নয়ন আসাদ: রং বদলাতে নাকি মানুষের জুড়ি নেই! তবে মানুষের ভেতরের রং বদলালেও বাইরের রং কিন্তু একই থাকে। কিন্তু প্রাণীজগতে বেশ কিছু প্রাণীর দেখা মিলে যারা প্রতিনিয়ত পাল্টায় বাইরের রং। এই রং বদলানো কিছু রংবাজদের কথাই বলব আজ।
গিরগিটি
রং বদলানো প্রাণীর নামের কথা আসলে সবার আগেই চলে আসে গিরগিটির নাম। বিভিন্ন সময়ে তাদের মেজাজ, তাপমাত্রা কিংবা আলোর পরিবর্তনের কারণেও পরিবর্তিত হতে পারে তাদের গায়ের রং। পৃথিবীতে প্রায় ১৬০টি প্রজাতির গিরগিটি আছে। রং বদলানো ছাড়াও গিরগিটির রয়েছে আরো কিছু অসাধারণ বৈশিষ্ট্য। যেমন, গিরগিটি তার যে লম্বা আঠালো জিহ্বা দিয়ে শিকার করে থাকে সেটার দৈর্ঘ্য গিরগিটির শরীর থেকে দেড় থেকে দুই গুন লম্বা হয়ে থাকে! এছাড়াও গিরগিটি তার দুই চোখকে একই সময়ে আলাদাভাবে নাড়াতে পারে এবং গিরগিটিরা আল্টা-ভায়োলেট রশ্মিও দেখতে সক্ষম! মজার বিষয় হচ্ছে, পৃথিবীতে যত সংখ্যক গিরগিটির বাস, তার অর্ধেকই বাস করে মাদাগাস্কারের দ্বীপাঞ্চলে!
ফ্লাউন্ডার
ফ্লাউন্ডার মাছ রং বদলানো প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম আরেকটি উদাহরণ। ফ্লাউন্ডারের কিছু প্রজাতি নিমেষেই পারিপার্শ্বিক রঙের সাথে নিজের রং বদলাতে সক্ষম। শরীরে ছোপের ভিন্নতা থাকলেও ফ্লাউন্ডার সাধারণত বাদামী রংয়ের হয়ে থাকে। এটিকে যেখানেই রাখা হোক না কেন মাত্র ৫/৬ সেকেন্ডেই এরা নিজেদেরকে তার বাসস্থানের রংয়ের সাথে মিলিয়ে নিতে পারে।
যখনেই ফ্লাউন্ডার নতুন পরিবেশে পৌঁছায় তখন সেই অবস্থানের রং শনাক্ত করার জন্য রেটিনার মাধ্যমে প্রাপ্ত আলো বিশ্লেষন করে । তারপর মস্তিষ্ক থেকে রং পরিবর্তনে দক্ষ কোষগুলিকে বিভিন্ন ধরনের সংকেত পাঠায়। কোষগুলিতে বিভিন্ন ধরনের রঙ্গক অণুর উপস্থিতির কারণে খুব সহজেই তারা পাল্টিয়ে ফেলতে পারে নিজেদের রং। আর রং পাল্টিয়ে নিমেষেই তাদের শত্রু হাঙ্গর, ঈলদের কাছ থেকে লুকিয়ে ফেলতে পারে নিজেদের। ফ্লাউন্ডার সাধারণত নিশাচর প্রাণী। পাঁচ থেকে পঁচিশ ইঞ্চি পর্যন্ত হয়ে থাকে এদের দৈর্ঘ্য।
মেরু খেঁকশিয়াল
উত্তর মেরু অঞ্চলে দেখা মেলে এই মেরু খেঁকশিয়ালদের। মাংসাশী এই প্রাণীটির রংও পাল্টায় বিভিন্ন সময়ে। সাধারণত বেশির ভাগ রং পরিবর্তনকারী প্রাণীরা মাছ ও সরীসৃপ জাতীয় হলেও মেরু শিয়ালরা এর একটু ব্যতিক্রম। এদের রং পরিবর্তনের বিষয়টি অবশ্য খুব দ্রুততার সাথে ঘটেনা বরং ঋতুর পরিবর্তনের সাথে পরিবর্তিত হয়। শীতে এদের রং থাকে উজ্জল বরফের মতো সাদা আর গ্রীষ্মে পরিবর্তিত হয় উজ্জল বাদামি রংয়ে। এরা মেরু অঞ্চলের মাইনাস পঞ্চাশ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়ও টিকে থাকতে পারে দিব্যি।
