সাইদুর রহমান
শিক্ষার্থী:মাস্টার্স অধ্যয়নরত (বাংলা) সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ জামালপুর
আমরা জীবন চলার পথে কতটা ভালোবাসার বন্ধনে জড়িয়ে পড়ি। হয়তো কখনো স্থায়ী, আবার কখনো ক্ষণিকের জন্য। তা আমরা দেখি গল্পে, বাস্তবে কিংবা কল্পনায়। সেসব দৃশ্য দেখে মনের অজান্তেই শিউরে ওঠে হৃদয়।
গল্পের শুরুতেই—“সালমান”।
আদালতের বারান্দায় একটি শিশু দৌড়াচ্ছে। আকাশছোঁয়া উল্লাসে একমনে খেলা করছে সে, যেন জনাকীর্ণ আদালতের সেই সরু লম্বা বারান্দাটাই তার জন্য এক অখণ্ড উন্মুক্ত খেলার মাঠ। চারপাশের মানুষ বিস্ময়ভরা চোখে শিশুটিকে তাকিয়ে দেখছে, কিন্তু বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই তার। সে খেলছে আপন মনে। মাঝে মাঝে মায়ের আঁচলে মুখ লুকোচ্ছে, আবার দৌড়ে বারান্দার অপর প্রান্তে গিয়ে উঠছে বাবার কোলে।
কে এই শিশুটি?
নাম তার সালমান। বয়স সবে তিন বছর আট মাস। শুভ্র, ফুটফুটে, মায়াভরা চেহারা; দুচোখ জুড়ে ছড়াছড়ি অগাধ চঞ্চলতা। মা–বাবার বিচ্ছেদের সূত্র ধরে সে এসেছে আদালতের প্রাঙ্গণে। আদালতে তার মা–বাবা জানান, সালমানকে তারা আর রাখতে চান না। কারণ হিসেবে মা জানান আর্থিক অসচ্ছলতার কথা, আর বাবা জানান—শিশুটিকে রাখার মতো কোনো পরিবেশ নেই তার কাছে।
মা–বাবার এমন বক্তব্যে বিস্মিত হয় আদালত, বিস্মিত হয় উপস্থিত সকলেই। এরপর আদালত প্রশ্ন রাখেন—না রাখলে এই ছোট্ট শিশুটির দায়িত্ব নেবে কে?
বিষয়টি নিয়ে উভয় পক্ষের আইনজীবী একে অপরকে দোষারোপ করেন। শিশুটির মা গণমাধ্যমকে জানান, “বাচ্চাটিকে একবারও দেখতে আসে না তার বাবা, ভরণপোষণও দেয় না। তাহলে এই অবস্থায় আমি কীভাবে বাচ্চাটিকে রাখব?”
শিশুটির বাবা গণমাধ্যমে কোনো কথা বলতে চাননি। গণমাধ্যমকর্মীরা এগিয়ে গেলে তিনি কাপড়ে মুখ লুকোন।
ছোট্ট দুরন্ত সালমান এখনো বুঝতে শেখেনি—বিবাহ, বিচ্ছেদ, আদালত, উকিল। সে খেলে যাচ্ছে একমনে। সে জানে না, কী কারণে সে আদালতে এসেছে। সে এখনো জানে না, তার ঝকঝকে সবুজ পৃথিবীটাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করে ফেলছে এক নির্মম, নিষ্ঠুর, বীভৎস অন্ধকার। সে এখনো ভাবে, সে আছে মা–বাবার নিবিড় স্নেহতলে।
শেষ পর্যন্ত কী হয়েছিল সালমানের—যার সামনে পড়ে আছে বিস্তৃত এক জীবন—তা আমরা আজ কেউ জানি না।
দিনান্তে রাত নামে এই শহরে, রাতের পর আবার আসে দিন। ক্ষিপ্রগতিতে ছুটে চলা এই শহরে কার খবর কে রাখে? এই শহরে প্রতিদিন কত সালমান, ভিতরের এই সালমানের সঙ্গে মিশে নিলীন হয়ে যায়।
