Skip to content
প্রকাশ- November 2, 2026 , 15:10 pm
ফিচার

ক্ষমতা নয়, মানুষের ভালোবাসাই রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি

ক্ষমতা নয়, মানুষের ভালোবাসাই রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি

ইতিহাসের পাতা খুলে দেখলে একটি সত্য বারবার ফিরে আসে। সিংহাসন বদলেছে, পতাকা বদলেছে, ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। কিন্তু মানুষের হৃদয়ে যাঁরা জায়গা করে নিয়েছেন, তাঁদের নাম কখনো মুছে যায়নি। কারণ ক্ষমতা মানুষকে বড় করে না, মানুষের ভালোবাসাই একজন মানুষকে সত্যিকার অর্থে মহান করে তোলে।

রাজনীতি যদি মানুষের জন্য হয়, তবে তার প্রথম ভাষা হওয়া উচিত মানবিকতা। প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত শালীনতা। আর সবচেয়ে বড় অলংকার হওয়া উচিত বিনয়।

Advertisement

আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন একটি ভুল আচরণ, একটি উত্তেজনাপূর্ণ বক্তব্য কিংবা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ মুহূর্তেই বছরের পর বছর ধরে অর্জিত সম্মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর প্রশাসনকে ১৪৪ ধারা জারি করতে হয়েছে। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির সামনে ধরা একটি কঠিন আয়না। সেই আয়নায় নিজেদের মুখ দেখার সময় এসেছে।

একজন রাজনৈতিক কর্মীর হাতে শুধু দলের পতাকা থাকে না, থাকে একটি আদর্শের সম্মানও। তাঁর প্রতিটি আচরণে মানুষ পুরো দলকে বিচার করে। তাঁর একটি হাসি মানুষের মনে আশার আলো জ্বালাতে পারে, আবার একটি রূঢ় আচরণ অসংখ্য মানুষের মনে হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিতে পারে।

আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, মানুষের মনে ভয় সৃষ্টি করে সাময়িক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা যায়, কিন্তু ভালোবাসা অর্জন করা যায় না। আর যে রাজনীতি মানুষের ভালোবাসা হারিয়ে ফেলে, সে রাজনীতি যত শক্তিশালীই মনে হোক, ভেতর থেকে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।

মানুষ আজ নেতার ভাষণের চেয়ে তাঁর ব্যবহারকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা দেখতে চায়, ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়েও কে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারে। কে দুর্বল মানুষের হাত ধরে, কে অসহায়ের কান্না শোনে, কে প্রতিপক্ষের প্রতিও ন্যূনতম সম্মান দেখাতে জানে। কারণ রাজনীতির প্রকৃত সৌন্দর্য প্রতিপক্ষকে অপমান করার মধ্যে নয়, ভিন্নমতকে সম্মান করার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, উত্তেজনা কখনো স্থায়ী সমাধান এনে দেয় না। সংঘর্ষের ধোঁয়া একসময় মিলিয়ে যায়, কিন্তু তার ক্ষত মানুষের মনে অনেক দিন রয়ে যায়। তাই প্রতিটি পদক্ষেপ হোক বিবেকের আলোয় পরিচালিত, প্রতিটি সিদ্ধান্ত হোক দায়িত্ববোধের প্রতিফলন।

আজ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আত্মসংযমের। প্রয়োজন ধৈর্যের। প্রয়োজন এমন এক রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে মানুষের ঘরে শান্তি ফিরবে, সমাজে সম্প্রীতি বাড়বে এবং তরুণ প্রজন্ম শিখবে, রাজনীতি মানে প্রতিপক্ষকে ঘৃণা করা নয়, বরং মানুষকে ভালোবাসা।

ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী নয়। আজ যিনি ক্ষমতায়, কাল তিনি নাও থাকতে পারেন। কিন্তু একজন মানুষের জন্য মানুষের মুখ থেকে বের হওয়া একটি দোয়া, একটি আন্তরিক ভালোবাসা কিংবা একটি কৃতজ্ঞতার অশ্রু যুগের পর যুগ বেঁচে থাকে। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার হিসাব রাখে না, ইতিহাস মনে রাখে মানবিকতার গল্প।

তাই আসুন, আমরা এমন এক রাজনীতির অঙ্গীকার করি যেখানে অহংকার নয়, বিনয় থাকবে; প্রতিশোধ নয়, ক্ষমাশীলতা থাকবে; বিভেদ নয়, সম্প্রীতি থাকবে; সংঘর্ষ নয়, সহমর্মিতা থাকবে।

কারণ দিনের শেষে মানুষ নেতা নয়, মানুষকে খোঁজে। পদ নয়, চরিত্রকে মূল্যায়ন করে। আর ক্ষমতা নয়, মানুষের ভালোবাসাই একজন রাজনৈতিক কর্মীর সবচেয়ে বড় অর্জন।

আসুন, বদনামের রাজনীতি নয়, ভালোবাসার রাজনীতি করি। শত্রুতা নয়, সম্প্রীতির পথ বেছে নিই। কারণ জনগণের হৃদয় জয় করতে পারাই রাজনীতির সর্বোচ্চ বিজয়।

– আব্দুর রহিম খান, সাংবাদিক ও লেখক

Advertisement