টি সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের দিকে। কারণ দ্বিতীয় যমুনা সেতুর রুট নির্ধারণ কেবল একটি প্রকৌশলগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি আগামী কয়েক দশকের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
-আব্দুর রহিম খান, লেখক ও সাংবাদিক
