Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 16:55 pm
অন্যান্য

জীবনের শুরুর প্রথম বছরগুলো- ভবিষ্যত গড়ার নীরব অধ্যায়

জীবনের শুরুর প্রথম বছরগুলো- ভবিষ্যত গড়ার নীরব অধ্যায়
সামিয়া তাবাসসুম ।
আমরা যখন একটা বাচ্চাকে প্রথম হাঁটতে দেখি, স্বাভাবিকভাবেই আনন্দে ভরে উঠি। কেউ ভিডিও করে, কেউ হাততালি দেয়, কেউ আবার গর্ব করে বলে—“দেখো, আমার বাচ্চা হাঁটতে শিখে গেছে!” কিন্তু একই সময়ে তার মস্তিষ্কের ভেতরে যে অসংখ্য সংযোগ তৈরি হচ্ছে, যে শেখার প্রক্রিয়া নীরবে চলতে থাকে—সেটা আমরা খুব কমই দেখি, কিংবা দেখার চেষ্টা করি।
শিশুর জীবনের প্রথম পাঁচ-ছয় বছর—এই সময়টাকেই আমি সবসময় বলি “foundation phase”। এই সময়ে যা তৈরি হয়, তা-ই ভবিষ্যতে তার আচরণ, ভাষা, শেখার ক্ষমতা—সবকিছুর ভিত গড়ে দেয়। অথচ আমাদের অভ্যাস হলো, আমরা ফল দেখতে চাই; প্রক্রিয়াটাকে গুরুত্ব দিতে চাই না।
ধরুন, একটা তিন বছরের বাচ্চা দোকানে গিয়ে চিৎকার করে কিছু চাইছে। আমরা অনেক সময় এটাকে “বদ অভ্যাস” বলে দোষ দিই। কিন্তু একটু ভেবে দেখলে বোঝা যায়—সে তো এখনো শেখেনি কীভাবে ভদ্রভাবে চাওয়া যায়। অন্যদিকে, আরেকটা বাচ্চা যদি বলে, “আম্মু, আমি কি এটা নিতে পারি?”—এটা কিন্তু একদিনে শেখা হয়নি। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস, পরিবারের ভাষা, বড়দের আচরণ—এসব মিলেই সে এটা শিখেছে।
আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, শিশুকে আলাদা করে “ভদ্রতা শেখানো” লাগে না; বরং তাকে এমন পরিবেশে রাখতে হয়, যেখানে ভদ্রতা প্রতিদিন চর্চা হয়। নিয়মিত সালাম দেওয়া, লাইনে দাঁড়ানো, খেলনা ভাগাভাগি করা—এসব বিষয় আমরা যত স্বাভাবিকভাবে চর্চা করব, শিশু তত স্বাভাবিকভাবেই তা গ্রহণ করবে।
ভাষার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অনেক অভিভাবকই বলেন, “আমার বাচ্চা খুব কম কথা বলে।” কিন্তু প্রশ্ন হলো—সে কি যথেষ্ট কথা শোনার সুযোগ পাচ্ছে? তার সাথে কি কথা বলা হচ্ছে? নাকি বেশিরভাগ সময় সে স্ক্রিনের সামনে একা বসে থাকে?
শিশু ভাষা শেখে মানুষের কাছ থেকে, পর্দা থেকে নয়। যখন তাকে গল্প শোনানো হয়, প্রশ্ন করা হয়, তার উত্তর শোনা হয়—তখন সে শুধু শব্দ শেখে না, সে ভাবতে শেখে। একটা সহজ প্রশ্ন—“তোমার কী মনে হয় এরপর কী হবে?”—এই প্রশ্নটাই তার চিন্তার দরজা খুলে দিতে পারে।
শারীরিক বিকাশ নিয়েও আমাদের ধারণা অনেক সময় সীমিত। আমরা ভাবি, বাচ্চা দৌড়াচ্ছে, খেলছে—মানে সে শুধু “এনার্জি খরচ” করছে। কিন্তু বাস্তবে সে তার শরীর ও মস্তিষ্কের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করছে। যখন সে লাফায়, ভারসাম্য রাখে, বা কোনো নির্দেশ মেনে খেলা খেলে—তখন সে অজান্তেই মনোযোগ, নিয়ন্ত্রণ এবং শৃঙ্খলা শিখছে।
একইভাবে, পুঁতি গাঁথা বা ব্লক দিয়ে কিছু বানানো—এসবকে আমরা অনেক সময় “খেলা” ভেবে অবহেলা করি। কিন্তু এগুলোই তার হাতের সূক্ষ্ম কাজের দক্ষতা তৈরি করে, যা পরে লেখার সময় কাজে লাগে। যে শিশুর আঙুলের নিয়ন্ত্রণ ভালো, তার জন্য পেন্সিল ধরা বা লেখা শেখা অনেক সহজ হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—শিশুরা খেলতে খেলতেই সবচেয়ে ভালো শেখে। এটা আমরা তত্ত্ব হিসেবে জানি, কিন্তু বাস্তবে প্রয়োগ করি কম। আমরা চাই, সে দ্রুত পড়তে শিখুক, লিখতে শিখুক। কিন্তু যদি শেখার প্রক্রিয়াটা আনন্দহীন হয়, তাহলে সেই শেখা টেকসই হয় না।
একটা শিশু যখন লুকোচুরি খেলতে খেলতে গুনছে, দোকান-দোকান খেলায় হিসাব করছে, বা ডাক্তার-ডাক্তার খেলায় অন্যের অনুভূতি বুঝতে শিখছে—তখন সে একসাথে অনেক কিছু শিখছে। এই শেখাটা চাপ ছাড়া, ভয় ছাড়া, স্বাভাবিকভাবে হয়—এটাই এর সবচেয়ে বড় শক্তি।
সব মিলিয়ে, আমরা যদি শৈশবকে সত্যিকার অর্থে বুঝতে চাই, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। আদব-কায়দা, ভাষা, শরীরচর্চা—এসব আলাদা আলাদা বিষয় নয়; এগুলো একই প্রক্রিয়ার অংশ। একটি শিশুর প্রতিদিনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতাই তার বড় হয়ে ওঠার গল্প লিখে।
তাই প্রশ্নটা খুব সরল—আমরা কি সেই অভিজ্ঞতাগুলো তাকে দিচ্ছি?
কারণ শৈশবে যে ভিত তৈরি হয়, সেটার ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে পুরো জীবন।
লেখক: ইসিডি শিক্ষক, কিডস পার্ক মন্টেসরি স্কুল, জামালপুর
Advertisement