মো: ইমরান হোসেন
সহকারী আধ্যাপক, বাংলা
শিক্ষা হলো তাই যা কোনো শিক্ষার্থী কোন পণ্ডিত/শিক্ষকের ছত্রছায়ায় ক্রমাগত শিখনের মাধ্যমে অর্জন করে থাকে। পারস্পরিক জ্ঞান বিনিময়েই শিক্ষার এই ভিত্তি তৈরি হয় ক্রমশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির সংস্পর্শে। সংবিধান স্বীকৃত পাঁচটি মৌলিক অধিকারের একটি অন্যতম অনুষঙ্গ হলো শিক্ষা। স্বাধীন রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে যা সকল স্তরের জনগণের পাবার অধিকারের কথা (রাষ্ট্রের সকল নাগরিক নারী-পুরুষ শিক্ষার ক্ষেত্রে সমান সুযোগ পাবে।) বলা হয়েছে। জনসংখ্যার তুলনায় ক্ষুদ্র এই বাংলাদেশে জনসংখ্যার অস্বাভাবিক বৃদ্ধির হার, অপ্রতুল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষকের বেতনের গ্রেড নিম্নমান, শিক্ষার্থীর তুলনায় পরিমাণে আগ্রহী ও দক্ষ শিক্ষকের অভাব, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, শিক্ষা ক্ষেত্রে বরাদ্দের স্বল্পতা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোজনিত সমস্যার কারণে ক্রমাগত বাড়ছে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষাকে প্রসারিত, সহজলভ্য ও আয়াসসাধ্য করার জন্য শুরু হয়েছিল শিক্ষায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রচেষ্টা। কিন্তু মুনাফাখোর প্রতিষ্ঠাতা, রাজনীতির কুপ্রভাব আর অদক্ষ ব্যবস্থাপনার জন্য এ শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ এখন বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। যত্রতত্র প্রতিষ্ঠান স্থাপন, স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা একজন মানুষের বেতন যদি তিন হাজার দিয়ে শুরু হয় তবে শিক্ষকতায় আগ্রহ আসবে কীভাবে? যেখানে গার্মেন্টস সেক্টরে একজন দক্ষ শ্রমিকের বেতন শুরু হয় ১২-১৫ হাজার টাকা থেকে। যদিও শিক্ষার সাথে এই সেক্টরের তুলনা করা অনুচিত।
বাংলাদেশ প্রথমে যে পদ্ধতি সুবিধার জন্য তৈরি হয় পরে সেটি জনগণের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বলতে পারেন দ্রব্যের দাম বাড়লে যেমন কমে না, তেমনি একটি বাজে ধারা তৈরি হলে সেটি আর থামে না। আমাদের শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ ঠিক তেমনি আজ রাষ্ট্রিক উন্নয়নের অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই কথা চিকিৎসার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অর্থাৎ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি ছাড়া সদনে বসে বসে সনদ প্রাপ্তির সহজলভ্যতা, অর্থের বিনিময়ে সনদ প্রাপ্তি শিক্ষার্থীদেরকে করেছে শিক্ষা বিমুখ, পড়ার মান নেমেছে নিম্নে। পরীক্ষার ভালো ফল বা জিপিএর উচ্চফলন দৃশ্যত সুফল বয়ে আনছে বলে প্রতীয়মান হলেও লম্বা সময়ের জন্য তা কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি করার সমূহ কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কেননা শেয়ার বাজারে বাণিজ্যিক ধ্বস নামলে সন্ধ্যার বাজারে সেটির প্রতিফলন ঘটতে দেখা যায়। শিক্ষায় বিরূপ প্রভাবের প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয় দীর্ঘ সময়ের পর, যখন সেখান থেকে পূর্বাবস্থায় ফেরত আসা মুশকিল। অনেকটা অসম্ভব। কেননা ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রতিকার করা সম্ভব হলেও প্রতিরোধ ঘটানো এদেশের সিস্টের কারণে অসম্ভব। একটি দেশে সরকারি/পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে যখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে যায় তখন স্বাভাবিক ভাবেই অনুমেয় যে, বুদ্ধিদীপ্ত ও মেধাবী শিক্ষার্থী সৃষ্টি করার চেয়ে গ্র্যাজুয়েট শিক্ষার্থী সংখ্যা বৃদ্ধির দিকেই তাদের নজর বেশি। আরও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মানবিকী বিদ্যার চেয়ে কেবল বিজ্ঞান ও চাকুরি নির্ভর বিষয়ের দিকে নজর দেন। কেননা এসব বিষয়ে অধ্যয়ন খরচ যেমন বেশি তেমনি, অভিভাবকগণ এক প্রকার অহমিকা বোধ করেন যে তাঁর ছেলে EEE কিংবা CSE বিভাগে পড়ে। মেধায় কিংবা পরীক্ষা