কাটলফিস
কাটলফিসদের বাস গভীর সমুদ্রে। দুনিয়াজুড়ে কাটলফিসের রয়েছে একশ’র বেশী প্রজাতি। কাটলফিসরা ছদ্মবেশ ধারণ করার জন্য বেশী পরিচিত। এদের শরীরে বিদ্যমান থাকা লাখো পিগমেন্ট সেলের সাহায্যে এরা খুব সহজেই পাল্টে ফেলতে পারে নিজেদের রং। এবংকি একটি কাটলফিস সমুদ্রতলের মাটি কিংবা পাথরের রং কিংবা জলজ উদ্ভিদের সাথে সাথে নিজেদের এতটাই মিশিয়ে ফেলতে পারে যে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। তাদের এই মিশে যাওয়ার কৌশল নিজেদেরকে যেমন শিকার হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে তেমনি নিজেদের শিকার ধরার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে।
ক্রাব স্পাইডার
ক্রাব স্পাইডার একটি বিশেষ প্রজাতির মাকড়াশা। এদের দেখা মিলে বিশেষ করে আমেরিকা ও কানাডায়। স্ত্রী প্রজাতির ক্রাব স্পাইডারদের রং সাধারণত সাদা হয়ে থাকে। এরা খুব দ্রুতই সাদা থেকে হলুদ রং ধারণ করতে পারে। কিন্তু আবার হলুদ থেকে সাদা রংয়ে ফেরত আসতে বেশ সময় নেয়। স্ত্রী প্রজাতির ক্রাব স্পাইডাররা রং পরিবর্তনে সক্ষম হলেও পুরুষ প্রজাতির ক্রাব স্পাইডাররা রং পরিবর্তন করতে পারে না।
সমুদ্র ঘোড়া মাছ
ঘোড়ার মত আকৃতি হওয়ার কারণেই সম্ভবত এদের সি- হর্স বা সমুদ্র ঘোড়া নামে ডাকা হয়। কিছুটা অদ্ভুদ এই মাছটি রং পরিবর্তনকারী প্রাণীদের মধ্যে অন্যতম একটি প্রাণী। প্রাণী জগতে সি- হর্সই একমাত্র প্রাণী, যাদের পুরুষ প্রজাতি গর্ভধারণ করতে পারে। এরা খুব সহজেই তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে নিজের রংয়ে পরিবর্তন আনতে পারে এবং তার শত্রুদের বোকা বানাতে পারে। শারীরীক গঠনের কারণেই এরা খুব বেশী দ্রুত চলাচল করতে পারে না তাই আত্মরক্ষার্থে তাদের নিজের রং ও গঠন পরিবর্তন করার দক্ষতাকে নিপুণভাবে ব্যবহার করে।
উপরের প্রাণীগুলো ছাড়াও আরো বেশ কিছু রং পরিবর্তনকারী প্রাণী আছে। যেমন প্রশান্ত মহাসাগরীয় গেছো ব্যাঙ, গোল্ডেন টরটয়িজ বিটল, ইত্যাদি।থরের রং কিংবা জলজ উদ্ভিদের সাথে সাথে নিজেদের এতটাই মিশিয়ে ফেলতে পারে যে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়। তাদের এই মিশে যাওয়ার কৌশল নিজেদেরকে যেমন শিকার হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে তেমনি নিজেদের শিকার ধরার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে।
