আফসান জানি রাফি
শিক্ষার্থী: জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।
শীত অনেকের কাছে আনন্দ ও উৎসবের ঋতু হলেও সমাজের এক বিশাল অংশের বিশেষ করে পথশিশুদের কাছে এটি দুঃসহ কষ্ট আর নির্মম বাস্তবতার প্রতীক হয়ে ওঠে। শীতের রাতে যখন আমরা কোটি টাকায় তৈরি বসতবাড়িতে লেপ-কম্বল মুড়িয়ে আরামে ঘুমাই, তখন পথের ধারে শুয়ে থাকা অসংখ্য শিশু কাঁপতে কাঁপতে রাত পার করে নিরাপত্তা, উষ্ণতা আর আশ্রয়ের অভাবে। তাদের নেই গরম কাপড়, নেই নিরাপদ আশ্রয়, নেই নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা, শীতের প্রতিটি রাত তাদের কাছে হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার এক নির্মম। আর তাই শীতে পথশিশুদের যথার্থ সহায়তা করা দান বা উপকারের চেয়েও বেশি এটি সমাজে মানবতার উজ্জ্বল ও অনুকরণীয়।
পথশিশুরা সমাজের অন্যতম অবহেলিত শ্রেণি। জন্ম বা পরিস্থিতির নির্মম পরিণতিতে তারা বেড়ে ওঠে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। অনেকেই পিতামাতাহীন, কেউবা দারিদ্র্যের তাড়নায় রাস্তায় এসে দাঁড়ায়। আর শীতের মতো কঠিন সময়ে তাদের জীবন আরও বেশি শোচনীয় ও কষ্টকর হয়ে ওঠে। শীতবস্ত্রের অভাবে অনেক শিশু ঠান্ডাজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হয়, আর যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে অনেক সময় সেই রোগই মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তাদের দুঃখ–দুর্দশার চিত্র আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। এই অবস্থায় আমাদের দায়িত্ব মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। দুঃখজনকভাবে আমরা প্রায়ই দেখি, তাদের এই করুণ বাস্তবতায় সরকারের পক্ষ থেকে কাঙ্ক্ষিত ও কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। অথচ রাষ্ট্র যদি জোরালো ভূমিকা পালন করে, তবে এসব শিশুর জীবন আরও নিরাপদ ও সুন্দর হয়ে উঠতে পারে। পথশিশুদের সহায়তা করা মানে আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা।
শীতবস্ত্র বিতরণ করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও মানবিক একটি উদ্যোগ। অনেকের ঘরে এমন পুরোনো বা অতিরিক্ত কাপড় পড়ে থাকে, যা আমাদের কাছে হয়তো অপ্রয়োজনীয়; কিন্তু কোনো পথশিশুর জন্য সেটিই হতে পারে শীত থেকে বাঁচার একমাত্র ভরসা, এমনকি জীবন রক্ষার উপায়। নতুন বা পুরোনো শীতবস্ত্র সংগ্রহ করে সংগঠিতভাবে পথশিশুদের মাঝে বিতরণ করা যেতে পারে। স্কুল–কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, যুবসমাজ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সামাজিক মাধ্যমের সম্মিলিত উদ্যোগে এ কাজটি সহজেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
পথশিশুদের জন্য শীতকালীন চিকিৎসা সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় চিকিৎসকেরা যদি স্বেচ্ছাসেবামূলক ভাবে এগিয়ে আসেন, তবে এই উদ্যোগ আরও কার্যকর ও সফল হবে। তাদের জন্য অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে তারা অন্তত রাতে নিরাপদে থাকতে পারবে। অনেক পথশিশুরই পড়াশোনার প্রতি গভীর আগ্রহ ও স্বপ্ন থাকে; কিন্তু সুযোগের অভাবেই তারা অন্ধকার জীবনে হারিয়ে যায়। তাই তাদের জন্য উপযুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ করে দেওয়া আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
সর্বোপরি বলা যায়, শীতে পথশিশুদের যথার্থ সহায়তার প্রকৃত সৌন্দর্য মানবিকতা ও সহমর্মিতার মধ্যেই নিহিত। সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত এই শিশুদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। আমরা যদি প্রত্যেকে সামান্য করে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিই শীতবস্ত্র, খাদ্য, চিকিৎসা কিংবা আশ্রয়ের মাধ্যমে তবে সম্মিলিতভাবে তাদের জীবনে বড় ও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে এগিয়ে এলে একদিন পথশিশুরাও পাবে নিরাপদ, সুন্দর ও স্বপ্নময় ভবিষ্যৎ।