আকাশ ঢেকে রাখা সুউচ্চ ইমারতের পর ইমারত, দূষণ, যানজট, কালো ধোঁয়া, দুঃসহ শব্দে ঠাসা এই জনারণ্য শহরে কত কিছুই তো নেই সালমানের। নেই এক টুকরো উন্মুক্ত মাঠ—যেখানে সে অনাবিল উল্লাসে আকাশ ছুঁতে পারে। মানুষে গিজগিজ করা আদালতের সংকীর্ণ, অপ্রশস্ত বারান্দাকেই সে বানিয়েছিল তার একমাত্র খেলার মাঠ।
এই শহরে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না এক চিলতে সবুজ, যেখানে সে ফুসফুসভরে একটু অক্সিজেন নিতে পারে। যন্ত্র, ইট, পাথর, ধুলো–ধোঁয়ায় ঘেরা এই অন্ধকার শহর প্রতিনিয়ত তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে। আর শেষ পর্যন্ত এই শহরেই তাকে হারাতে হয় তার একমাত্র আশ্রয়—মা–বাবার সুশীতল স্নেহনীড়।
তাহলে কি এই শহরের বুকে আর এক বিভীষিকাময় অন্ধকারের শুরু?
হয়তো তাই। শুধু কি সালমান? না, শুধু সালমানই নয়। মা–বাবার বিচ্ছেদকে কেন্দ্র করে আদালত অঙ্গনগুলো প্রতিদিন সালমানের মতো অসংখ্য ছোট্ট শিশুর কান্নায় ভরে যায়। প্রায়শই জন্ম নেয় এমন নিদারুণ, করুণ, হৃদয়বিদারক দৃশ্য।
হয়তো এটাই এই দূষিত শহরে আর এক গুপ্তবেশী, নিবিড় দূষণের শুরু।
আমি স্পষ্ট চোখে দূরস্থিত এক ভয়াল নিকষকালো অন্ধকার দেখেছি। সেই সর্বগ্রাসী, বিষাক্ত, বীভৎস অন্ধকার ক্রমান্বয়ে ধেয়ে আসছে এই শহরের বুকে—ধীরপায়ে, নিঃশব্দে, সবার অগোচরে। একদিন হয়তো সেই অন্ধকার পুরো শহরটাকেই গ্রাস করবে। শিশুদের মুক্ত, বিস্ময়ভরা, ঝকঝকে সবুজ নিষ্কলুষ পৃথিবী হারিয়ে যাবে সেই নির্মম কালো অন্ধকারে।
তবুও আমি স্বপ্নদীপ্ত চোখে দেখি—সেই অন্ধকার যতই বিষাক্ত ও কালো হোক, একদিন উদীচী উষার মতো স্বর্গীয় আলোর ঝরণাধারা ছড়িয়ে পড়বে শহরজুড়ে। সেই মায়াবী, দিব্য অনিন্দ্য আলোঝরণায় একদিন দূরীভূত হবে এই কলুষিত অন্ধকার।
সেই একদিন এই শহরের প্রতিটি পরিবার হবে পাখির নীড়ের মতো—অপার শান্তি ও স্নেহে ভরা। শিশুর অনাবিল হাসির মায়াবী বর্ণচ্ছটায় কপূর্বের মতো বাতাসে মিলিয়ে যাবে বাবা–মায়ের মনের সকল অহংকার, অন্তর্ক্রোধ ও অন্তকলহ। সেই একদিন বাবা–মায়ের অস্থির, মমতাহীন হৃদয় শিশুর স্বর্গীয় হাসির কোমল স্পর্শে সংযত ও প্রশান্ত হবে।
একদিন এই শহরের সালমানরা আবার বেড়ে উঠবে মা–বাবার সুনিবিড় সুখচ্ছায়াতলে। শিশুদের সেই হারিয়ে যাওয়া উল্লাসমুখর, অনাবিল, ঝকঝকে, স্নিগ্ধ সবুজ পৃথিবী আবার ফিরে আসবে এই শহরের বুকে।




