নিজস্ব প্রতিবেদক: জামালপুরের মাদারগঞ্জে জামায়াতে ইসলামীর জামালপুর শহর আমীর মোকাদ্দেস ও তার দুইজন সঙ্গীকে দিনভর মারধোর করে, জুতার মালা পরিয়ে, সারাদিন আটকে রেখে রাতে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে আল-আকাবা সমবায় সমিতির বিক্ষুব্ধ গ্রাহকেরা। অভিযোগ করা হয় সমিতির পরিচালিত দোকান থেকে মালামাল সরিয়ে নেওয়ার। আল আকাবা সমিতির গ্রাহক উপজেলার জুনাইল এলাকার কামরুন্নাহার বাদী হয়ে মোকাদ্দেস হোসেনকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করে ও নাম পরিচয়হীন আরও পাঁচজনকে আসামি করে মাদারগঞ্জ মডেল থানায় মামলাও করেছেন।
কিন্তু সরেজমিনে জানা গেছে ঘটনার ভিন্ন চিত্র। মাদারগঞ্জ পৌর শহরের বালিজুড়ী বাজারে আল আকাবা সমবায় সমিতির কার্যালয়ের নিচতলায় ‘এ ওয়ান’ নামে একটি তৈরি পোশাকের দোকান পরিচালিত হত। এই দোকানের কিছু উদ্যেক্তাদের সাথে আকাবার সংশ্লিষ্টতা ছিল। সেখানে ম্যানেজার হিসাবে চাকরি করতেন জামায়াত নেতা মোকাদ্দেস হোসেন। মোকাদ্দেস হোসেন সেই দোকানে তার অংশীদারিত্ব রয়েছে বলেও দাবি করেছেন। তবে সেই দোকানের সাথে আল আকাবা সমিতির সরাসরি সম্পর্ক নেই। কিন্তু আল-আকাবা সমিতি মূলত পরিচালিত হত জামালপুরের সাবেক কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় জামায়াত নেতাদের দ্বারা। সেই সূত্রে এই কাপড়ের দোকান ও সমিতিকে একই মালিকানার মনে করতেন স্থানীয় গ্রাহকরা। এদিকে বেশ অনেকদিক আগেই আল আকাবা সমিতি গ্রাহকদের অর্থ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কার্যালয় বন্ধ করে গা ঢাকা দেন পরিচালকরা। এদিকে আন্দোলন করে টাকা আদায়ের পথ খুঁজছেন অনেকদিন থেকেই। কিন্তু আশ্বাস মিললেও কোন লাভ হয়নি।
এর মাঝেই বন্ধ থাকা কার্যালয়ের নিচতলায় আটকে পড়া কাপড়ের দোকানে নিজেদের মালামাল আনতে যান জামায়াত নেতা মোকাদ্দেসসহ দুইজন। কিন্তু সেখানে রোষানলে পড়েন বিক্ষুদ্ধ গ্রাহকদের। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলা হয় সমিতির কাগজপত্র সরাতে আসার। এতে প্রচুর লোকজন জড়ো হয় ও এক পর্যায়ে কয়েকজন গ্রাহক বিক্ষুদ্ধ হয়ে জুতার মালা পরিয়ে ভিডিও করে ইন্টারনেটে বিভিন্ন শিরোনামে ছড়িয়ে দেয়। দিনভর নির্যাতন ও নানা নাটকীয়তার পর রাতে পুলিশে সোপর্দ করা হয় তাদের।
আনিসুর (ছদ্মনাম) নামে একজন গ্রাহক জানান, “তাদের আটকে রেখে পলাতক সমিতির মালিকদের হাজির করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সাধারণ গ্রাহক তাদের নির্যাতন করেনি কিন্ত সমিতির মালিকদের হাজির করতে সফল না হওয়ায় কয়েকজন কথা বের করতে কিছু মারধোর করে ও পরে পুলিশে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ওই সমিতির কয়েক হাজার গ্রাহকের কয়েকশত কোটি টাকা আত্মসাৎ করে সমিতির পরিচালকরা পালিয়ে গেছেন। জামায়াতের লোকরা এই সমিতি চালাত, তাদের উপর বিশ্বাস থেকেই এই সমিতিতে টাকা রেখেছিলাম। কিন্তু জামায়াত তাদের বহিস্কার করে দায় সেরেছে। এই সমাধান না পেলে জামায়াতের প্রতি মানুষের বিরুপ মনোভাব কমবে না।”
আনিসুরের মত এমন কথা জানিয়েছেন আরো অনেকে। এই পরিস্থিতিতে বিপদে পড়েছেন পুরো জেলার জামায়াতের নেতাকর্মীরা। একদিকে তারা যেমন এর কোন সদুত্তর দিতে পারছেন না অন্যদিকে তীব্র সমালোচনা হচ্ছে জামায়াতের নিজেদের মধ্যেই। জামায়াতের একজন ইউনিয়ন সভাপতি নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, “এই ঘটনায় অবশ্যই সাংগাঠনিক দায় আছে। দুই-তিন জন সুবিধাভোগী নেতার জন্য বিষয়টি এতদূর গড়িয়েছে এরা এখনও জেলা জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় পদে আছে বলে জানান। তিনি বলেন, পুরো জেলার সাধারণ মানুষওতো বটেই নিজেদের সমর্থক-কর্মীদের মধ্যেই সেই নেতাদের প্রতি ঘৃণা জমেছে যা জামায়াতের ইতিহাসে নতুন ঘটনা।” তবে সেই নেতাদের নাম জানাতে অস্বীকার করেন তিনি। তবে তিনি মনে করেন, এই ঘটনায় জামায়াতের উচিত দায় নিয়ে জনগনকে আশ্বস্ত করা। কারণ বহিস্কার করলেও তারা জামায়াতের সুনাম ব্যবহার করেই গ্রাহকদের আকৃষ্ট করেছিল সেই সময় জামায়াতও এর বিরুদ্ধে কোন ভূমিকা নেয়নি।”
জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অ্যাড. আওয়ালের সাথে যোগাযোগ করা হলে, তিনি এটাকে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক বিষয় হিসাবে উল্লেখ করেন ও এতে সাংগাঠনিকভাবে জামায়াতের দায় অস্বীকার করেন তিনি। তার নিজের বিরুদ্ধেও আল-আকাবা সমিতির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিষয়টিকে ভিত্তিহীন দাবি করেন। জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সেক্রেটারি ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের পরিচালক ড. সামিউল হক ফারুকীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনিও এই বিষয়ে নিজেদের দায় অস্বীকার করেন।
মাদারগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাসান আল মামুন বলেন, শনিবার রাতে সমবায় সমিতির গ্রাহকরা দুইজনকে থানায় সোপর্দ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। বিকেলে তাদেরকে জামালপুরের মাদারগঞ্জ আমলি আদালতে নেওয়া হলে তাদেরকে কারাগারে পাঠান আদালত।
এই বিষয়ে অবশ্য বেশ কিছু জামায়াত নেতার ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া গেছে। তারা খোলাখোলিই জামালপুরে জামায়াতর শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন এই ঘটনাকে ম্যানেজ করতে না পারায়। একজন লিখেছেন, “জামায়াতের উচিত হাতে চুড়ি পড়ে পদত্যাগ করা। নিজেদের সৎ-ত্যাগী নেতাকর্মীদের অপদস্ত হওয়া থেকে রক্ষা করতে না পারলে তাদের প্রয়োজন কি?” সেখানে মন্তব্যের ঘরে বেশ কিছু মন্তব্যের মধ্যে একটি ছিল, “একজন নিরীহ জামায়াত নেতা সকলের চোখের সামনে সারাদিন অপদস্ত হওয়ার একদিন পর যেই সংগঠন বিবৃতি দিয় দায় সারে সেই সংগঠন নাকি আবার ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখে!” । এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আরেকজন জামায়াত নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এই ঘটনায় জামায়াত সাংগঠনিকভাবে তৎপর ছিল ও লবিং করা হয়েছে বিভিন্ন জায়গায় কিন্তু পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে যে এখানে আমাদের আসলে কিছু করারও ছিল না। তবে এই পরিস্থিতিতে মোকাদ্দেসের সেখানে যাওয়া উচিত হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
হেনস্থার শিকার সেই জামায়াত নেতার বাড়ি দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় বলে জানা গেছে। তিনি মাদারগঞ্জের এই সমিতির সাথে জড়িত নন বলে তার পরিবার থেকে নিশ্চিত করা হয়। জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আব্দুল আউয়াল বলেছেন, জামায়াত নেতাদের সাথে অন্যায় করেছে তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রত্যকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
উল্লেখ্য, জামালপুরে মাদারগঞ্জে আল-আকাবা, শতদল, স্বদেশ, নবদীপ, হলিটার্গেট ও রংধনু সহ বিশটিরও বেশি সমিতি গ্রাহকের টাকা নিয়ে কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। এতে টাকা হারানোর চিন্তায় হাজারো গ্রাহক অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন। এর মধ্য আল-আকাবার সাথে জামায়াত নেতাদের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে জানা গেছে। পরে তাদের বহিস্কার করে জামায়াত।
এ বিষয়ে আকাবার এক কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনিও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ব্যবসায় লাভ-লস থাকে তারপরেও আমরা লোকজনকে টাকা দিতে সমিতি অস্বীকৃতি জানাইনি। কিন্তু নোংরা রাজনীতি ঢুকিয়ে দিয়ে একটি ঘোলাটে পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে”।
জামালপুরের জেলা প্রশাসকের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি গ্রাহকদের স্বার্থ সংরক্ষণে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।




