হৃদয় আহম্মেদ শাওন, স্টাফ রিপোর্টার
একসময় জামালপুর শহরের প্রাণ ও পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম ছিল বংশ খাল। কালের বিবর্তনে সেই ঐতিহ্যবাহী খাল এখন পরিণত হয়েছে রোগ-জীবাণুর আঁতুড়ঘরে। খালজুড়ে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা, কালো পচা পানি, অসহনীয় দুর্গন্ধ ও মশা-মাছির উপদ্রবে অতিষ্ঠ নগরবাসী। স্থানীয়দের আশঙ্কা, খালটি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াসহ বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ার বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে।
খালে জমে রয়েছে প্লাস্টিক, পলিথিন, গৃহস্থালি বর্জ্য, হোটেল-রেস্তোরাঁর উচ্ছিষ্টসহ নানা ধরনের আবর্জনা। দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। স্থির পানি কালো রঙ ধারণ করেছে এবং তার ওপর ভাসছে ময়লার স্তূপ। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে তীব্র দুর্গন্ধ।
শহরের জলাবদ্ধতা নিরসন ও পয়োনিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল বংশ খাল। কিন্তু বর্তমানে খালটি ময়লা-আবর্জনার কারণে মশার প্রজননকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। পৌরবাসী খালের ময়লার স্তূপ অপসারণ করে স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার দাবি জানালেও দীর্ঘদিন ধরে কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
ময়লার দুর্গন্ধে শহরের পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই এখন শহরে দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা।
জামালপুর শহরের মালগুদাম, মৃধাপাড়া, দয়াময়ী মোড়, রানীগঞ্জ বাজার, তমালতলা ও কালীঘাট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, খালের পানির প্রবাহ প্রায় বন্ধ। প্লাস্টিক, পলিথিন, গৃহস্থালি বর্জ্য, হোটেল-রেস্তোরাঁর উচ্ছিষ্ট, এমনকি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বর্জ্যও খালে ফেলা হচ্ছে। ফলে পানির রং কালচে হয়ে গেছে এবং বিভিন্ন স্থানে জমে আছে পচা ময়লার স্তূপ।
খালের পাশ দিয়ে হাঁটলেই নাকে আসে তীব্র দুর্গন্ধ। কোথাও কোথাও পানির অস্তিত্বই বোঝা যায় না। লতাপাতা ও আগাছায় ঢেকে গেছে খাল। ময়লার ওপর ভাসছে মাছি, আর স্থির পানিতে জন্ম নিচ্ছে মশার লার্ভা।
জলাবদ্ধতা ও জনদুর্ভোগের নতুন উৎস
একসময় শহরের পয়োনিষ্কাশন ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম ছিল বংশ খাল। কিন্তু এখন খালটি ভরাট ও দূষিত হয়ে পড়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই শহরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দিচ্ছে। বছরের পর বছর পরিষ্কার না করায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
খালপাড়ের বাসিন্দারা জানান, খালের গভীরতা একসময় সাত থেকে আট ফুট ছিল। নিয়মিত পরিষ্কার না হওয়ায় এখন তা অনেকটাই ভরাট হয়ে গেছে। ফলে পানি প্রবাহিত না হয়ে উল্টো আশপাশের বাসাবাড়িতে ঢুকে পড়ে।
রানীগঞ্জ বাজার এলাকার বাসিন্দা শুভ মন্ডল বলেন, “একসময় খালটি ছিল পরিষ্কার ও সুন্দর। এখন দখল আর ময়লা-আবর্জনায় এটি ড্রেনে পরিণত হয়েছে। সারাদিন দুর্গন্ধে থাকা যায় না। মশা-মাছির কারণে ঘরে থাকাও কষ্টকর।”
নদী থেকে খাল, খাল থেকে ড্রেন
স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, বর্তমান বংশ খাল একসময় ছিল বংশাই নদীর অংশ। প্রায় দুইশ বছর আগে পুরোনো ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী হিসেবে বংশাই নদী জামালপুর থেকে টাঙ্গাইল, গাজীপুর হয়ে তুরাগ নদে মিলিত হতো। একসময় এ নদীপথে পালতোলা নৌকার চলাচল ছিল নিয়মিত।
প্রায় ২৩৮ কিলোমিটার দীর্ঘ বংশাই নদী ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। সময়ের ব্যবধানে জামালপুর শহরের অংশটি সংকুচিত হয়ে খালে পরিণত হয়। পরবর্তীতে দখল, ভরাট ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে খালটি ক্রমেই হারিয়েছে তার অস্তিত্ব।
২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় খালটি দখলমুক্ত ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। খালের তলদেশে আরসিসি ঢালাই ও দুই পাশে গাইড ওয়াল নির্মাণ করা হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেই উদ্যোগ টেকসই হয়নি।
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি
জামালপুর পরিবেশ রক্ষা আন্দোলন কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, “একসময় পালতোলা নৌকার বহর চলত এই খাল দিয়ে। এখন এটি সরু ড্রেনে পরিণত হয়েছে। শহরের পানি নিষ্কাশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খালটি ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে।”
তার মতে, দীর্ঘদিন খাল পরিষ্কার না করায় এটি মশা, মাছি ও ক্ষতিকর পোকামাকড়ের নিরাপদ আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্থির নোংরা পানিতে মশার লার্ভা জন্ম নেয়, যা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। পাশাপাশি কলেরা, ডায়রিয়া ও চর্মরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা
নগরবাসীর দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। একসময় বংশ খাল ছিল জামালপুর শহরের ইতিহাস ও জীবনের অংশ। সেটি পুনরুদ্ধার না হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা তাদের।
কর্তৃপক্ষের আশ্বাস
পৌর প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মৌসুমী খানম বলেন, “বংশ খাল পরিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খালের ওপর স্ল্যাব বসানোর কাজ চলছে। ঠিকাদারকে খাল পরিষ্কার করে কাজ সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে দুই পাশে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছু সমস্যা রয়েছে।”




