আতিকুর রহমান।।
বাংলাদেশ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে তরুণ জনগোষ্ঠীর বিশাল সম্ভাবনা, অন্যদিকে শিক্ষিত বেকারের দীর্ঘ মিছিল। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে লাখ লাখ শিক্ষার্থী ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের একটি বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত কর্মসংস্থান পাচ্ছে না। অন্যদিকে শিল্প, কৃষি, নির্মাণ, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন ও উৎপাদন খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি দিন দিন প্রকট হচ্ছে। এই বৈপরীত্যের অন্যতম কারণ হলো আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কর্মমুখী দক্ষতা উন্নয়নের ঘাটতি।
দীর্ঘদিন ধরে আমাদের সমাজে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, ভালো চাকরি মানেই ডাক্তার, প্রকৌশলী, শিক্ষক বা সরকারি কর্মকর্তা হওয়া। অথচ আধুনিক বিশ্বে অর্থনীতির চালিকাশক্তি শুধু সাদা-কলারের চাকরি নয়; বরং দক্ষ কারিগর, প্রযুক্তিবিদ, সফটওয়্যার ডেভেলপার, কৃষি উদ্যোক্তা, ইলেকট্রিশিয়ান, মেশিন অপারেটর, স্বাস্থ্য প্রযুক্তিবিদ, গ্রাফিক ডিজাইনার, রোবোটিক্স বিশেষজ্ঞ, সোলার টেকনিশিয়ান এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারাই একটি দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়ান।
এখানেই কর্মমুখী শিক্ষার গুরুত্ব। কর্মমুখী শিক্ষা বলতে এমন শিক্ষা বোঝায়, যা শিক্ষার্থীকে কেবল পরীক্ষায় পাস করায় না; বরং বাস্তব জীবনে কর্মদক্ষ, আত্মনির্ভরশীল ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলে। এটি বৃত্তিমূলক শিক্ষার চেয়েও বিস্তৃত। বৃত্তিমূলক শিক্ষা নির্দিষ্ট একটি পেশাভিত্তিক দক্ষতা শেখায়, কিন্তু কর্মমুখী শিক্ষা প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা মনোভাব, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ, সমস্যা সমাধান, ডিজিটাল সক্ষমতা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে একজন শিক্ষার্থীকে কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত করে।
বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালেই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
জার্মানি বহু বছর ধরে “ডুয়াল এডুকেশন সিস্টেম” অনুসরণ করছে। শিক্ষার্থীরা সপ্তাহের একাংশ শ্রেণিকক্ষে এবং বাকি সময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ করে শেখে। ফলে শিক্ষা শেষ হওয়ার আগেই তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। এ কারণেই ইউরোপে জার্মানির যুব বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে কম এবং উৎপাদনশীল শিল্পখাত অত্যন্ত শক্তিশালী।
সুইজারল্যান্ড বিশ্বের অন্যতম সফল দক্ষতা উন্নয়ন মডেল গড়ে তুলেছে। মাধ্যমিকের পর অধিকাংশ শিক্ষার্থী দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে অংশ নেয়। ব্যাংকিং, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও উন্নত প্রযুক্তি খাতে তাদের দক্ষ জনশক্তি আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত।
সিঙ্গাপুর স্বাধীনতার সময় প্রাকৃতিক সম্পদে দরিদ্র ছিল। কিন্তু তারা উপলব্ধি করেছিল—সবচেয়ে বড় সম্পদ মানুষ। তাই Institute of Technical Education (ITE) এবং Polytechnic ব্যবস্থার মাধ্যমে শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা হয়। আজ সিঙ্গাপুর বিশ্বের অন্যতম ধনী, প্রযুক্তিনির্ভর ও উদ্ভাবনী রাষ্ট্র।
দক্ষিণ কোরিয়া ষাটের দশকে ছিল দারিদ্র্যপীড়িত একটি দেশ। কিন্তু দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং শিল্প-শিক্ষা সমন্বয়ের মাধ্যমে আজ তারা বিশ্বের অন্যতম শিল্পোন্নত রাষ্ট্র। স্যামসাং, এলজি, হুন্দাই কিংবা কিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু কোম্পানি নয়; এগুলোর পেছনে রয়েছে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির দীর্ঘ পরিকল্পনা।
চীন গত তিন দশকে কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষায় ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীকে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করে আধুনিক প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ফলাফল আজ দৃশ্যমান—চীন বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদনশীল অর্থনীতিগুলোর একটি।
জাপান স্কুল পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখানো, সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা এবং উৎপাদনশীল মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেয়। ফলে তাদের শিক্ষা শুধু সনদ প্রদান করে না, বরং কর্মসংস্কৃতি তৈরি করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতাও এখন একই ধরনের পরিবর্তনের দাবি জানায়। দেশে প্রতিবছর অসংখ্য তরুণ কর্মবাজারে প্রবেশ করলেও শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতার অভাবে অনেকেই বেকার থেকে যান। আবার বিভিন্ন খাতে বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগ দিতে হয়। এটি শুধু কর্মসংস্থানের নয়, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়েরও একটি বড় কারণ।
বর্তমানে সরকার বিভিন্ন টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ, পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প এবং তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করেছে। তবে এসব উদ্যোগকে আরও যুগোপযোগী, শিল্প-সংযুক্ত এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে সমাজে কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে, তা পরিবর্তন করতে হবে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রোবটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট কৃষি, থ্রিডি প্রিন্টিং ও অটোমেশনের মতো খাতে দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। আগামী দিনের কর্মসংস্থান এসব ক্ষেত্রেই বেশি সৃষ্টি হবে। তাই এখনই শিক্ষা ব্যবস্থাকে ভবিষ্যতের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।
এ জন্য কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে বিবেচনা করা জরুরি—১.মাধ্যমিক স্তর থেকেই কর্মমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা।২. প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উদ্যোক্তা শিক্ষা চালু করা।৩.শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপের ব্যবস্থা করা।৪.তথ্যপ্রযুক্তি, ইংরেজি ও সফট স্কিলকে সব শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক করা।৫.আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন দক্ষতা সনদ প্রদানের ব্যবস্থা করা।৬.কর্মমুখী শিক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ ঋণ ও স্টার্টআপ সহায়তা নিশ্চিত করা। জাতীয় উন্নয়নের ইতিহাস বলে, কোনো দেশ কেবল ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়িয়ে উন্নত হয়নি; উন্নত হয়েছে দক্ষ মানুষের সংখ্যা বাড়িয়ে। জার্মানি, জাপান, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড ও চীনের সাফল্য তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তরুণ জনগোষ্ঠীকে জনশক্তিতে রূপান্তর করা। এই রূপান্তরের মূল চাবিকাঠি কর্মমুখী শিক্ষা। সময়ের দাবি হলো—সনদকেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে দক্ষতাকেন্দ্রিক শিক্ষায় রূপান্তর ঘটানো। কারণ যে জাতি দক্ষ, সেই জাতিই সমৃদ্ধ; আর যে শিক্ষা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, সেই শিক্ষাই একটি দেশের অর্থনীতি, শিল্প, প্রযুক্তি ও সামাজিক অগ্রগতির ভিত্তি গড়ে তোলে। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি উন্নত, আত্মনির্ভরশীল ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে চায়, তবে কর্মমুখী শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়ন কৌশলের কেন্দ্রে স্থান দিতেই হবে। আজকের এই বিনিয়োগই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর হয়ে থাকবে।
লেখক : মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক কর্মী

