আবু হানিফ ||
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে মানুষ নাকি অতীতের দিকে বেশি তাকায়। বয়স যখন আশির ঘর পেরিয়ে যায়, তখন ভবিষ্যতের চেয়ে স্মৃতিগুলোই বেশি আপন হয়ে ওঠে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। শরীরের শক্তি আজ ক্ষীণ, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা, হাঁটার গতি ধীর। কিন্তু স্মৃতির ভাণ্ডারে এখনও কিছু ঘটনা উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে। সময়ের ঝড়, জীবনের ব্যস্ততা কিংবা বয়সের ভার—কোনো কিছুই সেগুলোকে মুছে দিতে পারেনি। আজ আমি এমনই একটি ঘটনার কথা বলব—একটি আলোর গল্প। যে আলো একদিন আমি অন্যের জীবনে জ্বালিয়েছিলাম, আর বহু বছর পরে সেই আলোই ফিরে এসে আমার জীবনের অন্ধকার দূর করেছিল।
সেদিন ছিল গ্রীষ্মের এক নির্মম দুপুর। সূর্য যেন আগুনের গোলা হয়ে আকাশে ঝুলছিল। শহরের পিচঢালা রাস্তাগুলো তপ্ত কড়াইয়ের মতো গরম হয়ে উঠেছিল। মানুষজন ছায়া খুঁজে হাঁটছিল, আর বাতাসও যেন উত্তপ্ত নিশ্বাস ফেলছিল চারদিকে। অফিস থেকে বেতন নিয়ে বাসায় ফিরছিলাম। মাথার ওপর রোদ, হাতে টাকার ব্যাগ, মনে সংসারের নানা হিসাব। রাস্তার পাশে একটি ডাস্টবিনের সামনে হঠাৎ চোখ পড়ল। সেখানে একটি কুকুর বসে আছে। ক্ষুধায় তার শরীর শুকিয়ে গেছে। তার চোখে ছিল অপেক্ষা—হয়তো কেউ কিছু ফেলবে, আর সে একটু খাবার পাবে। ডাস্টবিন থেকে বের হওয়া দুর্গন্ধে চারপাশ ভারী হয়ে ছিল। আমি দ্রুত হাঁটছিলাম। এমন সময় অনুভব করলাম, কেউ আমার জামার প্রান্ত আলতো করে টানছে। পেছনে ফিরে দেখি, একটি কিশোর। বয়স বড়জোর পনেরো কিংবা ষোলো। মুখে অপুষ্টির ছাপ, শরীরে মলিন পোশাক, পায়ে ছেঁড়া স্যান্ডেল। কিন্তু তার চোখ দুটো অন্যরকম। সেখানে ভিক্ষার চাতুর্য ছিল না; ছিল অভাবের দীর্ঘ ছায়া আর বেঁচে থাকার আকুতি। আমি বললাম,
— কী চাও?
সে কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল,
— স্যার, কিছু টাকা দেবেন? খুব ক্ষুধা পেয়েছে।
তার কণ্ঠে করুণা চাওয়ার সুর ছিল না; বরং ছিল এক ধরনের লজ্জা। আমি জিজ্ঞেস করলাম,
— কাজ করো না কেন?
সে নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,
— কাজ খুঁজেছি, স্যার। কিন্তু কেউ কাজ দেয় না। সবাই বলে, আমি ছোট মানুষ।
তার উত্তর আমাকে থামিয়ে দিল। অনেক সময় মানুষের মুখ তার পরিচয়ের চেয়ে বেশি কিছু বলে দেয়। আমি বুঝতে পারছিলাম, ছেলেটি মিথ্যা বলছে না।
— তোমার নাম কী?
— সুজন।
— কোথায় থাকো?
— সামনের গলির ভেতরে।
কী মনে হলো জানি না, আমি বললাম, আমাকে তোমার বাড়ি নিয়ে চলো। সে বিস্ময়ে আমার দিকে তাকাল, যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। কিন্তু আমি সত্যিই যেতে চেয়েছিলাম। আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। শহরের ব্যস্ত রাস্তা ছেড়ে যত ভেতরে ঢুকছিলাম, তত যেন অন্য এক পৃথিবীতে প্রবেশ করছিলাম। ভাঙা ঘর, সরু পথ, কাদামাটি আর বঞ্চনার নীরব চিহ্ন চারদিকে। একসময় একটি টিনের ঘরের সামনে এসে সে থামল।
— স্যার, এটাই আমাদের বাড়ি।
ঘরে ঢুকতেই আমার বুকটা কেঁপে উঠল। টিনের চালে অসংখ্য ছিদ্র। কোথাও মরিচা, কোথাও বৃষ্টির পানির শুকনো দাগ। মেঝেতে পুরোনো চাটাই। এক কোণে কয়েকটি ভাঙা বাসন। খাটে শুয়ে ছিলেন একজন মধ্যবয়সী মানুষ। তার মুখে অসুস্থতার ছাপ। পাশে বসে ছিলেন এক রুগ্ণ মহিলা। আমি ধীরে ধীরে বসে পড়লাম। তারপর শুনলাম তাদের জীবনের গল্প।
একসময় এই পরিবারও সুখী ছিল। সুজনের বাবা সরকারি চাকরি করতেন। সংসারে স্বচ্ছলতা ছিল। ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন ছিল। কিন্তু হঠাৎ একদিন সুজনের মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তার বললেন, কিডনির জটিল সমস্যা। চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন অনেক টাকা। এর মধ্যেই চাকরি থেকে অবসর নিলেন সুজনের বাবা। অবসরের সব টাকা নিয়ে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। সেই টাকা দিয়েই স্ত্রীর চিকিৎসা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পথিমধ্যে পকেটমারেরা সব টাকা নিয়ে পালিয়ে যায়। এক মুহূর্তে ভেঙে যায় তাদের সমস্ত স্বপ্ন। স্ত্রীর চিকিৎসা আর হলো না। কিছুদিন পর মানসিক আঘাতে প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হলেন সুজনের বাবা। যে মানুষ একসময় সংসারের ছায়া ছিলেন, তিনিই হয়ে গেলেন অসহায়। আর তখনই ছোট্ট সুজনের কাঁধে এসে পড়ল সংসারের দায়িত্ব।
আমি নীরবে শুনছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল, দারিদ্র্য শুধু অর্থের অভাব নয়; কখনও কখনও এটি মানুষের স্বপ্নগুলোও কেড়ে নেয়। আমি সুজনকে জিজ্ঞেস করলাম,
— তুমি কি আবার স্কুলে যেতে চাও?
