একটি জাতি তখনই সভ্যতার শিখরে পৌঁছায়, যখন তার শাসনব্যবস্থা সত্য, ন্যায় ও নৈতিকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। আর একটি জাতি তখনই পতনের অতল গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয়, যখন ক্ষমতা হয়ে ওঠে ব্যক্তিস্বার্থের হাতিয়ার, বিচার বিকিয়ে যায় অর্থের কাছে, আর নেতৃত্ব পরিণত হয় জনগণের সেবক থেকে তাদের প্রভুতে।
আজ রাজনীতি শব্দটি উচ্চারিত হলেই মানুষের মনে ভেসে ওঠে দুর্নীতি, প্রতারণা, মিথ্যাচার, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, রক্তপাত ও বিভক্তির ছবি। ফলে অনেকে মনে করেন, ধর্ম আর রাজনীতি যেন দুই বিপরীত মেরুর বিষয়। অথচ ইসলামের ইতিহাস আমাদের সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায়।
ইসলাম কেবল নামাজ, রোজা, হজ ও যাকাতের ধর্ম নয়। ইসলাম মানুষের আত্মাকে যেমন আলোকিত করে, তেমনি সমাজকে ন্যায়ের ভিত্তিতে গড়ে তুলতে চায়। ইসলাম মানুষকে শুধু সিজদা করতে শেখায় না, জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও শেখায়; শুধু আল্লাহর ইবাদত করতে শেখায় না, তাঁর বান্দার হক আদায় করতেও শেখায়; শুধু আখিরাতের মুক্তির পথ দেখায় না, দুনিয়ায় ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দায়িত্বও স্মরণ করিয়ে দেয়।
এই কারণেই ইসলামে রাজনীতি কোনো নোংরা খেলা নয়, কোনো ক্ষমতার ব্যবসাও নয়। এটি একটি আমানত, একটি ইবাদত এবং একটি মহান দায়িত্ব। যে দায়িত্বের লক্ষ্য মানুষকে শাসন করা নয়, বরং মানুষের সেবা করা; ক্ষমতা ভোগ করা নয়, বরং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা; ব্যক্তিকে বড় করা নয়, বরং আল্লাহর বিধানকে সমুন্নত রাখা।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কায় মানুষ গড়েছেন, আর মদিনায় গড়েছেন একটি আদর্শ রাষ্ট্র। সেখানে ধনী-গরিবের জন্য ছিল একই বিচার, শাসকের জন্য ছিল জবাবদিহি, সংখ্যালঘুর জন্য ছিল নিরাপত্তা, দুর্বলের জন্য ছিল অধিকার, আর ক্ষমতাসীনদের জন্য ছিল আল্লাহভীতির কঠিন শিক্ষা। খোলাফায়ে রাশেদিন সেই আদর্শকে বাস্তবে রূপ দিয়ে প্রমাণ করেছেন, ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্বই একটি জাতির প্রকৃত শক্তি।
আজ মুসলিম বিশ্বের সংকট কেবল অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক নয়; এটি নৈতিকতার সংকট, নেতৃত্বের সংকট এবং ইনসাফের সংকট। তাই ইসলামি রাজনীতির আলোচনা কোনো দলীয় বিতর্ক নয়; এটি একটি আদর্শের আলোচনা, একটি সভ্যতার আলোচনা, একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তার আলোচনা।
যে রাজনীতি মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন থাকে, শোষিতের পাশে দাঁড়ায়, শাসককে জবাবদিহির আওতায় আনে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে, সেই রাজনীতিই ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত রাজনীতি।
আজ সময় এসেছে রাজনীতিকে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হিসেবে নয়, বরং ইবাদত, আমানত ও মানবকল্যাণের দায়িত্ব হিসেবে নতুন করে উপলব্ধি করার। কারণ ইনসাফহীন ক্ষমতা সভ্যতাকে ধ্বংস করে, কিন্তু ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্ব একটি জাতিকে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারে।
– আব্দুর রহিম খান, সাংবাদিক ও লেখক

