নয়ন আসাদ ।।
দ্বিতীয় যমুনা সেতু কেবল আরেকটি সেতু নির্মাণের প্রকল্প নয়; এটি আগামী একশ বছরের জাতীয় যোগাযোগ, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং উত্তরাঞ্চলের উন্নয়নের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। তাই সেতুটি কোথায় নির্মিত হবে, সেই সিদ্ধান্ত শুধু প্রকৌশলগত নয়, এটি একটি কৌশলগত জাতীয় সিদ্ধান্তও।
বর্তমানে দ্বিতীয় যমুনা সেতুর সম্ভাব্য অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ সারিয়াকান্দি-মাদারগঞ্জ রুটকে সমর্থন করছেন, আবার কেউ বাহাদুরাবাদ-বালাসী কিংবা বাহাদুরাবাদ ফুলছড়ি ঘাটের পথকে অধিক উপযোগী মনে করছেন। এই বিতর্কের মধ্যে আবেগ নয়, বরং ইতিহাস, বাস্তবতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার আলোকে বিষয়টি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
ইতিহাস যে পথের কার্যকারিতা প্রমাণ করেছে
প্রথম যমুনা বহুমুখী সেতু নির্মাণের বহু আগে উত্তরবঙ্গে যাতায়াতের প্রধান প্রবেশদ্বার ছিল বাহাদুরাবাদ–বালাসী রুট, কিছু সময় বাহাদুরাবাদ-তিস্তামুখ এবং কিছুসময় বাহাদুরাবাদ ফুলছড়ি ঘাটের রুট। উত্তাল যমুনার দুই তীরকে সংযুক্ত করেছিল এই ঐতিহাসিক ফেরিঘাট এবং রেলফেরি ব্যবস্থা।
একসময় রেল, স্টিমার, ফেরি, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতি ও যোগাযোগের প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিল এই পথ। বহু দশক ধরে এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থা হিসেবে সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।
অর্থাৎ, বাহাদুরাবাদ রুট কোনো নতুন ধারণা নয়। এটি এমন একটি রুট, যার কার্যকারিতা ইতিহাস বহুবার প্রমাণ করেছে। মানুষের প্রয়োজন, অর্থনীতি এবং ভৌগোলিক বাস্তবতা মিলিয়েই একসময় এই পথ গড়ে উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতা আজও প্রাসঙ্গিক।
এই ঐতিহাসিক পথেই যদি দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হয়, তবে তা শুধু অতীতের একটি যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করবে না; বরং দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে থাকা একটি বিশাল জনপদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নতুন গতি আনতে পারে।
উন্নয়নের ভারসাম্যই হওয়া উচিত মূল বিবেচনা
প্রশ্ন হলো, দ্বিতীয় যমুনা সেতুর উদ্দেশ্য কী? শুধু বিদ্যমান যোগাযোগ ব্যবস্থার আরেকটি বিকল্প তৈরি করা, নাকি দেশের উন্নয়নের ভৌগোলিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা?
বর্তমান যমুনা সেতু সিরাজগঞ্জ–টাঙ্গাইল অঞ্চলে অবস্থিত। যদি দ্বিতীয় সেতুও একই অঞ্চলের কাছাকাছি নির্মিত হয়, তাহলে উত্তরাঞ্চলের বড় একটি জনগোষ্ঠীকে আগের মতোই দক্ষিণে নেমে এসে নদী পার হতে হবে। ফলে নতুন কোনো বৃহৎ অঞ্চল সরাসরি উন্নয়নের সুযোগ পাবে না।
অন্যদিকে বাহাদুরাবাদ বালাসী রুটে সেতু নির্মিত হলে উত্তরাঞ্চলের জন্য একটি নতুন ও কার্যকর প্রবেশদ্বার তৈরি হতে পারে। রংপুর বিভাগসহ বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের যাতায়াতের দূরত্ব, সময় এবং পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ বৃহৎ অবকাঠামো গত কয়েক দশকে মধ্যাঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু টেকসই উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হলো আঞ্চলিক ভারসাম্য। উন্নয়নের সুফল তখনই সর্বজনীন হয়, যখন দেশের প্রতিটি অঞ্চল সমান সুযোগ পায়।
অর্থনীতি ও জাতীয় স্বার্থে নতুন সম্ভাবনা
বাহাদুরাবাদ-বালাসী সেতু নির্মিত হলে শুধু জামালপুর, গাইবান্ধা বা ময়মনসিংহ নয়, পুরো উত্তরাঞ্চলের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুন গতি পেতে পারে। শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, পর্যটন এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
একই সঙ্গে বাংলাবান্ধা, বুড়িমারী, চিলাহাটি এবং উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য স্থলবন্দরের সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ আরও কার্যকর হতে পারে। এর ফলে পণ্য পরিবহন দ্রুত হবে, পরিবহন ব্যয় কমবে, বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে এবং সামগ্রিকভাবে জাতীয় অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এ ছাড়া উত্তরাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী এলাকার সঙ্গে বিকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে ওঠায় জাতীয় নিরাপত্তা ও দুর্যোগকালীন যোগাযোগ সক্ষমতাও শক্তিশালী হতে পারে।
এ কথা বলা হচ্ছে না যে অন্য কোনো সম্ভাব্য স্থান অনুপযুক্ত। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রকৌশলগত সমীক্ষা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ, পরিবেশগত মূল্যায়ন এবং জাতীয় পরিকল্পনার ভিত্তিতেই হওয়া উচিত। কিন্তু ইতিহাস, ভৌগোলিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের দৃষ্টিকোণ থেকে বাহাদুরাবাদ-বালাসী রুট ঐতিহাসিকভাবে সফল ছিল এবং সেটাকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে।
যে পথ একসময় উত্তরবঙ্গের প্রাণস্পন্দন ছিল, সেই পথেই যদি দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হয়, তবে তা শুধু একটি নদীর দুই তীরকে যুক্ত করবে না; বরং অতীতের সফল যোগাযোগ ব্যবস্থাকে নতুন প্রজন্মের উন্নয়নের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেশের উত্তরাঞ্চলের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বারও উন্মুক্ত করতে পারে।