সে এক মুহূর্ত দেরি না করে বলল,
— চাই, স্যার। খুব চাই।
তার চোখের দিকে তাকিয়ে আমি যেন বহুদিন পর আশার আলো দেখলাম। আমি পকেট থেকে কিছু টাকা বের করলাম। তার হাতে দিয়ে বললাম,
— এই টাকা দিয়ে শুধু খাবার কিনবে না।
— তাহলে?
— কিছু টাকা দিয়ে খাবার কিনবে। বাকি টাকা দিয়ে ফুল কিনবে।
সে বিস্ময়ে বলল,
— ফুল?
— হ্যাঁ। পার্কের গেটে বসে ফুল বিক্রি করবে। চেষ্টা করো। পরিশ্রম মানুষকে কখনও ঠকায় না।
সেদিন চলে আসার সময় ছেলেটির চোখে আমি এক নতুন আলো দেখেছিলাম। সেই আলো ছিল আশার। তারপর কেটে গেল কয়েকটি বছর। জীবনের ব্যস্ততায় আমি সুজনকে ভুলেই গিয়েছিলাম। একদিন অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ একজন তরুণ এসে সালাম দিল।
— আসসালামু আলাইকুম, স্যার।
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। চেনা লাগছিল, কিন্তু মনে করতে পারছিলাম না। সে হেসে বলল,
— আমি সুজন।
আমি যেন মুহূর্তে অতীতে ফিরে গেলাম। কিন্তু এই সুজন আর আগের সেই ছেলেটি নয়।তার চোখে আত্মবিশ্বাস, মুখে হাসি, পোশাকে পরিপাট্য। সে বলল,
— স্যার, আপনার দেওয়া পরামর্শ আমার জীবন বদলে দিয়েছে। ফুল বিক্রি দিয়ে শুরু করেছিলাম। এখন আমার নিজের দোকান আছে। কয়েকজন কর্মচারীও কাজ করে।
তার কথা শুনে আমার হৃদয় ভরে উঠল। কখনও কখনও একটি পরামর্শ, একটি বিশ্বাস, একটি সুযোগ—একজন মানুষের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।
কয়েক মাস পরে শীতের এক সন্ধ্যায় ব্যাংক থেকে টাকা তুলে ফিরছিলাম। চারদিকে কুয়াশা। রাস্তা প্রায় ফাঁকা। হঠাৎ কয়েকজন যুবক আমার পথ আটকে দাঁড়াল। একজন ছুরি বের করল। আরেকজন বলল,
— যা আছে বের করে দিন।
আমি বুঝতে পারলাম, বড় বিপদে পড়েছি। তারা আমাকে ঘিরে ফেলল। আমি প্রাণপণে চিৎকার করে উঠলাম,
— বাঁচাও! বাঁচাও!
ঠিক তখনই দূর থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো।
— স্যার!
তারপর কয়েকজন যুবক দৌড়ে এলো। সামনে সুজন। তার সঙ্গে কয়েকজন বন্ধু। তাদের দেখে ছিনতাইকারীরা পালিয়ে গেল। সুজন আমাকে ধরে বসাল। পানি খাওয়াল। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল,
— স্যার, আপনি ঠিক আছেন?
আমি তার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার চোখ ঝাপসা হয়ে উঠেছিল। সেদিন মনে হয়েছিল, জীবন যেন এক আশ্চর্য আয়না। একদিন আমি তার অন্ধকারে একটি প্রদীপ জ্বালিয়েছিলাম। আজ সেই প্রদীপের আলোই আমার জীবন রক্ষা করল। বাড়ি ফেরার পথে আমি আকাশের দিকে তাকালাম। কুয়াশার আড়ালেও দূরে একটি তারা জ্বলছিল। মনে হলো, পৃথিবীতে কোনো সৎ কাজ হারিয়ে যায় না। ভালোবাসা কখনও নিঃশেষ হয় না। মানবতা কখনও বৃথা যায় না। আমরা যে আলো অন্যের জীবনে জ্বালাই, সময়ের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে সেই আলো একদিন আমাদের কাছেই ফিরে আসে। আর সেদিন আমি উপলব্ধি করেছিলাম— মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়, মানবতা। কারণ অর্থ ক্ষণিকের জন্য বাঁচায়, কিন্তু মানবতা প্রজন্মের পর প্রজন্ম আলো ছড়িয়ে যায়। সেই কারণেই আজও আমি বিশ্বাস করি—অন্ধকারকে অভিশাপ দেওয়ার চেয়ে একটি প্রদীপ জ্বালানো অনেক বেশি মূল্যবান। আর সেই প্রদীপের আলো কখনও হারিয়ে যায় না; একদিন না একদিন তা ফিরে আসে—ফিরে পাওয়া আলোর মতো।
লেখক: প্রধান শিক্ষক, কিডস পার্ক মন্টেসরি স্কুল, জামালপুর।