ভিত্তিক যোগ্যতার ভিত্তিতে ভর্তি হলে হয়ত পড়ারই সুযোগ অনেকে পেতো না। আপনি একটু বেসরকারি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া খুঁজ নিলেই সব জানতে পারবেন। এমনকী অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ভবন গত ১৫ বছরে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ থাকার পরও নির্মাণ সম্ভব হয়নি। ফলত যোগ্যতার চেয়ে বেশি কঠিন বিষয়ে অধীত জ্ঞান পরিপর্ণ জ্ঞান বিকাশের অন্তরায় হিসেবে গণ্য হবে। কেননা যোগ্য ব্যক্তি সুযোগ্য পদে না থাকলে তা যেমন জঞ্জালের কারণ হয়ে দাঁড়ায় তেমনি অধীত বিষয়ে পূর্ণ জ্ঞানের অভাব অদক্ষতারই পরিচায়ক হবে। ক্রমাগত রাজনীতিক ব্যক্তিবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় ও ক্ষতায়নের ফলে প্রতিষ্ঠানের অধিপতি বনে যাওয়া, শিক্ষায় বাণিজ্যিকীরণে পথ সুগম করে দিয়েছে। একথা সত্য যে এসব প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপকগণও স্বাধীনভাবে কোনো পাঠপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পারেন না। অর্থাৎ শিক্ষা ব্যবস্থা যখন শিক্ষাবিদদের পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের বাহিরে যায়, স্বাভাবিক ভাবেই শিক্ষার মানে অধোগতি আসবেই। তাই শিক্ষাকে যত বাণিজ্যিক করবেন, ততই প্রসারিত হচ্ছে বলে মনে হবে আদতে তা উন্নয়নের প্রশস্ত পথকে সংকুচিত করে দেয়। কোচিং সেন্টার, বিশেষত ক্যাডেট কলেজ, ইন্টারন্যাশনাল কিন্ডার গার্টেন, অক্সব্রিজ, অক্সফোর্ড, হার্ভার্ড কলেজ, কুইনন্স মেরি কলেজ, ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসা প্রভৃতি নামাঙ্কিত কলেজে যে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভর্তি করানো হয়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হিতে বিপরীত হয়। বিশেষ করে বিভাগীয় ও জেলা শহরে যে পরিমাণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান দেখা যায়, তাতে কর্মরত অধিকাংশ শিক্ষকরা হয় পরিচিত, মাত্র পড়ালেখা শেষ করেছেন, কেউ হয়ত পরিচিত কোন ভাইয়ের স্ত্রী নয়ত শ্যালক সম্পর্কিত আত্মীয় বা সদ্য বিবাহিত সম্পর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বেকার কেউ। নিজেদের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সময় যোগ্যতা যাচাইয়ের বালাই থাকে না। যেহেতু দেশে বর্তমানে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেশি তাই তুলনামূলক প্রতিযোগিতায় দক্ষতা দেখানোর জন্য অভিভাবকরা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুঁকছেন। অবাধ প্রচার ও নানা রকম সুবিধার বিজ্ঞাপনে ছেয়ে যাচ্ছে শহরের অলিগলি। এযেনো ভোগ্য পণ্যের প্রসারিত বাজার। আসুন, কিনুন, ব্যবহার করে হাসি মুখে বাড়ি যান। বিফলে অনেকে মূল্য ফেরত দেবার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন লিখিত স্ট্যাম্পে। ভাবা যায়!
বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান বৃদ্ধির কারণে পরীক্ষায় নকল প্রবণতা, প্রশ্ন ফাঁসের চক্র বৃদ্ধি, ভর্তি পরীক্ষায় ডুপ্লিমেসি, আর অর্থের বিনিময়ে ভালো সরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তির যোগসাজশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার যথেষ্ট সচেতন থাকা সত্ত্বেও কুচক্রী মহলের কৌশল ও অভিনব প্রতারণা অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের যেমন ভোগান্তির কবলে ফেলছে তেমনই দেশের উন্নয়নে যে মেধাবীরা আসতেন তারা মূল স্রোত থেকে বিচ্যুত হচ্ছেন। ভেঙ্গে পড়ছে উন্নয়নের ধারা, রাষ্ট্রিক কাঠামোর মূল মেরুদণ্ড- শিক্ষা।
যার নমুনা আপনি খেয়াল করলে দেখবেন লোকে একে অপরকে কোন সাজা দিতে গিয়ে বলে, তোকে উচিত শিক্ষা দিয়ে ছাড়ব!
দ্রুত এই ‘উচিত শিক্ষা’ থেকে পরিত্রাণ না পেলে শিক্ষার মান শেয়ার বাজারের চেয়ে দ্রুত নিম্নগামী হবে বলে ধারণা করা হয়।
শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণ শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রধান অন্তরায়:
Oplus_131072




