Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 15:11 pm
অন্যান্য

শহর ঘুমিয়ে গেলে জেগে ওঠে আরেক পৃথিবী: জামালপুর রেলস্টেশনের নীরব জীবনসংগ্রাম

শহর ঘুমিয়ে গেলে জেগে ওঠে আরেক পৃথিবী: জামালপুর রেলস্টেশনের নীরব জীবনসংগ্রাম

সাইদুর রহমান ।।

দিনের ব্যস্ততা শেষে যখন শহর ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ে, তখনই যেন জেগে ওঠে জামালপুর রেলস্টেশনের আরেকটি অজানা পৃথিবী। ট্রেন আসে, ট্রেন যায়। যাত্রীরা আপনজনের কাছে ফিরে যান। কিন্তু প্ল্যাটফর্মে থেকে যান একদল মানুষ, যাদের গন্তব্য বলে কিছু নেই। রেলস্টেশনের কংক্রিটের মেঝেই যেন তাদের রাত কাটানোর একমাত্র আশ্রয়।

Advertisement

শহরে আমার দীর্ঘদিন থাকা হয়নি। তাই এই শহরের রাতের জীবন সম্পর্কে খুব বেশি ধারণাও ছিল না। পড়াশোনার জন্য শহরে এসে একটি স্থানীয় পত্রিকায় রিপোর্টার হিসেবে কাজ করার সুযোগ হয়। সেই পেশাগত দায়িত্বই এক রাতে আমাকে জামালপুর রেলস্টেশনে নিয়ে যায়।

সেদিন রাত প্রায় ১০টা ৪৫ মিনিট। পত্রিকার অফিসের জন্য একটি ল্যাপটপ নেওয়ার উদ্দেশ্যে একজনের অপেক্ষায় ছিলাম। অপেক্ষার সেই কয়েকটি মিনিট আমার দৃষ্টিভঙ্গিই যেন বদলে দেয়। চারদিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত অস্থিরতা আর অসহায়ত্ব অনুভব করছিলাম।

প্ল্যাটফর্মজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ঘুমিয়ে আছেন অসংখ্য মানুষ। কেউ বাবার বয়সী, কেউ মায়ের বয়সী, কেউ দাদা-নানার বয়সের। তাদের মাথার নিচে বালিশ নেই; কারও মাথার নিচে ছেঁড়া বস্তা, কারও মাথার নিচে নিজের জুতা। কেউ গভীর ঘুমে, আবার কেউ জেগে থেকে নীরবে তাকিয়ে আছেন অন্ধকার আকাশের দিকে। মনে হচ্ছিল, এই মানুষগুলোর কি সত্যিই কোনো ঘর নেই? কোনো পরিবার নেই? নাকি কোনো একসময় পরিবার ছিল, কিন্তু জীবনের নির্মম বাস্তবতা, দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন কিংবা অবহেলা তাদের এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে?

রাত যত গভীর হয়, ততই স্পষ্ট হয়ে ওঠে বৈষম্যের চিত্র। শহরের এক প্রান্তে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে মানুষ, আর অন্য প্রান্তে খোলা প্ল্যাটফর্মে শীত, গরম, বৃষ্টি, ক্ষুধা আর অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই করে রাত কাটান অসংখ্য অসহায় মানুষ। একই শহর, অথচ জীবনযাত্রার ব্যবধান যেন আকাশ-পাতাল।

এই মানুষগুলোর দিকে তাকিয়ে বারবার মনে হয়েছে, একজন মানুষ কি জন্ম থেকেই রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে থাকার জন্য পৃথিবীতে আসে? নিশ্চয়ই না। তাদেরও হয়তো একদিন একটি পরিবার ছিল, একটি ঠিকানা ছিল, স্বপ্ন ছিল, আপনজন ছিল। কিন্তু জীবন সব মানুষের সঙ্গে সমান আচরণ করে না। কেউ হারিয়ে ফেলেছেন পরিবার, কেউ কর্মক্ষমতা, কেউ আশ্রয়, আবার কেউ হারিয়েছেন সমাজের কাছে নিজের পরিচয়।

ঠিক সেই মুহূর্তে ইসলামের ইতিহাসে ন্যায়পরায়ণ শাসক হিসেবে পরিচিত হযরত উমর (রা.)-এর শাসনদর্শনের কথা মনে পড়ে। প্রচলিত বর্ণনায় রয়েছে, তিনি শাসকের দায়িত্ব সম্পর্কে এতটাই সচেতন ছিলেন যে, তাঁর রাষ্ট্রে কোনো প্রাণীও যদি অনাহারে কষ্ট পায়, তবে আল্লাহর কাছে তার জবাবদিহির ভয় করতেন। সেই শিক্ষা আজও মানবিক দায়িত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

তখন মনে প্রশ্ন জাগে, এই সমাজে যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যাদের হাতে রাষ্ট্র, সমাজ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব, তাদের কি এই অসহায় মানুষগুলোর প্রতি কোনো দায় নেই? আবার প্রশ্নটি শুধু রাষ্ট্র বা নেতৃত্বের জন্যই নয়; আমাদের প্রত্যেকের জন্যও। কারণ সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কেবল সরকারের নয়, প্রতিটি সচেতন নাগরিকেরও।

প্রতিদিন শত শত মানুষ এই স্টেশন দিয়ে যাতায়াত করেন। কেউ এক ঝলক তাকান, কেউ পাশ কাটিয়ে চলে যান, কেউ আবার না দেখার ভান করেন। অবশ্য অনেক ব্যক্তি, সামাজিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবী দল নিয়মিত খাবার, শীতবস্ত্র ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিয়ে এগিয়ে আসেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সাময়িক সহায়তা জীবন বদলায় না। প্রয়োজন পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা এবং সমাজে সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সুযোগ।

উন্নয়নের নানা সূচকে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে নতুন সড়ক, সেতু, রেললাইন ও আধুনিক অবকাঠামো। কিন্তু সেই উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হবে, যখন কোনো মানুষ ক্ষুধা, দারিদ্র্য কিংবা আশ্রয়হীনতার কারণে রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মকে নিজের ঘর বানাতে বাধ্য হবেন না।

জামালপুর রেলস্টেশনের এই রাত শুধু কিছু মানুষের কষ্টের গল্প নয়; এটি আমাদের সমাজের আয়না। এই আয়নায় ফুটে ওঠে বৈষম্য, অবহেলা, দারিদ্র্য এবং মানবিকতার সংকট। প্ল্যাটফর্মে ঘুমিয়ে থাকা মানুষগুলো কোনো পরিসংখ্যান নয়, তারা আমাদেরই সমাজের মানুষ। তাদের নীরব দীর্ঘশ্বাস আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে আমরা কি সত্যিই এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি, যেখানে একজন মানুষ মাথার নিচে জুতাকে বালিশ বানিয়ে রাত কাটাতে বাধ্য হবে না?

একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু উঁচু ভবন, আলোকসজ্জা কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়; বরং সবচেয়ে অসহায় মানুষটির প্রতি তার আচরণে। জামালপুর রেলস্টেশনের প্রতিটি রাত তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানবিকতার আলো এখনও সবার জীবনে সমানভাবে পৌঁছায়নি। যতদিন না সেই আলো প্রতিটি অসহায় মানুষের জীবনে পৌঁছাবে, ততদিন উন্নয়নের গল্প পূর্ণতা পাবে না।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী (বাংলা বিভাগ)
সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুর

Advertisement