আব্দুর রহিম খান ।।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার বুক চিরে বিস্তৃত খরকা বিল একসময় ছিল এই জনপদের প্রাণস্পন্দন। বর্ষায় জলভরা বিশাল জলরাশি, শীতে অতিথি পাখির আনাগোনা, ভোরে জেলেদের জাল ফেলার দৃশ্য আর চারপাশের সবুজ ধানক্ষেত মিলিয়ে খরকা বিল ছিল প্রকৃতির এক অপূর্ব উপহার। খরকা বিলের পাশ দিয়ে যে রাস্তা মাদারগঞ্জ সদর গাবেরগ্রাম থেকে জেলে পাড়া হয়ে উপজেলা যাওয়ার রাস্তাটি হাওয়াই রোড নামে পরিচিত লাভ করে। এই বিল শুধু একটি জলাভূমি ছিল না, এটি ছিল হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকার অবলম্বন, কৃষির আশীর্বাদ এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম ভিত্তি।
বয়োজ্যেষ্ঠদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক দশক আগেও খরকা বিলের বিস্তৃতি ছিল হাজার একরেরও বেশি। বর্ষাকালে বিলটি যেন ছোট একটি সাগরের রূপ নিত। দূর-দূরান্ত থেকে মাছ ধরতে আসতেন জেলেরা। বছরের অধিকাংশ সময় বিলে পানি থাকায় কৃষকেরা সহজেই সেচের সুবিধা পেতেন। ফলে আশপাশের বিস্তীর্ণ জমিতে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ হতো।
খরকা বিলকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল অসংখ্য জেলে পরিবার। দিনের প্রথম আলো ফোটার আগেই নৌকা ও জাল নিয়ে বিলে নেমে পড়তেন তারা। দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছে ভরে উঠত জাল। বিভিন্ন দেশীয় মাছের অভয়ারণ্য ছিল, বিশেষ করে জামালপুর জেলার মধ্যে ঐতিহাসিক খরকা বিল কর্তী মাছের জন্য বিখ্যাত ছিল। সেই মাছ বিক্রি করেই চলত সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা এবং পরিবারের নিত্যদিনের প্রয়োজন। প্রায় এক হাজার পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এই বিলের ওপর নির্ভরশীল ছিল।
কৃষকের কাছেও খরকা বিল ছিল আশীর্বাদ। বর্ষার পানি ধারণ করে শুষ্ক মৌসুমে আশপাশের জমিতে সেচের জোগান দিত এই জলাধার। বিলের কারণে এলাকার ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও স্বাভাবিক থাকত। জলাভূমির প্রাকৃতিক পরিবেশ অসংখ্য মাছ, পাখি, সরীসৃপ ও জলজ উদ্ভিদের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে কাজ করত।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রাণবন্ত খরকা বিল আজ অস্তিত্ব সংকটে। অবৈধ দখল, পরিকল্পনাহীন মাটি ভরাট, প্রভাবশালীদের দখলদারিত্ব এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে বিলটি দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ডাইভারশন সড়ক নির্মাণের ফলে বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যেখানে একসময় বর্ষার পানি সহজেই প্রবাহিত হতো, সেখানে এখন নানা বাধার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বিল তার স্বাভাবিক রূপ হারিয়ে ফেলছে।
স্থানীয়দের দাবি, একসময় যে বিলের বিস্তৃতি ছিল হাজার একরেরও বেশি, বর্তমানে তা নেমে এসেছে প্রায় ৫০ একরে। বিলের অনেক অংশ এখন মাটিতে ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও গড়ে উঠেছে স্থাপনা, কোথাও কৃষিজমি, আবার কোথাও অবৈধ দখল স্থায়ী রূপ নিয়েছে। এতে বিলের পানি ধারণক্ষমতা ভয়াবহভাবে কমে গেছে।
খরকা বিলের এই সংকোচনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে জেলে ও কৃষক পরিবারের ওপর। মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় অনেক জেলে পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হয়েছেন। কেউ দিনমজুরি করছেন, কেউ অন্যত্র জীবিকার সন্ধানে ছুটছেন। কৃষকেরাও আগের মতো সেচের সুবিধা না পেয়ে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
একটি জলাভূমি ধ্বংস মানে কেবল একটি বিল হারিয়ে যাওয়া নয়। এর সঙ্গে হারিয়ে যায় জীববৈচিত্র্য, কমে যায় দেশীয় মাছের প্রজনন ক্ষেত্র, হুমকির মুখে পড়ে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য। জলাধার কমে গেলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা বাড়ে, আবার শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেয় পানির সংকট। এর প্রভাব পড়ে পুরো এলাকার মানুষ ও কৃষি ব্যবস্থার ওপর।
খরকা বিলকে ঘিরে মানুষের যে স্মৃতি, ইতিহাস ও সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, তাও আজ ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্ম হয়তো আর কখনো দেখতে পাবে না সেই জলভরা বিল, মাছে ভরা জাল কিংবা ভোরের কুয়াশা ভেদ করে এগিয়ে চলা নৌকার সারি।
তবে এখনও সময় শেষ হয়ে যায়নি। খরকা বিলকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব, যদি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নেয়। অবৈধ দখল উচ্ছেদ, মাটি ভরাট বন্ধ, বিলের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা, প্রয়োজনীয় খনন ও সংস্কার এবং পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিলটিকে আবারও প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি জেলে ও কৃষকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সমবায়ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা চালু করা হলে এই বিল আবারও অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সম্পদে পরিণত হতে পারে।
খরকা বিলের ভবিষ্যৎ শুধু একটি জলাশয়ের ভবিষ্যৎ নয়। এটি মাদারগঞ্জের কৃষি, মৎস্য, পরিবেশ এবং হাজারো মানুষের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আজ যদি এই বিলকে বাঁচানো না যায়, তাহলে হারিয়ে যাবে একটি অঞ্চলের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং প্রাকৃতিক পরিচয়।
খরকা বিল আজও নীরবে অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা মানুষের সচেতনতা, দায়িত্ববোধ এবং কার্যকর উদ্যোগের। কারণ একটি বিল বাঁচলে শুধু পানি নয়, বেঁচে থাকে মানুষ, জীবিকা, প্রকৃতি এবং আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।
-লেখক, গণমাধ্যমকর্মী




