সম্প্রতি জাতীয় সংসদে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ পাস হয়েছে। আইনটির উদ্দেশ্য হিসেবে বাবা-মা ও অন্যান্য নির্দিষ্ট দাতার জীবনকালীন ভোগ ও দখলের অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়টি সামনে এসেছে। অর্থাৎ সন্তানকে সম্পত্তি দান করার পরও বাবা-মা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন।
বিষয়টি শুনতে অত্যন্ত মানবিক। কারণ বাস্তবতা হলো, অনেক বাবা-মা সম্পত্তি সন্তানকে লিখে দেওয়ার পর সন্তানদের অবহেলার শিকার হন। কেউ ভরণপোষণ বন্ধ করে দেয়, কেউ বাড়ি থেকে বের করে দেয়। ফলে সম্পত্তি দেওয়ার পর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে বাবা-মায়ের ভয় থাকাটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু আইনটির মানবিক উদ্দেশ্যের পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও সামনে আসে।
এই আইনের সুযোগ কি কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাবা-মাকে তাঁদের পছন্দের সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে অন্য বৈধ ওয়ারিশদের বঞ্চিত করার পথ আরও সহজ করে দিতে পারে?
ধরা যাক, একটি পরিবারের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বাবা একজন ছেলেকে বেশি পছন্দ করেন। তিনি জীবদ্দশায় তাঁর অধিকাংশ সম্পত্তি সেই ছেলেকে দান করে দিলেন। একই সঙ্গে নিজের জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগের অধিকারও রেখে দিলেন।
বাবা জীবিত থাকায় আপাতত কোনো সমস্যা দেখা গেল না। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর?
তখন অন্য সন্তানরা যদি প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের উত্তরাধিকার কোথায়?’ তখন বিরোধ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থেকেই যায়।
এখানে একটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি: জীবদ্দশায় সম্পত্তি দান এবং মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার এক বিষয় নয়।
মুসলিম উত্তরাধিকার ব্যবস্থায় কোরআন ওয়ারিশদের জন্য নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করেছে। সূরা আন-নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে সন্তান, পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রীসহ বিভিন্ন ওয়ারিশের অংশের বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে।
অন্যদিকে জীবিত ব্যক্তি তাঁর সম্পত্তি দান বা হেবা করতে পারেন। ফলে বাস্তবে একটি প্রশ্ন তৈরি হয়: জীবদ্দশায় সম্পত্তি দানের সুযোগ ব্যবহার করে যদি কোনো ব্যক্তি তাঁর মৃত্যুর পরের উত্তরাধিকার কাঠামোকে কার্যত অকার্যকর করে দেন, তাহলে এর সামাজিক ও ধর্মীয় প্রভাব কী হবে?
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে মেয়েরা?
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এখনো অনেক পরিবারে মেয়েদের সম্পত্তির অধিকারকে স্বাভাবিকভাবে দেখা হয় না। কোথাও বলা হয়, ‘মেয়েকে তো বিয়ে দিয়েছি’, কোথাও আবার বিয়ের সময় দেওয়া টাকা-পয়সা বা গয়নাকে উত্তরাধিকারের বিকল্প হিসেবে দেখানো হয়।
কিন্তু বিয়েতে উপহার আর উত্তরাধিকার এক বিষয় নয়।
কোনো বাবা যদি জীবদ্দশায় অধিকাংশ সম্পত্তি ছেলেকে দিয়ে দেন এবং মেয়েকে কার্যত কিছুই না দেন, তাহলে ভবিষ্যতে সেই মেয়ে তাঁর অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতেই পারেন।
এখানে অবশ্য একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। নতুন আইন সরাসরি মেয়েদের বা অন্য কোনো ওয়ারিশের উত্তরাধিকার বাতিল করেছে, এমন দাবি করা সঠিক নয়। বরং অনুসন্ধানের প্রশ্ন হলো, আইনের সুযোগটি ভবিষ্যতে এমনভাবে ব্যবহার করা সম্ভব কি না, যার মাধ্যমে কোনো বৈধ ওয়ারিশ বাস্তবে বঞ্চিত হয়ে যান।
বাবা-মায়ের নিরাপত্তা বনাম ওয়ারিশের অধিকার
বাবা-মাকে নিরাপদ রাখা অবশ্যই রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সন্তান যেন সম্পত্তি পাওয়ার পর বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে না পারে, ভরণপোষণ বন্ধ করতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কিন্তু একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে যদি অন্য একটি সমস্যা তৈরি হয়, তাহলে সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
একজন বৃদ্ধ বাবা-মা যদি সন্তানের চাপের কারণে সম্পত্তি দান করেন?
একজন অসুস্থ মা যদি দলিলের বিষয়টি না বুঝেই স্বাক্ষর করেন?
একজন মেয়ে যদি পরে জানতে পারেন, বাবার জীবদ্দশায় তাঁর অধিকাংশ সম্পত্তি ভাইয়ের নামে চলে গেছে?
তখন তাঁর প্রতিকার কী?
এগুলোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
শরিয়াহর প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই
সংসদে বিলটি পাসের সময় এর ধর্মীয় প্রভাব নিয়ে আপত্তি ও শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার দাবি উঠেছে। এই বিতর্ককে রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের বিস্তারিত মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
কারণ সম্পত্তি দান করা বৈধ কি না, আর কাউকে বঞ্চিত করার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি দান করা শরিয়াহসম্মত কি না, দুটি আলাদা প্রশ্ন।
একইভাবে, একটি দলিল আইনের চোখে বৈধ হতে পারে কি না এবং সেটি শরিয়াহর দৃষ্টিতে ন্যায়সঙ্গত কি না, সেটিও আলাদা করে বিবেচনা করতে হবে।
শেষ প্রশ্ন
বাবা-মায়ের নিরাপত্তা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের সম্পত্তি দিয়ে অসহায় করে রাখা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু একই সঙ্গে সন্তানদের ন্যায্য অধিকার, বিশেষ করে নারী ওয়ারিশদের অধিকারও রক্ষা করতে হবে।
তাই নতুন আইনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে এর বাস্তব প্রয়োগে।
এটি কি বাবা-মায়ের জন্য নিরাপত্তার ঢাল হবে, নাকি কোনো কোনো পরিবারে পছন্দের সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার নতুন হাতিয়ার হয়ে উঠবে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনই হয়তো পুরোপুরি পাওয়া যাবে না। তবে আইনটি কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর অপব্যবহার ঠেকানোর ব্যবস্থা, দলিল করার প্রক্রিয়া, দুর্বল বা অসুস্থ দাতার সম্মতি এবং বঞ্চিত ওয়ারিশদের প্রতিকারের সুযোগ কতটা কার্যকর, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।
কারণ সম্পত্তির বিরোধ শুধু জমি নিয়ে বিরোধ নয়।
একটি দলিল কখনো একটি পরিবারের ভাই-বোনের সম্পর্ক শেষ করে দিতে পারে।
আর তাই বাবা-মায়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এমন ব্যবস্থাও প্রয়োজন, যাতে তাঁদের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন কোনো অন্যায় ও পারিবারিক সংকট তৈরি না হয়।
– আব্দুর রহিম খান, লেখক ও সাংবাদিক

