গারো পাহাড়ঘেঁষা বকশীগঞ্জে প্রকৃতির টানে ছুটছে শত শত দর্শনার্থী
মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা
শরতের নীল আকাশ, সাদা মেঘের ভেলা আর চারপাশের সবুজের সমারোহ। এরই মাঝে বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকজুড়ে ফুটে আছে অসংখ্য লাল শাপলা। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, সবুজের মাঝে প্রকৃতি যেন বিছিয়ে দিয়েছে লাল ফুলের বিশাল গালিচা। এমনই মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের দেখা মিলছে জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার বাট্টাজোড় ইউনিয়নের ঐতিহ্যবাহী কুঁড়ি বিলের উত্তরাংশে।
লাল শাপলার অপরূপ সৌন্দর্যের টানে প্রতিদিনই এখানে ছুটে আসছেন শত শত দর্শনার্থী। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রকৃতিপ্রেমীসহ বিভিন্ন বয়সী মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে প্রত্যন্ত এই বিলপাড়। কেউ আসছেন পরিবার নিয়ে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে; আবার কেউ নৌকায় চড়ে শাপলার সৌন্দর্য উপভোগ করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কুঁড়ি বিলের উত্তরাংশে প্রায় ১০০ একর জমিজুড়ে এবার বিপুলসংখ্যক লাল শাপলা ফুটেছে। পানিতে ভেসে থাকা সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে থাকা লাল শাপলা এবং চারপাশের নির্মল প্রকৃতি মিলে তৈরি হয়েছে দৃষ্টিনন্দন এক পরিবেশ।
বিশেষ করে সকাল ও বিকেলে দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়ে। ছোট ছোট নৌকায় চড়ে শাপলার বাগানের ভেতর দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তারা। মাঝির বৈঠার ছন্দে নৌকা এগিয়ে যায় শাপলার ভেতর দিয়ে, আর মুগ্ধ দর্শনার্থীরা মোবাইল ফোনে ধারণ করছেন ছবি ও ভিডিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ছে কুঁড়ি বিলের লাল শাপলার সৌন্দর্য।
হারানো ঐতিহ্য ফিরছে নতুন রূপে
স্থানীয় প্রবীণদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাট্টাজোড় ইউনিয়নের কয়েক হাজার একর জমিজুড়ে বিস্তৃত ঐতিহ্যবাহী কুঁড়ি বিল একসময় ছিল পদ্ম, শাপলা ও নানা জলজ উদ্ভিদের বিশাল প্রাকৃতিক আবাসস্থল। বর্ষা মৌসুমে বিলের বিস্তীর্ণ জলরাশি পদ্মপাতা ও জলজ উদ্ভিদে ভরে উঠত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ ছুটে আসত এখানে।
তবে সময়ের সঙ্গে বিলের বিভিন্ন অংশে মাছের প্রকল্প গড়ে ওঠায় এর স্বাভাবিক জলাভূমির চরিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। কমেছে জলজ উদ্ভিদের বিস্তার, হারাতে বসেছে বিলের পুরোনো ঐতিহ্য।
এরই মধ্যে কুঁড়ি বিলের উত্তরাংশে নতুন করে ফুটে ওঠা লাল শাপলার এই সমারোহ যেন প্রকৃতির এক আশীর্বাদ। হারিয়ে যেতে বসা বিলের সৌন্দর্যের কিছুটা হলেও ফিরিয়ে এনেছে এই শাপলা বাগান।
শাপলা দেখতে নৌভ্রমণের আকর্ষণ
কুঁড়ি বিলের দর্শনার্থীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ নৌভ্রমণ। স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থা করা ছোট নৌকায় চড়ে বিলের ভেতরে প্রবেশ করছেন দর্শনার্থীরা। চারদিকে লাল শাপলা, পানির ঢেউ, নির্মল বাতাস আর নীল আকাশ—সব মিলিয়ে তৈরি হচ্ছে অন্যরকম এক আবহ।
নৌকায় থাকা শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বয়স্করাও উপভোগ করছেন এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। অনেকেই পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলে স্মৃতিকে ধরে রাখছেন।
দর্শনার্থীদের ঘিরে বাড়ছে স্থানীয় ব্যবসা
দর্শনার্থীদের আগমনকে কেন্দ্র করে কুঁড়ি বিল এলাকায় তৈরি হয়েছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। ইতোমধ্যে গড়ে উঠেছে চায়ের দোকান, ফুচকার দোকান, কফি হাউসসহ বিভিন্ন ছোটখাটো খাবারের দোকান। শিশুদের বিনোদনের জন্যও রয়েছে নানা আয়োজন।
স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতিদিন দর্শনার্থীর সংখ্যা বাড়ায় তাদের ব্যবসাও জমে উঠেছে। প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে অস্থায়ী দোকান ও ছোট ব্যবসার মাধ্যমে কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
উন্নয়নের আশ্বাস ইউপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের
বাট্টাজোড় ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান লিটন আকন্দ বলেন, কুঁড়ি বিলের লাল শাপলার সৌন্দর্য দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করছে। এটি আমাদের এলাকার জন্য অত্যন্ত সুখবর। তিনি নিয়মিত এ এলাকার খোঁজখবর রাখছেন এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়নমূলক কাজ করার চেষ্টা করবেন।
তিনি আরও বলেন, কুঁড়ি বিল এলাকায় মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে কিছুদিন আগেই তিনি নিজ উদ্যোগে একটি বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করে দিয়েছেন।
পরিকল্পিত উদ্যোগে হতে পারে পর্যটনকেন্দ্র
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পরিকল্পিত উদ্যোগ ও যথাযথ সংরক্ষণের মাধ্যমে কুঁড়ি বিলের এই শাপলা অঞ্চলকে একটি নান্দনিক ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন নিরাপদ নৌযান, দর্শনার্থীদের বসার ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, স্যানিটেশন এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থাপনা।
তবে পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার দাবি স্থানীয়দের। অপরিকল্পিত স্থাপনা, ময়লা-আবর্জনা ও অতিরিক্ত মাছের প্রকল্পের কারণে যেন শাপলার এই প্রাকৃতিক আবাসস্থল নষ্ট না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্টদের নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
কুঁড়ি বিলের লাল শাপলা এখন শুধু একটি ফুলের সৌন্দর্য নয়; এটি হয়ে উঠেছে মানুষের নির্মল আনন্দ, স্থানীয় অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা এবং হারিয়ে যেতে বসা জলাভূমির ঐতিহ্য ফিরে পাওয়ার এক প্রতীক।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গারো পাহাড়ঘেঁষা বকশীগঞ্জের এই প্রত্যন্ত জনপদে গড়ে উঠবে একটি আকর্ষণীয় ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র। তখন কুঁড়ি বিলের লাল শাপলা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের বার্তাই ছড়াবে না, বরং স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকায়ও বয়ে আনবে সম্ভাবনার নতুন সুবাতাস।




